ঢাকা, বুধবার 15 May 2019, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ৯ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মামলার বিচার সংকট ও পুলিশী ব্যবস্থার সংস্কার

ড. মো. নূরুল আমিন : মাদক বিরোধী অভিযানের মতো খাদ্যে ভেজাল মেশানোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার জন্য হাইকোর্ট প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রয়োজনে ভেজাল রোধে জরুরী অবস্থা ঘোষণার অনুরোধ করেছেন। এক রিটের প্রেক্ষাপটে গত পরশু রোববার ভেজাল ও নি¤œমান প্রমাণিত হওয়া ৫২টি খাদ্যপণ্য অবিলম্বে বাজার থেকে প্রত্যাহার করার নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্টের তরফ থেকে এই অনুরোধ জানানো হয়।
উল্লেখযোগ্য যে, বাংলাদেশের উচ্চ আদালত এর মধ্যে বেশকিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। আদালত ব্যাংক দুর্নীতি নিয়েও কথা বলেছেন এবং বড় বড় ঋণ খেলাপীদের তালিকা প্রকাশের জন্য সরকারকে নির্দেশনা দিয়েছেন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। বিচার কাজের বাইরে আদালতের এই কাজগুলো আমাদের প্রশাসন ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোকে সংশোধনের একটা সুযোগ করেই দিচ্ছে না বরং রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার অথর্বতার প্রতিও দিক নির্দেশ করছে যা আমাদের সমাজ ব্যবস্থার উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। উচ্চ আদালতের এই নির্দেশনাগুলো নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। আদালতের মামলা জট এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে আদালত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যাপারেও যদি মহামান্য আদালত অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন তাহলে দেশবাসী উপকৃত হবে।
মাস খানেক আগে আদালতে মামলার জট এবং তা নিরসনে বিচার বিভাগীয় কিছু কাজকর্ম বেসরকারীকরণের সম্ভাব্যতা নিয়ে আমি এই স্তম্ভে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। আমার কথা যে মহামান্য সুপ্রীমকোর্ট -এর পর মামলা জটও তা নিরসন নিয়ে কিছু মন্তব্য করেছেন এবং নির্দেশনা দিয়েছেন। এই নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে প্রতিপালন করা হোক এটা সকলেরই কাম্য। তবে অধঃস্তন ও প্রশাসনিক পর্যায়ে এগুলো খুব একটা গুরুত্বের সাথে নেয়া হচ্ছে বলে মনে হয় না।
পত্র-পত্রিকায় দেখলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার রিপোর্ট প্রদান ৬৫ বারের মতো পিছিয়েছে। মামলাটি সাগর-রুনীর হত্যা মামলা। মামলার রিপোর্ট পেশ করার জন্য আদালত তদন্তকারী পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিল কিন্তু সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তা রিপোর্ট না দিয়ে সময় নিচ্ছেন এবং এই সময় নেয়ার কার্যকাল ৬৫ বার পিছিয়েছে। এই যদি অবস্থা হয় তাহলে বিচার হরে কিভাবে? এই ক্ষেত্রে বিচারক তদন্তকারী পরিবর্তন করতে পারেন, তার কাছ থেকে বিলম্বের ব্যাখ্যা তলব করতে পারেন অথবা রিপোর্ট ও সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে মামলা খারিজ করে দিতে পারেন। তবে শেষোক্ত ক্ষেত্রে এটি অবিচার হবারই সম্ভাবনা বেশী। আমাদের মাননীয় আদালত ভুল আসামীর জেলখাটা এবং সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ আদায়ে যেখানে সোচ্চার সেখানে অবিচার প্রশ্রয় দিবেন তা ভাবা যায় না।
ইতোপূর্বে আমি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আদালতে বিচারাধীন ৩৫ লক্ষ মামলার কথা বলেছিলাম। এ মামলার বাইরে আরো প্রায় ৩০ রক্ষ মামলা আছে যেগুলো রাজনৈতিক কারণে পুলিশের দায়ের করা মামলা। এই মামলাগুলো বাংলাদেশের বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিচ্ছে। এখানে খুব কম মামলা আছে যেখানে পুলিশকে পয়সা দিতে হয় না। পয়সা দিতে হয় নির্যাতন না করার জন্য, রিমান্ডে না নেয়ার জন্য, সহজ ধারায় মামলা দেয়ার জন্য এবং আরো কতো কি! পয়সা খায় থানার ইট এবং আদালতের দেয়ালও। উকিলরা তো আছেই। একটা মামলা মানে সর্বস্বান্ত হওয়া। আমাদের উচ্চ আদালত নিরপরাধ মানুষকে সর্বস্বান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারেন।
ত্রিশ লক্ষ পুলিশী মামলা বা ৩৫ লক্ষ বিচারাধীন মামলা যাই বলা হোক না কেন এগুলো নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু পুলিশ কি আদালতের অধীন।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন  যে ন্যায় বিচারের জন্য পুলিশী ব্যবস্থা অপরিহার্য হলেও এই উপমহাদেশের পুলিশ কর্মকর্তারা অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছেন। বৃটিশ সরকার স্থানীয় পুলিশকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নিয়ন্ত্রণে রাখতেন। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা মামলার বিচার করতেন, সঙ্গে সঙ্গে তারা জনগণের সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং মফস্বল অঞ্চলে নিয়মিত সফর করতেন। এর ফলে পুলিশ কোন বড় ধরনের খারাপ কাজ করলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তার প্রতিকার করতে পারতেন।
বাংলাদেশে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা হয়েছে। এর ফলে আইনজীবীরা এবং পুলিশ লাভবান হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আইনজীবীরা মনে করেন যে বিচার বিভাগ-নিয়ন্ত্রিত বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ করা তাদের জন্য সহজ। এখানে আরো একটি প্রশ্ন উঠেছে। বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা হবার পর পুলিশের ওপর কার নিয়ন্ত্রণ থাকবে এ বিষয়টির নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। পুলিশ কর্তৃক গায়েবী মামলা প্রদান অথবা আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও বার বার মামলার তদন্ত রিপোর্ট প্রদানের গাফেলতি প্রভৃতি মূল কারণ তাদের এই নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থা।
বাংলাদেশে পুলিশের দায়ের করা মামলায় শাস্তির হারের উপর একাধিক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে এখানে তিন চতুর্থাংশ মামলাই প্রমাণের অভাবে খারিজ হয়ে যায়, এক চতুর্থাংশ মামলায় কিছু কিছু প্রমাণ মিলে। তবে সাম্প্রতিক বাংলাদেশে ভুয়া মামলার আধিক্য এত বেশি যে সত্যতার মাত্রা ৫ শতাংশেরও নীচে নেমে এসেছে। এ ক্ষেত্রে লক্ষ লক্ষ মামলার কোটি কোটি আসামীদের যদি আদালত ন্যায় বিচার দিতে চান তাহলে বিচার কাজের বেসরকারিকরণ ছাড়া আর কোন উপায় আছে বলে মনে হয় না। এ ক্ষেত্রে আদালত পুলিশ ব্যবস্থার পুনর্গঠনের জন্যও উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন।
 দেখা গেছে যে কমন ল ‘আইনের’ আদলে বর্তমানে বাংলাদেশে যে আইনী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাতে আইনজীবীরাই বিচার কাজের পরিচালক। এই অবস্থায় কিছু সংস্কার অপরিহার্য। সংস্কার গুলো হচ্ছে:
(১) সাক্ষ্য আইনের পরিবর্তন ও বৃটিশ সিভিল ল’ ব্যবস্থার অনুকরণে ইনকুইজোটারিয়ান ব্যবস্থার ব্যবর্তন।
(২) দুর্নীতিবাজ আইনজীবীদের শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা বর্তমানে বার কাউন্সিলের উপর অর্পিত রয়েছে। বার কাউন্সিল আইনজীবীদের  প্রতিষ্ঠান। তারা এ ক্ষেত্রে যথাযথ পদক্ষেপ নেয় না। কাজেই এই দায়িত্ব বিচারকদের উপর অর্পণ করা যেতে পারে।
(৩) দুর্নীতিবাজ আইনজীবীরা আদালতকে চাপে রাখার চেষ্টা করেন। আইনজীবীদের আদালত বর্জন যেমনি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন তেমনি তাদের অভিযোগ তদন্তে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণও অপরিহার্য।
এখানে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে পুলিশী ব্যবস্থার সংস্কার। কেননা ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা পুলিশী  ব্যবস্থার কার্যকারিতার উপর নির্ভর করে। এই অবস্থায় ন্যায় বিচারের স্বার্থে পুলিশী ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। পুলিশকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য স্বতন্ত্র একটি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা থাকা প্রয়োজন। এই কাজের দায়িত্ব মানবাধিকার কমিশনকে দেয়া যেতে পারে। কমিশন প্রতিটি জেলায় একজন উপযুক্ত পরিদর্শক নিয়োগ করে স্থানীয়ভাবে পুলিশকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
নি¤œস্তরে নির্বাহী ব্যবস্থা থেকে বিচার ব্যবস্থাকে আলাদা করার ফলে নতুন করে পুলিশ কোড ও জেল কোড প্রণয়ন করার প্রয়োজনীয়তাও দেখা দিয়েছে। (৪) বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় গরীবদের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সীমিত। ধনীরা বিচার কিনতে পারে, গরীবরা পারে না। এই  পরিস্থিতিতে বিরোধ নিস্পত্তির বিকল্প ব্যবস্থার উপর গুরুত্ব প্রদান অপরিহার্য। বলা বাহুল্য যুগ যুগ ধরে আমাদের দেশে তৃণমূল পর্যায়ে সালিশী ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল এবং এখনো আছে। অপরাধের বিচার ও অপরাধ রোধে এই ব্যবস্থা অত্যন্ত ফলপ্রসু ছিল। সাম্প্রতিককালে নানাভাবে বিরোধী নিস্পত্তির বিকল্প এই ব্যবস্থাকে নিরুৎসাহিত করার কিছু প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
এই ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। আদালতের উপর চাপ কমানোর এটি হচ্ছে উৎকৃষ্ট একটি পন্থা। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের আওতায় যে সমস্ত শালিসী আদালত রয়েছে সেগুলোকেও শক্তিশালী করা দরকার বলে আমি মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ