ঢাকা, মঙ্গলবার 14 May 2019, ৩১ বৈশাখ ১৪২৬, ৮ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মান-অভিমান ভুলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সিদ্ধান্ত ২০ দলের

গতকাল সোমবার বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশান কার্যালয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে ২০ দলীয় জোটের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার: কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপার্সন ও জোটের শীর্ষ নেতা বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ সমসামিয়ক বিষয় নিয়ে নতুন রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ২০ দল। গতকাল সোমবার বিকেলে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে জোটের এক বৈঠক শেষে  জোটের সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খান একথা বলেন। সাংবাদিকদের ব্রিফিং কালে তিনি দাবি করেন যে, ২০ দলীয় জোটের ঐক্য ছিল, আছে এবং থাকবে। তিনি স্বীকার করে বলেন, জোটের অংশীদারদের মাঝে কিছু ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। কিন্তু তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করা হবে।
২০-দলীয় জোট থেকে ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমানের বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি বের হয়ে যাবার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা তার সাথে যোগাযোগ করছে। আমরা আশা করি আমাদের মধ্যে যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে সেটি আলোচনার মাধ্যমে শেষ হবে এবং আমরা একসাথে কাজ করব, ইনশা আল্লাহ।
২০ দলীয় জোটের প্রধান সমন্বয়কারী নজরুল বলেন, বৈঠকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দাবিসহ সমসাময়িক ইস্যু ভিত্তিক আন্দোলনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্যের মূল্যবৃদ্ধি বৃদ্ধি, ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি, নারী নির্যাতন এবং কৃষকদের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত করার প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করা হবে।
বৈঠকে উপস্থিত বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির সংসদ সদস্যদের শপথ নেয়ার বিষয়টি সবার কাঠে ব্যাখ্যা দেন।  তিনি সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি জোট নেতাদের প্রতি ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য আন্দোলনকে গতিশীল করার উপর জোর দেন।
গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ২০ দলীয় জোটের বৈঠক শুরু হয়। এরপর ইফতার পর্যন্ত বৈঠক চলে। ৩০ ডিসেম্বরে একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর এটি ছিল জোটের তৃতীয় বৈঠক। অনেকটা মান ভাঙাতে কিংবা ক্ষুব্ধতা প্রশমনেই ২০ দলের শরিকদের সাথে এই বৈঠক করে বিএনপি। গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিকাল ৪ টায় বৈঠক শুরু হয়। পরে জোটের শীর্ষ নেতারা একসাথে ইফতার করেন।
জোটের শীর্ষ এক নেতা বলেন, বৈঠকে বিএনপির সমসাময়িক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে জোটের নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তবে সবাই একটি বিষয়ে একমত হন যে, ২০ দলীয় জোট যে উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছে সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করে যাবে। জোট ছিল, আছে এবং থাকবে। এ নেতা আরো বলেন, বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, জোটের যে কোনো বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হবে। ভিন্ন ভিন্নভাবে কেউ কোনো মতামত দিবেনা। প্রতিমাসে একটি বৈঠকের বিষয়ে গুরত্বারোপ করা হয়েছে। এছাড়া একাধিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বিজেপির জোট থেকে বের হয়ে যাবার বিষয়ে জোটের শীর্ষ এ নেতা বলেন, বৈঠকে বিজেপির যে অভিযোগ ছিল সেটার বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন। তবে সবাই বলেছেন, যেহেতু বিজেপি ২০ দলে ছিল এবং জোট নিয়ে তার কোনো ক্ষোভ নেই তাই তিনি তার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেবেন বলেই তারা মনে করেন।
জানা গেছে, ক্ষোভ, মান-অভিমান ভুলে ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে থেকেই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আরো বৃহত্তর পরিসরে সংগ্রাম চালিয়ে যাবে ২০ দলীয় জোট। জোটের বৈঠকে শীর্ষ নেতারা এমন দৃঢ়তার কথাই ব্যক্ত করেছেন। তবে একাদশ সংসদ নির্বাচন ও নির্বাচন উত্তর নানা ইস্যূতে জোটের মধ্যে সৃষ্ট দূরত্ব নিয়ে জোটের অনেক নেতা বৈঠকে নানা প্রশ্ন তুলেছেন। নীতি-নির্ধারণী যে কোন সিদ্ধান্ত জোটকে জানিয়ে গ্রহণের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। একইসাথে জোটকে অবহেলা না করে আরো সক্রিয় করার কথাও বলেছেন কেউ কেউ। খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং দেশব্যাপী ধর্ষণ ও নারী হত্যার প্রতিবাদ এবং কৃষকদের ন্যায্য মূলের দাবিতে রমযানে দুই দিনের অনশন কর্মসূচি পালন করবে ২০ দল।
জানা গেছে, বৈঠকের শুরুতেই একটি দলের চেয়ারম্যান প্রশ্ন তোলেন, কেন একটি শরীক দল ঐক্যফ্রন্ট না ছাড়লে জোট ছেড়ে দেয়ার হুমকী দিলেন। এর উত্তরে লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা: মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, তিনি এ ধরনের কোন কথা বলেননি। গণমাধ্যমে তার কথা উল্টোভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।  নিবন্ধিত দল হওয়া স্বত্ত্বেও জাতীয় নির্বাচনে কোন আসন না দেয়ায় বৈঠকে ক্ষোভ প্রকাশ করে  জাগপা ও মুসলীম লীগ। এই দুই দলের নেতা বলেন, তাদের কোন আসন না দেয়ায় তারা অপমানিত হয়েছেন। নেতা-কর্মীদের কাছে তারা মুখ দেখাতে পারছেন না। তারা যে আরেকবার আন্দোলনে নামবেন, সেই প্রেরণঅ কোথা থেকে আসবে। এসময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দু:খ প্রকাশ করেন এবং আসন বন্টনে নানা সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন।
সিদ্ধান্ত বদল করে  কেন বিএনপির এমপিরা শপথ নিয়েছে, তা নিয়েও একাধিক শরীক বৈঠকে প্রশ্ন তুলেছে। উত্তরে বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, পরিবর্তিত ভূ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সবসময় একইরকমের সিদ্ধান্তে অটল থাকা সম্ভব হয়ে উঠে না।  বৈঠকে জাতীয় পার্টির মোস্তফা জামাল হায়দার ঐক্যফ্রন্টের কিছু কিছু ভূমিকার সমালোচনা করেন। তবে তিনি এও বলেন, দ্ইু জোটের সমন্বয় করা বিএনপি মহাসচিবের পক্ষে খুবই কঠিন কাজ। 
বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থর জোট ছেড়ে চলে যাওয়া নিয়েও  আলোচনা করেছেন নেতারা। বৈঠকে বিএনপি জানায়, এ বৈঠকে আসতে তার সাথে যোগােিযাগ করা হয়েছিল কিন্তু আসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
বৈঠকে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মাওলানা আবদুল হালিম, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি এনপিপি চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমেদ আব্দুল কাদের, ইসলামী ঐক্যজোটের অ্যাডভোকেট আব্দুর রাকিব, লেবার পার্টির ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, পিপলস পার্টির সৈয়দ মাহবুব হোসেন প্রমুখ। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি এলডিপি চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত অলি আহমেদ বৈঠকে যোগ দেননি তবে তার দলের মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। জোট থেকে বের হয়ে যাওয়া বিজেপির কোনো সদস্য বৈঠকে যোগ দেননি।
এদিকে গতকাল রাতে চেয়ারপার্সনের কার্যালয় থেকে বের হবার পথে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, কোর্ট এখন জেলখানার পিছে পিছে ঘুরছে। জেলখানায় ঢুকে পড়েছে। দেশে আইনের শাসনের কি অবস্থা তা দেখতেই পাচ্ছেন। কোর্ট যদি জেলখানায় ঘুরে বেড়ায় তাহলে আর সম্মান থাকে না। এতে করে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা আর কতটুকুই বা থাকে। খালেদা জিয়ার মামলা পরিচালনায় বিশেষ জজ আদালতের বিচারিক কার্যক্রম কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। বিএনপির এ নেতা বলেন, সবকিছুতে স্থান কাল পাত্র ভেদে একটা ব্যাপার আছে না? কোর্ট থাকবে কোর্টের জায়গায়। সেখানে কোর্ট যদি জেলখানায় ঘুরে বেড়ায় সেখানে জনগণের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা এবং এর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন চলে আসে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ