ঢাকা, বুধবার 15 May 2019, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ৯ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আগুন নিয়ে খেলবেন না সর্বনাশ হবে

স্টাফ রিপোর্টার : বিএনপির কারাবন্দী চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মামলা পরিচালনার জন্য কেরাণীগঞ্জের কারাগারে আদালত বসানোর যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে তার কঠোর সমালোচনা করে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী সরকারের উদ্দেশে বলেছেন, আগুন নিয়ে খেলবেন না, হিংসার আগুনে আপনাদেরই সর্বনাশ হবে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
রিজভী বলেন, লন্ডন থেকে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পরপরই সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নির্দেশনা দিয়েছে খালেদা জিয়ার মামলা পরিচালনার জন্য কেরানীগঞ্জের কারাগারে আদালত বসাতে। গুরুতর অসুস্থ দেশনেত্রীকে পিজি হাসপাতাল থেকে কেরানীগঞ্জ কারাগারে নেয়ার চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র চলছে। উল্লেখ্য, গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেই দিয়েছেন, চিকিৎসা শেষে খালেদা জিয়াকে কিরাণীগঞ্জের কারাগারে পাঠানো হবে।
রিজভী বলেন, গুরুতর অসুস্থ খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সম্পন্ন হয়নি, তিনি এখনও বেশ অসুস্থ। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে শিগগিরই কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে নতুন নির্মিত মহিলা কম্পাউন্ডে স্থানান্তর করার অশুভ আয়োজন চলছে বলে গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। তার নামে ১৭টি মিথ্যা মামলার বিচার কার্যক্রম ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কারাগার থেকে কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তরের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
রিজভী বলেন, দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষ আশা করেছিলেন, এই পবিত্র রমযানে অন্তত হিংসা-বিদ্বেষ, রাগ-ক্রোধ, লোভ-মোহ, প্রতিহিংসা-জিঘাংসা থেকে আত্মশুদ্ধি লাভ করবে সরকার ও সরকার প্রধান। জনগণের নেত্রীকে মুক্তি দিয়ে জনগণের মাঝে ফিরে আসতে দেয়া হবে। একজন নিরপরাধ ৭৪ বছর বয়সী চারবারের প্রধানমন্ত্রীকে মিথ্যা মামলায় অন্যায়ভাবে সাজা দিয়ে কারাবন্দী করে মধ্যরাতের সরকার যে অপরাধ করেছে তা থেকে নিজেদের শুধরে নেবে তারা। কিন্তু বাস্তবে তারা প্রতিহিংসাপরায়ণ মানসিকতা ত্যাগ করতে পারেননি। আদালতকে কুক্ষিগত করে রেখে বেগম জিয়ার জামিনে পদে পদে বাধা দেয়া হচ্ছে।
বিএনপির এই নেতা বলেন, আমরা সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলতে চাই, আগুন নিয়ে আর খেলবেন না। এই হিংসার আগুনে একদিন হয়তো আপনাদের নিজেদেরই সর্বনাশ হবে। বাংলাদেশের মানুষের প্রিয় নেত্রী, গণতন্ত্রের মা খালেদা জিয়ার জীবন নিয়ে যে ছিনিমিনি খেলছেন এবার সেই ‘ডার্টি গেইম’ বন্ধ করুন। জামিনে হস্তক্ষেপ বন্ধ করুন। আদালতের ওপর প্রভাব বিস্তার বন্ধ করুন। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবেন না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য আদালতের স্বাধীনতাকে কারাগারে বন্দি করবেন না।
রিজভী বলেন, অবিলম্বে দেশনেত্রীকে মুক্তি দিতে হবে। আপনাদের বর্বর মতলব জনগণের কাছে ফাঁস হয়ে গেছে। জনগণ আর আপনাদেরকে রেহাই দেবে না। সরকার যদি বারবার দেশনেত্রীর জামিনে বাধা দেয় তবে রাজপথেই হবে ফয়সালা। অন্যায়কারী-জুলুমবাজরা কখনও বিজয়ী হতে পারেনি। এই মধ্যরাতের সরকারও পারবে না। এখন বাংলাদেশের সব জনগণ একদিকে আর বর্তমান শাসকগোষ্ঠী আরেক দিকে। দিনের শেষে জনগণের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।
রিজভী বলেন, এদেশের প্রান কৃষকদের এখন নাভিশ্বাস দশা। ধান চাষ করে লোকসান দিয়ে তাদের পথে বসার অবস্থা হয়েছে। কৃষকের ঘরে ঘরে এখন হাহাকার। এই মিডনাইট ইলেকশনের সরকারের হঠকারী সিদ্ধান্ত, বিদ্যুৎ-জ্বালানী ও সারের মূল্য বৃদ্ধিসহ কৃষকদের প্রতি উদাসীনতার কারনে উৎপাদন খরচ উঠছে না কৃষকের। প্রতি মন ইরি-বোরো ধানে লোকসান দিচ্ছেন ২০০ টাকা করে। বর্গাচাষিরা সর্বশান্ত হয়ে যাচ্ছেন। বিঘা প্রতি জমিতে লোকসান দিচ্ছে ৫ হাজার টাকা। লোকসানের পর ব্যাংক ঋণ, এনজিও’র কিস্তি, মহাজন ও সার-কীটনাশক ব্যবসায়ীদের দেনা শোধ করা দায় হয়ে পড়েছে। নানা ঋণে জর্জরিত কৃষক ক্ষোভে দু:খে কষ্টে ধানের দাম না পেয়ে পাকা ধানক্ষেতে আগুণ দিচ্ছেন। বিক্ষোভ করছেন। সড়কে ধান ছিটিয়ে প্রতিবাদ করছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে ধান ক্ষেতে আগুন দেয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। এই ভোটারহীন ভূয়া সরকারের বিরুদ্ধে কৃষককুলের এমন অভিনব প্রতিবাদ দেখে দেশের মানুষ আজ বেদনাহত।
তিনি বলেন, ধান হচ্ছে মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান উপকরণ। সেই ঘামনিংড়ানো ধানক্ষেতের ফসলে কখনও আগুন দিতে চায় কৃষক? টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার পাইকড়া ইউনিয়নের বানকিনা গ্রামের কৃষক আব্দুল মালেক শিকদার তার ধানক্ষেতে আগুন দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন তারা কত নিরূপায়, কত অসহায়, কতটা হতাশায় নিমজ্জিত। গাইবান্ধা জেলা ফুলছড়ি উপজেলার মদনেরপাড়া বাজারে রাস্তার ওপরে ছড়ানো পাকাধানে আগুন লাগিয়ে বিক্ষোভ করেছেন কৃষকরা।
এবারে ইরি-বোরো ধানের প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায়, অথচ এই পরিমাণ ধানের উৎপাদন খরচই পড়ে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা। অন্যান্য বছরে ধানের দাম ছিল ১০০০ টাকা থেকে ১১০০ টাকা। এক মন ধান থেকে ২৬-২৮ কেজি চাল পাওয়া যায, যা ৪০ টাকা দরে হলেও ১০৪০ থেকে ১১২০ টাকা পাওয়ার কথা, সেখানে প্রতি মন ধানের দাম এবারে ৫০০ টাকার নিচে! সরকারের লুটপাট পলিসির কারনে আজ কৃষকরা চারদিকে অন্ধকার দেখছেন। পরমুখাপেক্ষী গণবিরোধী অবৈধ সরকারের কৃষিবিরোধী নীতির কারণে কৃষকরা ধান ক্ষেতে আগুণ দিতে বাধ্য হচ্ছে। এই অবৈধ সরকার কৃষকদেরকে হাতেও মারছে, ভাতেও মারতে চাচ্ছে। কৃষকদের পীঠ আজ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে অযোগ্য অথর্ব ও গণবিরোধী সরকার। এই গণদুশমন সরকারের যদি ন্যুনতম বিবেক বোধ থাকে তবে আজই পদত্যাগ করা উচিত। সবচেয়ে বড় আশংকার কথা হলো, কৃষকরা যদি লোকসান থেকে বাঁচতে আগামীতে ধানের ফলন কমিয়ে দেয়, তাহলে কি উপায় হবে? যার অবধারিত ফলাফল-দুর্ভিক্ষ। কৃষক ও কৃষি বাঁচাতে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারীভাবে ধান কিনতে হবে, কৃষকদেরকে হাজার টাকা দাম দিতে হবে, কৃষি উপকরণ ও সার বীজে ভর্তুকি দেয়ার জন্য দলের পক্ষ থেকে জোর দাবী জানাচ্ছি। ধান, ভুট্টাসহ সব কৃষি পণ্যের লাভজনক মূল্য নিশ্চিত করাসহ সকল ইউনিয়নে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র চালু করে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত মূল্যে ধান ক্রয় করার ব্যবস্থা নিতে হবে দ্রুত। বিএনপির নেতা-কর্মীদের প্রতি আহবান জানাবো-সর্বশান্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়ান। এই জালিম ও কৃষকবিরোধী, মানুষের আহার হরণকারী লুটেরা সরকারের বিরুদ্ধে কৃষকদের নিয়ে, আসুন আমরা প্রতিরোধ গড়ি তুলি।
বিএনপির এই নেতা বলেন, দেশে কর্মসংস্থানের অভাবে চাকরির জন্য জীবনবাজি রেখে ইতালী পাড়ি দিতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে ডুবে মারা গেছেন আমাদের ৩৭ জন হতভাগ্য ভাই। তাদের জন্য আমরা গভীরভাবে শোকাহত। এর আগেও মালেশিয়াসহ ইউরোপীয় দেশগুলোতে অবৈধ পন্থায় প্রবেশ করতে গিয়ে প্রাণহানী ঘটেছে অনেক বাংলাদেশী যুবকদের। মিডনাইট সরকারের বিনা ভোটের মন্ত্রীরা কেউ বাংলাদেশকে কানাডা-স্পেনের সাথে তুলনা করছেন, কেউ প্যারিস-লসএঞ্জেলস-সিঙ্গাপুরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা বলছেন। আবার নির্লজ্জের মতো এই সরকারের মন্ত্রীরা বলছেন, সুইজারল্যান্ডের মন্ত্রী নাকি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এক টুকরো বাংলাদেশ চায়, আবার বেলজিয়াম নাকি বাংলাদেশ মডেলে চলতে চায়!!
সরকারের উদ্দেশ্যে বলতে চাই-চাপাবাজী দিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে পারবেন না। আপনাদের উদ্ভট-অবাস্তব ও কান্ডজ্ঞানহীন কথাবার্তায় মানুষ হাসাহাসি করে, আমোদিত হয়। বাস্তবতা হলো জনগণের ভোট ছাড়াই জোর করে জনগণের ঘাড়ে চড়ে বসা এই মিডনাইট ভোটের সরকার দেশকে লুটপাট করে অর্থনীতিকে ফাঁপা-ফোকলা করে দিচ্ছে। বাড়ছে বেকারত্ব। ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডার, অনুগত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসনের জুলুম ও অব্যবস্থাপনায় দিনকে দিন বসবাসের অযোগ্য হচ্ছে দেশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবেই ৪ কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার কর্মক্ষম মানুষ বেকার। যুব সমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টির কোনও বাস্তবসম্মত সরকারি পদক্ষেপ নাই। যুবশক্তি আজ পথহারা। হতাশায় নিমজ্জিত তরুণদের মধ্যে মাদকাশক্তির প্রবণতা বাড়ছে। নিরাপত্তা আর কাজের অভাবে দেশ ছেড়ে গিয়ে সাগরে সলিল সমাধি ঘটছে টকবগে তরুনদের।
প্রায়শ:ই এমন ঘটনার খবর আসছে, কিন্তু সরকার আছে নির্বিকার। মিথ্যা প্রপাগান্ডার জোয়ারে ভাসছে এই অন্ধকারের সরকার। এক দশক আগে এই সরকার বলেছিল, ঘরে ঘরে চাকরি দেবে। ১০ টাকা সের চাল খাওয়াবে। কিন্তু চাকরি না হোক, মানুষ তো চায় কাজ। সরকার দেশে কর্মসংস্থান করতে পারে না, কিন্তু বেসামাল মন্ত্রীরা উন্নয়নের কল্পিত গল্প শোনায়, কৃত্রিম জিডিপি এবং প্রবৃদ্ধির গল্প বানায়। তাদের তথাকথিত উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরল হতভাগ্য ৩৭ বাংলাদেশী। তাদের স্বজনদের শোকের মাতম কে দেখবে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ