ঢাকা, বৃহস্পতিবার 16 May 2019, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১০ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ফারাক্কা দিবস

আজ ১৬ মে, ঐতিহাসিক ফারাক্কা মিছিল দিবস। ১৯৭৬ সালের এই দিনে বাংলাদেশের জাতীয় নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর আহ্বানে ভারতের নির্মিত ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার এবং বাংলাদেশকে গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করার প্রতিবাদে লাখ লাখ মানুষের এক মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। রাজশাহীর মাদরাসা ময়দানে মওলানা ভাসানীর দেয়া ১০ মিনিটের ভাষণের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া মিছিলটি রাজশাহী থেকে প্রেমতলী, নবাবগঞ্জ ও শিবগঞ্জ হয়ে কানসাটে পৌঁছানোর পর ১৭ মে মিছিলের সমাপ্তি টেনেছিলেন মওলানা ভাসানী। কানসাট হাই স্কুল ময়দানের সমাবেশে তিনি গঙ্গার পানিতে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যার ন্যায়সঙ্গত দাবি মেনে নিতে ভারত সরকারকে বাধ্য করার জন্য বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।
বলা দরকার, মওলানা ভাসানীর দিক থেকে ফারাক্কা মিছিল কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি ছিল না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সমর্থন দেয়াকে পুঁজি বানিয়ে স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রাথমিক দিনগুলোতেই ভারতের আধিপত্যবাদী কংগ্রেস সরকার বাংলাদেশকে অবাধ লুন্ঠনের ক্ষেত্রে পরিণত করেছিল। বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমেও বাংলাদেশকে ভারতের ইচ্ছাধীন করা হয়েছিল। চুক্তিগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল ১৯৭৪ সালের ১৬ মে স্বাক্ষরিত ‘মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি’ বা যৌথ ইশতেহার। এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত ফারাক্কা বাঁধ চালু করার জন্য বাংলাদেশের সম্মতি পেয়েছিল। এ ব্যাপারেও ভারত নিয়েছিল চাতুরিপূর্ণ কৌশল। বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধীর যুক্ত ইশতেহারে বলা হয়েছিল, ফারাক্কা বাঁধ সম্পূর্ণরূপে চালু করার আগে শুষ্ক মৌসুমে প্রাপ্ত পানির পরিমাণ নিয়ে উভয়পক্ষ যাতে সমঝোতায় আসতে পারে সেজন্য ভারত প্রথমে ‘পরীক্ষামূলকভাবে’ ফিডার ক্যানেল চালু করবে। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে ভারত ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৪১ দিনের জন্য ফারাক্কা বাঁধ চালু করেছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও ভারত ফিডার ক্যানেল দিয়ে পানি প্রত্যাহার অব্যাহত রাখে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো সমঝোতা বা চুক্তি না করেই ১৯৭৬ সালের শুষ্ক মৌসুমে একতরফাভাবে গঙ্গার পানি নিয়ে যায়। এর ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে পদ্মায় পানি প্রবাহ ৬৫ হাজার কিউসেক থেকে নেমে আসে মাত্র ২৩ হাজার ২০০ কিউসেকে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে সর্বনাশ সূচিত হয়।
এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মওলানা ভাসানী প্রথমে পরপর দুটি চিঠির মাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা দেয়ার আহ্বান জানান। তার সে আহ্বান সুকৌশলে প্রত্যাখ্যান করেন ইন্দিরা গান্ধী। এরপরই গঙ্গার পানি বন্টন এবং ফারাক্কা বাঁধের মীমাংসাকে ‘বাংলাদেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য হায়াত ও মউতের প্রশ্ন’ হিসেবে উল্লেখ করে ১৮ এপ্রিল  ফারাক্কা মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন মওলানা ভাসানী। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল বলে মওলানা ভাসানী মিছিলের জন্য ওই দিনটিকেই বেছে নিয়েছিলেন। অন্যদিকে মিছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ হবে জানানো হলেও এই মিছিলের আতংকে ভারত সরকার রীতিমতো যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ভয়ে ভারতকে যখন সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করতে হয়েছে তখন তার উচিত অবিলম্বে ফারাক্কা সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসা।’ ভারত অবশ্য সে আহ্বানে সাড়া দেয়নি।
ভারতের অবন্ধুসুলভ মনোভাবের কারণে মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা মিছিল সমস্যার স্থায়ী সমাধান অর্জন করতে পারেনি সত্য, কিন্তু এ কথাও স্বীকার করতে হবে যে, মূলত এই মিছিলের জনপ্রিয়তা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর ব্যাপক প্রচারণার ফলেই ভারতকে বহুদিন পর বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে হয়েছিল। সরকার প্রধান হিসেবে জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালেই জাতিসংঘে ফারাক্কা বাঁধের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন এবং সাধারণ পরিষদের রাজনৈতিক কমিটির সর্বসম্মত বিবৃতির ভিত্তিতে শুরু হওয়া ভারত ও বাংলাদেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে ১৯৭৭ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকায় স্বাক্ষরিত হয় ‘ফারাক্কা চুক্তি’। এই চুক্তিতে বাংলাদেশের অনুক’লে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ থাকায় ভারত কখনো যথেচ্ছভাবে পানি প্রত্যাহার করতে কিংবা বাংলাদেশকে কম হিস্যা দিতে পারেনি।
অবস্থায় পরিবর্তন ঘটেছিল ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর। ১৯৯৭ সালের মার্চেই ভারত দিয়েছিল সর্বনিম্ন পরিমাণ পানি, যা ছিল একটি রেকর্ড। সে বছরের ২৭ মার্চ বাংলাদেশ পেয়েছিল মাত্র ছয় হাজার ৪৫৭ কিউসেক পানি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারত ৬৫ শতাংশেরও বেশি পানি আগেই উজানে উঠিয়ে নিয়েছিল। অথচ পূর্ববর্তী বিএনপি সরকারের সময় ১৯৯৫ সালের ২৭ মার্চও বাংলাদেশ পেয়েছিল ১৬ হাজার ৮৮১ কিউসেক পানি। ১৯৭৭ সালের চুক্তির ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ছিল এর কারণ। এটাই ছিল মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা মিছিলের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। ওই মিছিলের ফলে গঙ্গার পানির ওপর বাংলাদেশের ন্যায়সঙ্গত দাবি ও অধিকার স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
সবশেষে বলা দরকার, ফারাক্কা মিছিলের মাধ্যমে মওলানা ভাসানী গঙ্গাসহ অভিন্ন ৫৪টি নদ-নদীর পানির ওপর বাংলাদেশের দাবি ও অধিকার আদায়ের পথ দেখিয়ে গেলেও কোনো সরকারই বিষয়টি নিয়ে ভারতের সঙ্গে বলিষ্ঠ অবস্থান নেয়নি। এমন অবস্থার সুযোগ নিয়ে ভারত তার পানি আগ্রাসনই শুধু অব্যাহত রাখেনি, প্রকাশ্যে অঙ্গিকার করেও আজ পর্যন্ত তিস্তা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। ভারত বরং টিপাইমুখ বাঁধসহ অসংখ্য বাঁধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে পানিবঞ্চিত করে চলেছে। আমরা মনে করি, আজকের দিনে বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা মিছিলের মূল শিক্ষা অনুধাবন করা এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে পানি আগ্রাসন বন্ধ করার জন্য ভারতের কাছে দাবি জানানো। একই সঙ্গে ভারতের ওপর কূটনৈতিক পর্যায়ে চাপও সৃষ্টি করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ