ঢাকা, সোমবার 13 May 2019, ৩০ বৈশাখ ১৪২৬, ৭ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আল-কুরআনের দৃষ্টিতে ইসলামী আন্দোলন

মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : ॥৪॥
মাওলানা মওদূদী সবরের কয়েকটি অর্থ করেছেন। তাড়াহুড়া না করা, নিজের প্রচেষ্টার ত্বরিত ফল লাভের জন্য অস্থির না হওয়া এবং বিলম্ব দেখে হিম্মত হারিয়ে না বসা। যা বর্তমানে কিছু কিছু লোকের মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে। এটাা মোটেই কাম্য নয়। ধৈর্য্যশীল ব্যক্তি সারাজীবন একটি উদ্দেশ্য সম্পাদনের জন্য অনবরত পরিশ্রম করতে থাকে এবং একের পর এক ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েও পরিশ্রম থেকে বিরত হয় না।
সবরের আরেকটি অর্থ হলো- তিক্ত স্বভাব, দুর্বল মত ও সংকল্পহীনতার রোগে আক্রান্ত না হওয়া। বাঁধা বিপত্তির বিরোচিত মোকাবেলা করা। এছাড়া সকল প্রকার ভয়ভীতি ও লোভ লালসার মোকাবেলায় সঠিক পথে অবিচল থাকা। দুনিয়ার স্বার্থ উদ্ধারের পথ প্রশস্ত দেখে এবং সাফল্যের সুযোগ সুবিধা নিজের হাতের মধ্যে পেয়েও পূর্ণ মানসিক নিশ্চিন্ততার সাথে একমাত্র নিজের লক্ষ্য অর্জনের পথে লব্ধ দানের উপর সন্তুষ্ট থাকার নাম ধৈর্য্য।
আলহামদুলিল্লাহ বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সহ ছাত্র-ছাত্রী, শ্রমিক আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা সকল ভয়ভীতি ও লোভ-লালসার উর্ধ্বে উঠে বাঁধা বিপত্তির বিরচিত মোকাবেলা করে বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের স্বাভাবিক অগ্রযাত্রাকে অব্যহত রাখতে পেরেছে। জামায়াতে ইসলামী যে একটি সত্য আন্দোলন এটাই হচ্ছে বড় প্রমাণ এবং এটি রীতিমত মিরাকলও বটে।
দুনিয়ার সাধারণ আন্দোলনের রঙ্গিন চশমায় ইসলামী আন্দোলনকে দেখতে যারা অভ্যস্ত তারা ইসলামী আন্দোলনের ১০০টি ত্রুটি বের করতে পারবেন। কারণ তারা ইসলামী আন্দোলনের বিজয়ের ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও মানদন্ড থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছেন। সাধারণ আন্দোলনের সফলতার জন্য যা লাগে ইসলামী আন্দোলন বিজয়ের জন্য তার সবকিছুর দরকার হয় না। আর ইসলামী আন্দোলনের বিজয়ের জন্য যা দরকার হয়, সাধারণ আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে তার ছিটেফোটাও সাধারণত থাকে না।
সাধারণ আন্দোলনের বিজয়ের জন্য প্রয়োজন হয় অর্থ, বিত্ত-বৈভব, জনবল, অস্ত্রবল, রণকৌশল ইত্যাদি। ইসলামী আন্দোলনের বিজয়ের জন্য প্রয়োজন ঈমান, চরিত্রবল, সবর, আন্তরিকতা, আদর্শের উপর অটল-অবিচল থাকা ও আদর্শকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করে আল্লাহর পথে সবকিছুর উৎসর্গ করার প্রবণতা, প্রয়োজনে নিজের জীবন উৎসর্গ করে শাহাদাতের অমিয় সূধা পান করা ইত্যাদি। সর্বোপরি আল্লাহর সাহায্যের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয় এবং মুমিনদের ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে এই সাহায্যের ওয়াদা রয়েছে। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “মুমিনদেরকে সাহায্য করা আমার হক্ব”।
বিগত ১০ বছরে মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর এ সাহায্যরূপ অস্ত্রের মহড়া আমাদের পক্ষে প্রদর্শন করেছেন। তা না হলে দেশি-বিদেশি ইসলাম বিরোধী শক্তির যে ভয়াবহ হামলা ইসলামী আন্দোলনের ওপর পরিচালিত হয়েছে তাতে এ আন্দোলন টিকে থাকার কথা না। কিন্তু মহান আল্লাহ ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের টিকে থাকার শক্তি যুগিয়েছেন। ইনশাআল্লাহ এই আন্দোলন টিকে থাকবে এবং তার কাঙ্খিত মঞ্জিলে অতি দ্রুততার সহিত এগিয়ে যাবে। তবে সেজন্য প্রয়োজন একটি সর্বব্যাপি নিয়মতান্ত্রিক সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলা।
বাংলাদেশের অধিকারহারা শোষিত বঞ্চিত মানুষের সব ধরনের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এই আন্দোলন ইনশাআল্লাহ নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করবে। এই আন্দোলন যতটুকু অগ্রগতি লাভ করেছে তা সম্ভব হয়েছে মহান আল্লাহ দেয়া তৌফিক মোতাবেক আন্দোলনের ময়দানে সঠিক ভূমিকা রাখতে পারা এবং আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের ত্যাগ-কুরবানী, সবর ও আন্তরিকতার ফলে। সেজন্য লক্ষ্য পানে সুদৃঢ়ভাবে অটল অবিচল থেকে কাঙ্খিত মুক্তির লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন-
৩০) যারা ঘোষণা করেছে, আল্লাহ আমাদের রব, অতপর তার ওপরে দৃঢ় ও স্থির থেকেছে নিশ্চিত তাদের কাছে ফেরেশতারা আসে এবং তাদের বলে, ভীত হয়ো না, দুঃখ করো না এবং সেই জান্নাতের সুসংবাদ শুনে খুশি হও তোমাদেরকে যার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।
৩১) আমরা এই দুনিয়ার জীবনেও তোমাদের বন্ধু এবং আখেরাতেও।সেখানে তোমরা যা চাবে তাই পাবে। আর যে জিনিসেরই আকাঙ্খা করবে তাই লাভ করবে।
৩২) এটা সেই মহান সত্তার পক্ষ থেকে মেহমানদারীর আয়োজন যিনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান। (সূরা হামিম আস-সাজদাহ: ৩০-৩২)
সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে দীন প্রতিষ্ঠার কাজ আল্লাহ তা’য়ালার নিজের দায়িত্ব। তিনি মানুষ ছাড়া অন্য সকল সৃষ্টির জন্য তাঁর বিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে কায়েম করেছেন। হিউম্যান বডিতেও তাঁর বিধান তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু মানুষের সামাজিক জীবনের বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষকে তাঁর খলিফা ও আনসারুল্লাহর মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন। মুমিনের দায়িত্ব হলো খলিফা ও আনসারুল্লাহ হিসেবে তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-
‘আল্লাহর পথে জিহাদ করো যেমন জিহাদ করলে তার হক আদায় হয়। তিনি নিজের কাজের জন্য তোমাদেরকে বাছাই করে নিয়েছেন এবং দীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা আরোপ করেননি। তোমাদের পিতা ইবরাহীমের মিল্লাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাও। আল্লাহ আগেও তোমাদের নাম রেখেছিলেন “মুসলিম” এবং এর (কুরআন) মধ্যেও (তোমাদের নাম এটিই) যাতে রসূল তোমাদের ওপর সাক্ষী হন এবং তোমরা সাক্ষী হও লোকদের ওপর। কাজেই নামায কায়েম করো, যাকাত দাও এবং আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যাও। তিনি তোমাদের অভিভাবক, বড়ই ভালো অভিভাবক তিনি, বড়ই ভালো সাহায্যকারী তিনি।’ (সূরা হজ্জ: ৭৮)
এ কাজকে অন্যান্য সকল কাজের উপর অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-
২৪) হে নবী! বলে দাও, যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান ও তোমাদের ভাই তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের আত্মীয়-স্বজন, তোমাদের উপার্জিত সম্পদ, তোমাদের যে ব্যবসায়ে মন্দা দেখা দেয়ার ভয়ে তোমরা তটস্থ থাক এবং তোমাদের যে বাসস্থানকে তোমরা খুবই পছন্দ কর-এসব যদি আল্লাহ ও তার রসূল এবং তার পথে জিহাদ করার চাইতে তোমাদের কাছে বেশী প্রিয় হয়, তাহলে আল্লাহর ফায়সালা তোমাদের কাছে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর আল্লাহ ফাসেকদেরকে কখনো সত্য পথের সন্ধান দেন না। (সূরা তাওবা: ২৪)
আমাদের দায়িত্ব হলো, এ পথে এগিয়ে যাওয়া। যারা এগিয়ে যাবে তারা অবশ্যই আল্লাহর সাহায্য লাভ করবে। আর যারা আল্লাহর সাহায্য পাবে তারা অবশ্যই সফলকাম হবে। তবে সফলতা কখন আসবে তা আল্লাহ তা’য়ালাই নির্ধারন করবেন। আমাদের দায়িত্ব হলো চেষ্টা করে যাওয়া। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা)-কেও আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন, “হে নবী! আপনার কাজ হলো পৌছে দেয়া।” অন্যত্র বলেছেন, “আপনাকে দারোগা করে পাঠানো হয়নি।” আরেক জায়গায় বলেছেন, “হে নবী আপনি চাইলেই হবে না, রাব্বুল আলামীনের ইচ্ছা লাগবে।”
দ্বীন কখন কোথায় প্রতিষ্ঠিত বা বিজয়ী হবে এটা একান্তই রাব্বুল আলামীনের বিষয়। বিজয় কিংবা ক্ষমতায় যেতে দেরি হচ্ছে এ জাতীয় কথা বলে হইচই করা নিতান্তই ইসলামী জ্ঞানের দৈন্যতা ছাড়া আর কিছুই নয়। মহান আল্লাহ তা’য়ালা কুরআনে সাফল্যের কথা যত জায়গায় বলেছেন তার সব জায়গায় একই রকম বক্তব্য এসেছে। আর তা হলো- তোমাদের গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে এবং এমন জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে যার নিচ দিয়ে ঝর্নাধারা প্রবাহিত।
তাই তো আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুমিনদেরকে তাঁর মাগফিরাত ও জান্নাত লাভের জন্য প্রতিযোগিতা করে দৌড়াতে বলেছেন। ইসলামী আন্দোলনের প্রকৃত সফলতা হচ্ছে, আল্লাহর মাগফিরাত লাভ এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করে জান্নাত লাভ করা। আর দুনিয়াতে খেলাফত প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামী আন্দোলনকে বিজয় দান এটা একান্তভাবে আল্লাহ তা’য়ালার ইচ্ছাধীন। দুনিয়াতে কোন এলাকায় যদি সেরকম কোন অবস্থা বিরাজ করে যেখানে দীন প্রতিষ্ঠার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে তাহলে মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর অনুমোদন ও সাহায্যের মাধ্যমে কোন দল বা জাতিকে দীন প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিবেন এবং তারা সফলও হবেন ইনশাআল্লাহ। [সমাপ্ত]
লেখক: কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তর আমীর, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ