ঢাকা, বুধবার 15 May 2019, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ৯ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

হত্যাকারী বহিরাগত ধারণা পুলিশের ॥ আলামত সংগ্রহ সিআইডির

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর উত্তরখানে মা ও দুই সন্তানকে হত্যায় জড়িতরা বহিরাগত বলে ধারণা করছে পুলিশ। বিষয়টি নিশ্চিত হতে গতকাল মঙ্গলবার অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক দল ওই বাসা থেকে আলামত সংগ্রহ করে। মেঝে ও বিছানায় পড়ে থাকা রক্ত, চাদর, পোশাক, বটি, ছুরি এবং আসবাবপত্র থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।  ক্রাইম সিন ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার তৌহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে ৭ জনের একটি দল এদিন আলামত সংগ্রহ করে।
তৌহিদুল ইসলাম বলেন, বাইরে থেকে কেউ বাসায় প্রবেশ করে হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে কি না তা জানার চেষ্টা চলছে। মরদেহের পাশে দু’টি চিরকুট পাওয়া গেছে। চিরকুটে আঙ্গুলের ছাপ আছে কি না তা ল্যাবে পরীক্ষা করা হবে। সেই সঙ্গে হাতের লেখা দু’টি কার তা নিশ্চিত হতে চিরকুট দু’টি হ্যান্ড রাইটিং এক্সপার্টের কাছে পাঠানো হবে।
এর আগে ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, মা জাহানারা বেগমের গলায় ও পেটে ছুরিকাঘাতের হালকা দাগ রয়েছে। তবে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া মেয়ে তাসফিয়া সুলতানা মীমকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ছেলে মুহিব হাসানকে হত্যা করা হয়েছে গলা কেটে।
এছাড়া ভিসেরা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সেই প্রতিবেদন হাতে এলে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে জানান ডা. সোহেল মাহমুদ চৌধুরী।
 রোববার রাতে (১২ মে) উত্তরখানের ময়নারটেক এলাকার একটি বাসা থেকে জাহানার বেগম মুক্তা (৫০), তার মেয়ে তাসফিয়া সুলতানা মীম (২০) ও ছেলে মুহিব হাসানের (৩০) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ডা. সোহেল মাহমুদ আরও বলেন, ‘ধারণা করা হচ্ছে ৭২ ঘণ্টা আগে তাদের হত্যা করা হয়েছে। সুতরাং হত্যার অনেক আলামতই এই সময়ের মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। তারপরও আমরা নিশ্চিত হতে পেরেছি, ওই তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে।’
এদিকে বিষয়টিকে আত্মহত্যা বলে দাবি করেছেন জাহানার দেবর আহসানুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘চারটি কারণে তারা আত্মহত্যা করতে পারে বলে মনে হচ্ছে। অসময়ে স্বামীর মৃত্যু, স্বামীর পেনশনের টাকা না পাওয়া, ছেলে মুহিবের বেকারত্ব ও প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে উদ্বেগ। তবে আমাদের সঙ্গে তাদের ভালো সম্পর্ক ছিল। কোনো পারিবারিক ঝামেলা ছিল না।’
সূত্র জানায়, জাহানারার বাড়ি কুমিল্লার তিতাস উপজেলার কান্দি গ্রামে। তার শ্বশুর বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামে। ছেলে মুহিব বিবিএ শেষ করে চাকরির চেষ্টা করছিলেন। গত ৩ মে অনুষ্ঠিত বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশও নেন তিনি।
জাহানারার স্বামী ইকবাল হোসেন মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) ব্যবস্থাপক পদে কর্মরত অবস্থায় ২০১৬ সালে মারা যান। তার মৃত্যুর পরেই আর্থিক সংকটে পরে পরিবারটি। স্বামীর ভিটায় জায়গা হয়নি জাহানারার।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আহসানুল্লাহ বলেন, ‘আমরা চার ভাই, তিন বোন। পৈতৃক সূত্রে ৪ শতাংশ জমি পেয়েছিলাম। সেখানে চার কক্ষের একটি বাড়ি রয়েছে। আমি এবং আমার দুই ভাই সেখানে থাকি। জায়গা সংকট হওয়ায় পাশেই একটি বাসায় ভাড়া থাকতো তারা।’
সূত্র আরও জানায়, চলতি মাসের ৫ তারিখে ভৈরব থেকে ঢাকায় আসেন তারা। পৈত্রিকসূত্রে উত্তরখানে জমি পেয়েছিলেন জাহানারা। বাবার নামে থাকা ওই সাড়ে ৪ কাঠা জমির অংশীদার তারা চার ভাই-বোন। ওই জমিতে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাসের উদ্দেশ্যেই ঢাকায় এসেছিলেন জাহানারা। জমিটির পাশেই ময়নারটেকের ৩৪/বি নম্বর বাসাটি তিনি ভাড়া নেন। যদিও জাহানারা তার নিজের অংশ বুঝে পাননি। অন্যদিকে পৈত্রিক সম্পত্তি হলেও, জমি দখলে নিতে তার ভাইকে টাকা দিতে হয়েছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তার বড় ভাই মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি আমেরিকায় থাকা অবস্থায় ১৯৯৮ সালে আমার টাকা দিয়ে বাবা ওই জমিটি তার নিজের নামে কিনেছিলেন। যেহেতু জমিটা আমার টাকা দিয়ে কেনা হয়েছিল তাই পরবর্তীতে আমার অন্য দুই বোন ও এক ভাই আমাকে টাকা পরিশোধ করে।’
তিনি বলেন, ‘আমার এক বোন অস্ট্রেলিয়াতে আর ছোট ভাই আমেরিকায় থাকে। এ জন্য জমি বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। তবে জাহানারাকে বাড়ি করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। জাহানারাকে আমরা সবাই মিলে সহযোগিতা করতাম। মেয়েকে নিয়ে প্রায়ই হতাশা প্রকাশ করতো সে। মেয়ে মীম কারো কথা শুনতো না। যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াত। কলিংবেল টিপে অন্যের বাসায় ঢুকে যেত। অনেক সময় না খেয়ে থাকত। আবার গোসল না করেই কয়েকদিন কাটিয়ে দিত।’
চিরকুটে স্বজনদের অবহেলার অভিযোগ করেছিলেন জাহানারা- সে প্রসঙ্গে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এটা কী কারণে লিখেছে তা আমার জানা নেই। তবে আমার জানা মতে, সবাই তাদের খোঁজ-খবর নিত এবং সাহায্য করত।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ