ঢাকা, মঙ্গলবার 14 May 2019, ৩১ বৈশাখ ১৪২৬, ৮ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

৩৫ না হোক ৩২ বছরও করা যেত না?

মোহাম্মদ আবু নোমান : সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ালে পেনশনজনিত অনেক জটিলতা রয়েছে ভালো কথা। বেকারত্ব সমস্যার কারণে কী দেশে মোটেই কোন জটিলতার সম্ভাবনা নেই? সবকিছু জেনে, বুঝে, চোখে দেখেও ‘গদ্দিনিশীন’ রাজনীতিক ও আমলারা কি কারণে কোন উদ্যোগ নেয়নি? ৩৫ না হোক, ৩২ বছরও কি করা যেত না? এমনতো নয় যে, দেশে ৫০ লাখ চাকরি আছে আর বেকার মাত্র ৩০ লাখ!
প্রবাদ আছে “অভাগার দু’চোখ যেদিকে যায়, সাগর শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে যায়!” লাখ লাখ তরুণ এবং যুবকের ভবিষ্যৎ একটি (পরিকল্পিত!) ‘না’ বোধক ধ্বনিতেই নিঃশেষ করে দেয়া হলো? আজ যদি সংসদের মেয়াদ ৫ বছর থেকে ১০ বছর করার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়, তাহলে কণ্ঠভোটে পাশ হতে দেড় সেকেন্ডও লাগবে কী! অন্যদিকে অবসরের পর রাষ্ট্রদূত, আমলা, উপদেষ্টাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে বয়সের বালাই নেই; কিন্তু যোগদানের বয়সে এতো জটিলতার বিষয় আসে কেন? কেউ সারা জীবন চাকরি করবে, আর কেউ বেকার থাকবে! এক দেশেতো দুআইন চলতে পারে না! চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর দরকার নেই! আর যারা চাকরিতে আছেন, ওনাদের বেতন দফায় দফায় বাড়ানোই চলতে থাকুক! মানুষ বয়স হলে কাজের গতিও কমে যায়। চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়াতে জটিলতা থাকলে, অবসরেরও একটা নির্দিষ্ট বয়সসীমা কেন করা হয় না?
নির্বাচনের ইশতিহারে বয়স বাড়ানোর বিষয়টি রাখা হয়েছিল। এখন নির্বাচন শেষ! সরকার আমলাতান্ত্রীক তন্ত্র-মন্ত্রের গোলকধাঁধায় ডুবে, প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষিত বেকার ও কোটি শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক ও সময়ের জনপ্রিয় দাবীকে অগ্রাহ্য করে ছাত্রদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিল। সরকারি চাকরিতে প্রবেশে বয়সসীমা ৩০ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩৫ বছর করার একটি বেসরকারি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে জাতীয় সংসদ। গত ২৫ এপ্রিল বগুড়া-৭ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রেজাউল করিম (বাবলু) ওই প্রস্তাবটি এনেছিলেন। কণ্ঠভোটে তার প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়। রেজাউল করিম তার বক্তব্যে বলেন, ‘বিশ্বের ১৯২টি দেশের মধ্যে ১৫৫টি দেশে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৫৫ বছর কোথাও কোথাও ৫৯ বছর পর্যন্ত। দেশে এখন শিক্ষিত বেকার ২৮ লাখের বেশি। শিক্ষিত বেকার পরিবারের জন্য বোঝা। শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের জন্য আন্দোলন করেছিল। এখন চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর জন্য আন্দোলন করছে। চাকরি না পেয়ে অনেক যুবক মাদক, ছিনতাই ও অন্যান্য সামাজিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ বছর করা উচিত হবে।’
রেজাউল করিমের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন সংসদে বলেন, বর্তমানে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ ও অবসরের যে বয়সসীমা, সবদিক বিবেচনায় সেটাকে সরকার যৌক্তিক বলে মনে করছে। স্বাধীনতার পর প্রেক্ষাপট বিবেচনায় চাকরিতে প্রবেশে বয়সসীমা ২৫ থেকে ২৭ ও পরবর্তীতে ৩০ করা হয়। এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজট নেই। ২৩ বছর বয়সে শিক্ষার্থীরা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পাচ্ছেন। ছয়-সাত বছর চাকরির প্রস্তুতির জন্য সময় পাচ্ছেন। তা ছাড়া চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ করা হলে পেনশন সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হবে। এসব বিবেচনায় নিয়ে প্রতিমন্ত্রী স্বতন্ত্র সাংসদ রেজাউল করিমকে তার প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করবেন না বলে সংসদকে জানান। পরে প্রস্তাবটি কণ্ঠভোটে দেওয়া হয়। কণ্ঠভোটে তার প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়।
অনেক পরিবার বসতভিটা বিক্রি করে ছেলে, মেয়েকে পড়ালেখা করিয়েছেন। এখন রাষ্ট্র বলে দিল তোমার বয়স ৩০, এতএব তুমি বাতিল! ডিগ্রির কোনো মূল্য নেই! ৩০ বছর হলে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করা যাবে না, এটা অমানবিক নয় কী? তাহলে এই বেকাররা কি করবে? কোথায় যাবে? তাদের বিকল্প কী? তারা কি রাষ্ট্রের নাগরিক নয়? রাষ্ট্র তাদের কোন দায়িত্ব নিবে না? চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়িয়ে অবসরের বয়স কমিয়ে ৫৫ বছর করলে ক্ষতি কী? এতে দিগুণ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি সরকারী কর্মকা-েও গতি বাড়বে।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার পর গণমাধ্যমকে বলেছিলেন দ্রুতই চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানো হবে। নির্বাচনের আগে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘ক্ষমতায় গিয়েই বাস্তবতার নিরিখে ও অন্যান্য অ্যাডভান্সড রাষ্ট্রের বয়সসীমার সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই বয়সসীমা বর্ধিত করা হবে।’ বর্তমানে অনেক উন্নত দেশে যোগ্যতার মাপকাঠিতে বয়সের বাধা সরিয়ে নিয়েছে, সেখানে অসংখ্য শিক্ষিত বেকারের দিকে না তাকিয়ে সরকার তার সিদ্ধান্তে অটল থাকা কতটুকু যুক্তিযুক্ত?
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর বিষয়ে মেধা ও দক্ষতা বিবেচনায় রেখে বাস্তবতার নিরিখে যুক্তিসঙ্গত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে বলেছিলো। কেননা, ৩ কোটি বেকারের ভোটের বিষয় ছিল। ইশতেহারে প্রায় পাঁচ কোটি ৩০ লাখ তরুণদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছিলো, সরকার ক্ষমতায় গেলে তরুণরা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রয়োজন এবং তরুণদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির জন্য আবেদন করতে পারবে। ২০২৩ সাল নাগাদ অতিরিক্ত ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে। এ ছাড়া নতুনভাবে ১ কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার মানুষ শ্রমশক্তিতে যুক্ত হবে ইত্যাদি। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতি ঘরে ঘরে চাকরি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখন নির্বাচন শেষ, বেকার সমস্যারও যেন সমধান হয়েছে! তাই এখন আর বয়স বাড়িয়ে কি হবে!
চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানো না হওয়ায় এই লেখকের কাছে এক চাকরিপ্রার্থী বলেন, ‘মাঝে মাঝে দুঃখ হয়, কী জন্য রাজনীতিতে ঢুকলাম না। পড়াশোনা করে কী লাভ? লেখাপড়া শেষ করে বয়স তিরিশ হয়েছে বলেই আমরা ইনভেলিড হয়ে গেলাম, আর ৮০/৯০ বছরেও এমপি, মন্ত্রী, উপদেষ্টা হওয়া যায়! লেখাপড়া ও চাকরি করার চিন্তা বাদ দিয়ে চেয়ারম্যান, এমপি, মন্ত্রী হওয়ার চিন্তা করাই ভালো ছিলো! কেননা, সেখানে বয়সের হিসেব নেই। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে আরো বলেন, যারা সরকারি চাকরি করেন তাদের সব দাবিই মেনে নেয়া হয়, অথচ হাজার হাজার বেকারদের একটি মাত্র দাবি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ করা, সেটা আর মানা গেল না। সরকার রোহিঙ্গাদের প্রতি যতোটুকু দরদ দেখিয়েছে, শিক্ষিত বেকার যুবকদের ওপর ততটুকু দরদও দেখায়নি...।’
সেশনজট আছে কি নাই, সেশনজট কাকে বলে, মাননীয় জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীকে বেশী দূরে নয়, কষ্ট করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনের ৭ কলেজে গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখুন। ঢাবির অধিভুক্ত সাতটি কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সেশনজট সমস্যা নিয়ে সাম্প্রতিক আন্দোলন কি তিনি দেখেন নি? সারাদেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রয়েছে অসংখ্য কলেজ, আর সেসব কলেজে এখনও কমবেশি সেশনজট রয়েছে।
দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায়ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করতে ২৪ থেকে ২৬ বছর লাগে। পরবর্তীতে চাকরির ক্ষেত্রে নতুনভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্যাটার্নে পড়ালেখা করতে হয়। কিন্তু জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী যে সব যুক্তি দেখিয়ে প্রস্তাবটিকে নাকচ করেছেন এবং এখন ২৩ বছরেই পড়াশোনা শেষ করা যায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট নেই, এসব কোন যুক্তি-প্রমাণে বলেছেন, তা তিনিই জানেন! শিক্ষা ব্যবস্থায় সেশনজটের দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে। ভুলভাল যুক্তি দেখিয়ে তরুণদের ন্যায্য অধিকার হরণ ও তাদের সুন্দর ভবিষ্যতকে নষ্ট করার অধিকার কারোরই নেই।
দেশে এখন মেধার চেয়ে বয়সের দাম, টাকার দাম, খালুর দাম, মামার দাম বেশি। খুটির জোরওয়ালা বড় পরিচয়ধারী কতিপয় অদক্ষ, অলস ও অসৎ লোকজন বুঝে যে, সরকারি চাকুরি একবার হলেই সারাজীবন নিজে ও পরিবার নিয়ে আরামে কাটিয়ে দেয়া যাবে। এজন্য বিভিন্ন পরিচয়ে সরকারি অফিসের চলে টাকার ব্যাগের লেনদেন ও দলীয়করণ। এভাবেই সরকারি অফিসকে বানানো হচ্ছে দলীয় লোকদের অভয়ারণ্য। অফিসে ঢুকতে দলীয় সেøাগান ও বের হতে টাকা আর স্লোগানের ‘শিল্পীদের’ জনসেবার কোন তোয়াক্কা করতে হয় না। টাকা দিয়ে ঢুকলে তার একমাত্র মিশন থাকে সুদে-আসলে সেই টাকা তুলে নেয়া ও রাজনীতির পরিচয়ে অসৎদের নিয়ে রাজত্ব ও দলীয় বলয় কায়েম করা। এই হচ্ছে, বাংলাদেশের সরকারি অফিস ও রাজনীতির উপাত্থ্যান।
রাজনীতিকদের ছেলেমেয়েরা বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে সেখানেই সেটেল হয়ে যাচ্ছে; না হয় দেশে এসে কোনোরকম প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করেই পোষ্য কোটায় চাকরি পেয়ে সোনার চামচ নিয়ে বসে আছে। অভ্যন্তরীণ প্রমোশন ও সকল পরীক্ষা সবার জন্য উন্মুক্ত না হলে দলীয় ও অলস লোকের অভয়ারণ্য এভাবে চলতেই থাকবে। এমপি, মন্ত্রী, আমলা, মামু, খালুর জোরে জীবনে শুধু একটি পরীক্ষা দিয়েই চিরস্থায়ী নিয়োগ কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। যারা সংসদে আছেন, তাদের ছেলে মেয়েদের চাকরির জন্য কারো দারে দারে ঘুরতে হয় কী? আমলা, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীদের ছেলে মেয়েদের সাধারণ ছাত্র ছাত্রীদের সাথে প্রতীযোগিতায় নামিয়ে দেয়া হোক। তখনই দেখা যাবে, বাবার... সাহায্য ছাড়া কতদূর যেতে পারে!
abunoman1972@gmail.com
মোবাইল- ০১৭১৬৬৬২৯৯৯

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ