ঢাকা, বুধবার 15 May 2019, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ৯ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে ক্ষোভ-মারামারি-বিদ্রোহ

স্টাফ রিপোর্টার : ছাত্রলীগের সদ্য ঘোষিত কমিটি নিয়ে ক্ষোভ, মারামারি ও বিদ্রোহ থামছে না। সর্বশেষ যোগ হয়েছে পদবঞ্চিতদের কমিটি ভেঙে দেয়ার আলটিমেটাম। কমিটিতে যারা স্থান পেয়েছে তাদের অনেকে বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই বিদ্রোহীদের। কেউ বিবাহিত কেউ ভিন্ন কায়দায় স্থান করে নিয়েছে কমিটিতে এমন অভিযোগ তোলেন তারা।
ছাত্রলীগের সদ্যঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি ভেঙে দিতে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন এই কমিটিতে পদবঞ্চিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই কমিটি ভেঙে দেওয়া না হলে তারা বিক্ষোভ ও অনশন করবেন এবং যে কয়েকজন কমিটিতে স্থান পেয়েছেন, তারা গণপদ্যুাগ করবেন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ‘যোগ্য পদ’ না পাওয়া বা কমিটিতে স্থান না পাওয়া নেতাকর্মীরা এই আল্টিমেটাম দেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে শামসুন নাহার হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও ডাকসু’র কেন্দ্রীয় সদস্য নিপু ইসলাম তন্বী বলেন, ছাত্রলীগের যে কমিটি করা হয়েছে, এতে বিবাহিত, ছাত্রদল সদস্য ও অছাত্র রয়েছে। ত্যাগীদের এই কমিটি থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। অবিলম্বে এই কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি করতে হবে। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই কমিটি ভেঙে না দেওয়া হলে আমরা কমিটি থেকে গণপদ্যুাগ করব, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বিক্ষোভ ও অনশন করব।
অভিযোগ করা হয়, দীর্ঘ দিন ধরে যারা ছাত্রলীগে সক্রিয় এবং সংগঠনের জন্য নিবেদিু হয়ে কাজ করছেন, তাদের নতুন কমিটিতে মূল্যায়ন করা হয়নি। অযোগ্য ও নিষ্ক্রিয়দের বড় বড় পদ দেওয়া হলেও ত্যাগী ও নিবেদিুদের অনেকেই কমিটিতে স্থান পাননি। যারা স্থান পেয়েছেন, তাদেরও উপসম্পাদক ও সদস্যের মতো পদ দিয়ে অবমূল্যায়িত করা হয়েছে। তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী পদ দেওয়া হয়নি। আবার ছাত্রদল করে আসা ও বিবাহিতদেরও স্থান দেওয়া হয়েছে এই কমিটিতে। সে কারণেই ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই কমিটি ভেঙে দিয়ে যোগ্যদের মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে, সোমবার এই কমিটি ঘোষণা দেয়ার পর পদবঞ্চিতরা বিক্ষোভ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। সেসময় বিক্ষোভকারীদের মারধর করা হয়। পরে ওই ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ছাত্রলীগ। তবে সেই কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করছেন বিক্ষোভকারীরা।
রোকেয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি বি এম লিপি আক্তার বলেন, যারা সোমবার আমাদের মারধর করেছে, তাদেরই তদন্তকমিটিতে সদস্য করা হয়েছে। আমরা এই কমিটি মানি না। কমিটি ভেঙে দিয়ে যোগ্যদের মূল্যায়িত করে নতুন কমিটি গঠনের জন্য প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দ্বারস্থ হওয়ার কথা জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।
জসিদ উদদীন হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহেদ খান বলেন, ডাকসু নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছিলেন, ডাকসুতে যাদের স্থান দেয়া সম্ভব হয়নি সেসব ত্যাগী নেতাদের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু সেটা করা হয়নি। তাই আমরা আর আওয়ামী লীগ নেতাদের কথা শুনব না। আমাদের ছাত্রলীগের আদর্শিক নেতা শেখ হাসিনা। আমরা সরাসরি তার কথা শুনব।
এর আগে, কমিটিতে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ঢাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেন পদবঞ্চিতরা। মিছিল থেকেও তারা মিছিল থেকে তারা এই কমিটি ভেঙে দিয়ে যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের কমিটিতে স্থান দেওয়ার দাবি জানান।
দীর্ঘ নাটকীয়তা শেষে সম্মেলনের এক বছর পর ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এতে পদ দেয়া হয়েছে বিবাহিত, অছাত্র, হত্যা ও মাদক মামলার আসামিদের। অতীতে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগবিরোধী অবস্থান ছিল এমন অনেকে পদ পেয়েছেন। ৩০১ সদস্যের এই কমিটিতে স্থান হয়নি বিগত কমিটির প্রথম সারির শতাধিক নেতার। সর্বশেষ সম্মেলনে আলোচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী ছিলেন এমন অনেকের ভাগ্যেও জোটেনি কোনো পদ।
এদিকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে এমন বেশ কয়েকজন রয়েছেন যারা এই প্রথম পদ পেলেন। এ অবস্থায় কমিটিকে বিতর্কিত আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করেছেন পদবঞ্চিত শতাধিক নেতা।
কমিটি পুনর্গঠন না করলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা। ডাকসুর দুই নেত্রীকে (ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেত্রী) লাঞ্ছনার অভিযোগ উঠেছে বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্বের অনুসারীদের বিরুদ্ধে। হামলায় আহত হয়েছেন চার ডাকসু নেতাসহ অন্তত সাত জন।
এর আগে সোমবার দুপুরের দিকে কমিটির তালিকা নিয়ে গণভবনে যান ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। তারা ৩০১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির সদস্যদের সম্পর্কে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করেন।
গণভবন থেকে বের হয়ে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী জানান, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা কমিটির অনুমোদন দিয়েছেন। এরপর ফেসবুকে কমিটি প্রকাশ করা হয়।
যদিও প্রকাশিত কমিটির ওপরে তারিখ লেখা রয়েছে ১১ মে। ফলে এ নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয় প্রথম। কমিটি প্রকাশের পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জড়ো হতে থাকে পদবঞ্চিত ও প্রত্যাশিত পদ না পাওয়া নেতা-নেত্রীরা।
তারা কমিটি প্রত্যাখ্যান করে ইফতারের পূর্বেই বিক্ষোভ শুরু করেন। ওই বিক্ষোভে অংশ নেয়া নারী নেত্রীদের ওপর পদপ্রাপ্ত নেতারা হামলা করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের কমিটির অন্তত অর্ধশতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এদের মধ্যে একজন সহ-সভাপতি হত্যা মামলার আসামী। ছাত্রলীগ করার নির্ধারিত বয়স ২৯ পার হওয়ার পরও পদ পেয়েছেন এমন অন্তত পাঁচজন রয়েছেন।
সহ-সভাপতি সোহানী হাসান তিথি, সহসম্পাদক আঞ্জুমানারা অনু এবং আরও দুইজন সহসভাপতিসহ অন্তত ৬ জন বিবাহিত রয়েছেন কমিটিতে। পরিবার বিএনপি করেন  অন্তত ১৩ জন রয়েছেন কমিটিতে।
এদের মধ্যে সহসভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক পদ পেয়েছেন এমন রয়েছেন অন্তত ৬ জন। অস্ত্র নিয়ে সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন এমন একজন হয়েছেন সহসভাপতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পহেলা বৈশাখের কনসার্টে আগুন দেয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত অন্তত ২০ জন গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন।
এছাড়া সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন এমনও আছেন কমিটিতে। কক্ষে মাদক রাখার অভিযোগে হলচ্যুত একজন হয়েছেন সহসভাপতি। আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রাকিনুল হক চৌধুরী ছোটন বর্তমান কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরীর আপন ছোট ভাই।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ছাত্রলীগের নব ঘোষিত ৩০১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের একটি অংশ বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বর থেকে শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে মধুর ক্যান্টিনের সামনে গেলে নতুন কমিটিতে পদ পাওয়া একজন সহ-সভাপতি ও দুইজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে মিছিলে হামলা চালানো হয়।
লাঞ্ছিত করা হয় ডাকসুর সদস্য, ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় অর্থ বিষয়ক উপ-সম্পাদক ও ঢাবির সুফিয়া কামাল হলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক তিলোত্তমা শিকদার এবং ডাকসুর কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক এবং রোকেয়া হল ছাত্রলীগের সভাপতি বিএম লিপি আক্তারকে। পরে তারা সেখান থেকে বিক্ষোভ করে রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হন।
মিছিলে পদবঞ্চিত অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী অংশ নেয়। পদবঞ্চিত নেতারা সবাই সাবেক সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইনের অনুসারী। যাদের অধিকাংশই সর্বশেষ সম্মেলনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী ছিলেন। ইফতারের পর ফের মধুর ক্যান্টিনের উত্তর পাশে জড়ো হন পদবঞ্চিতরা। সেখানে তারা কমিটি পুনর্গঠন করে সবার সমন্বয়ে তা গঠনের দাবি জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ