ঢাকা, বৃহস্পতিবার 16 May 2019, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১০ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

খামার বাংলার মানুষরা কেমন আছে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘বলা হচ্ছে দেশের উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু এই উন্নতির অন্তরালে মানুষ আর্তনাদ করছে। রাষ্ট্রের কোনো মানুষ নিরাপদে নেই। এমন অনিরাপদ অবস্থা আমরা ’৭১ সালেই দেখেছিলাম। এর বড় উদাহরণ হচ্ছে ধর্ষণ। এসব অন্যায় রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।’ ১০ মে ঢাকায় এক আলোচনা সভায় তিনি আরো বলেন, ‘দৃশ্যমান দুর্ভিক্ষ না থাকলেও দেশে নীরব দুর্ভিক্ষ চলছে। আজকে দেশে যে রাজনৈতিক অবস্থা বিরাজ করছে, তার চেয়ে খারাপ অবস্থা অতীত ইতিহাসে ছিল কিনা আমার জানা নেই।’ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই শিক্ষাবিদ। তিনি বলেন, আমরা দেখেছি নুসরাত জাহানের ঘটনার সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতা জড়িত। সবাই মিলে প্রমাণ করতে চাইলো যে, নুসরাত আত্মহত্যা করতে চেয়েছে। ইতোমধ্যে একজন নার্সকে বাসের মধ্যে ধর্ষণ করে হত্যা করা হলো।’ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আরো বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন কর্মকর্তা মুক্তিযুদ্ধের ভুয়া সনদে পদোন্নতি নিতে গিয়ে ধরা পড়েন। যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করবেন তারাই যদি দুর্নীতি করেন, তাহলে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলার অবস্থা কী তা সহজেই অনুধাবন করা যাচ্ছে।
দেশের উন্নতি এবং মানুষের আর্তনাদ প্রসঙ্গে ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যে বক্তব্য রেখেছেন তা ভেবে দেখার মতো। কাঠামোগত ও দৃষ্টিগ্রাহ্য কিছু উন্নতি তো দেশের হয়েছে। কিন্তু আর্তনাদের বিষয়গুলো কেমন? জানমালের নিরাপত্তা মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর দিনের পর দিন নারীদের যে নিষ্ঠুরভাবে ধর্ষণ ও হত্যা করা হচ্ছে, তা জনমনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। সবার মনে একই প্রশ্ন- এ কোন সমাজে আমাদের বসবাস? রাষ্ট্র কেন মানুষের জীবন ও সম্ভ্রমের নিরাপত্তা দিতে পারছে না? মানুষের নিরাপত্তাহীনতা ও ধর্ষণের দৌরাত্ম্য দেখে দেশের প্রবীণ ওই অধ্যাপক বীভৎস ৭১ সালের কথা স্মরণ করেন। এমন চিত্র আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক।
দেশের রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আজকে দেশে যে রাজনৈতিক অবস্থা বিরাজ করছে, তার চেয়ে খারাপ অবস্থা অতীত ইতিহাসে ছিল কিনা আমার জানা নেই। এ কথার তাৎপর্য অনেক গভীর। আজকে রাজনীতির প্রতি মানুষের যে অনীহা, চারিদিকে মাদক, গুম, হত্যা ও ধর্ষণের যে দৌরাত্ম্য তা সুশাসনের অভাবের কথাই শুধু নয়, দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতির কথাও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রজারঞ্জন রাজনীতির কথা আমরা কিছুদিন ধরে শুনে আসছি, আর এখন দেখছি গণতন্ত্রহীন একদলীয় রাজনীতির মহাপ্রতাপ। সাথে চাতুর্যের ছলাকলা তো আছেই। তাই এখানে বলার মতো কথা হলো, গণতন্ত্রতহীন প্রতাপ ও চাতুর্যের রাজনীতি দিয়ে কখনো মানুষের মন জয় করা যায় না। কারণ এমন রাজনীতি দিয়ে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন হয় না, জনগণের ভাগ্যও বদল হয় না। মানুষ চায় গণতন্ত্র এবং সবার উন্নয়ন। সুশাসন, জানমালের নিরাপত্তা এবং সম্ভ্রম রক্ষার দাবিও মানুষের মৌলিক দাবি। এসব বিষয়ে রাষ্ট্র ও সরকারের যৌক্তিক ভূমিকা দেশের মানুষের কাম্য।
অনাকাঙ্খিত পরিবেশে মানুষ ভাল থাকতে পারে না। দেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে মানসিক রোগ। ১২ মে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে প্রতি ১০০ জনের ৩৪ জনই মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত। ক্রমান্বয়ে এ হার বেড়েই চলেছে। আর আক্রান্তদের মধ্যে তরুণের সংখ্যাই বেশি। বিষণ্ণতা ও অবসাদে ভোগা এসব রোগীর অনেকে একপর্যায়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। জড়িয়ে পড়ছেন মাদক, ধর্ষণ, জঙ্গীবাদসহ নানা অপরাধে। বেকারত্ব, পরিবার ও কর্মস্থলে অবহেলা, পারিবারিক অশান্তি, যৌথ পরিবার ভেঙে সম্পর্কের বন্ধন হালকা হওয়া, মাদকের আগ্রাসন, জীবনযাপনে প্রযুক্তির প্রতি অতি নির্ভরতাকে মানসিক রোগের কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ বুলেটিন-২০১৮ এর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে ১৬ দশমিক ১ ভাগ মানসিক রোগে ভুগছেন। আর ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের মধ্যে ১৮ দশমিক ৪ ভাগই মানসিক রোগে আক্রান্ত। অন্যদিকে ২০০৯ সালে হওয়া সর্বশেষ জাতীয় সমীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী প্রতি পাঁচজনের মধ্যে অন্তত একজন কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংখ্যা এখন কয়েকগুণ বেড়েছে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতলের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেঘলা সরকার বলেন, বর্তমানে বাচ্চারাই আমাদের সবচেয়ে বড় ক্লায়েন্ট। পারিবারিক বন্ধন কমে যাওয়া ও প্রযুক্তিনির্ভরতায় মানসিক রোগ বাড়ছে। ১৮ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে একজন মানুষের মানসিক বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়ে যায়। জীবন দক্ষতা, চাপ নেয়ার ক্ষমতা, বড় হয়ে কতটা সমস্যা মোকাবিলা করে সামনে যেতে পারবে সেই সক্ষমমতা তৈরি হয় এই বয়সেই। তাই এই বয়সটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় মাদক, পর্নোগ্রাফি, জঙ্গীবাদসহ নানা অপরাধ তাদের হাতছানি দেয়। এখন প্রশ্ন হলো এই হাতছানি থেকে কিশোর ও তরুণদের রক্ষার ব্যাপারে আমাদের পরিবার, সমাজ, শিক্ষাব্যবস্থা ও রাষ্ট্রনীতিতে যথাযথ আয়োজন আছে কী? আমাদের আয়োজন আশাপ্রদ নয়। তাই মানসিক রোগের বিরাজমান অবস্থায় নতুনরা যোগ হলে আমাদের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্যের চিত্রটা কেমন দাঁড়াবে? বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবারই করণীয় ঠিক করা প্রয়োজন।
পরিবার নিয়ে অভিযোগ, শিক্ষা নিয়ে অভিযোগ, সমাজ নিয়ে অভিযোগ, সরকার নিয়ে অভিযোগ, রাজনীতি নিয়ে অভিযোগ- এতো অভিযোগ নিয়ে যাদের বসবাস, তাদের মন তো ভারাক্রান্ত থাকবেই। অবশ্য সংশ্লিষ্ট সবাই সমাধানের পথে হাঁটলে মানুষ আশাবাদী হতে পারে। মানুষ নিজেকে এই বলে বোঝাতে পারে যে, এখনই সমাধান না হলেও সবাইতো সমাধানের পথেই চলছে। কিন্তু প্রশ্ন এখানেই, আমরা সমাধানের পথে চলতে সক্ষম হচ্ছি না কেন? সঙ্কট কোথায়? এ দেশের মানুষ ধৈর্য্যশীল এবং স্বল্পে তুষ্ট থাকতে পারে। কিন্তু কিছু মানুষ তা পারে না। তাদের আরো চাই। আরো ক্ষমতা চাই, আরো অর্থ চাই। এরা রাজনীতির প্রয়োজন ও দায়িত্ব উপলব্ধি না করেও রাজনীতিবিদ হতে চান, জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান না রেখেও বড় ধনী হতে চান, জ্ঞানচর্চা না করেও বুদ্ধিজীবী হতে চান, জনমানুষের বোধ-বিশ্বাস ও আশা-আকাঙ্খাকে উপলব্ধি না করেও জাতীয় মননের প্রতীক হতে চান।
বিস্ময়ের ব্যাপারে হলো, গণবিরোধী এই চক্রই নানাভাবে দেশী-বিদেশী কিছু কর্তা ও প্রতিষ্ঠানের আনুকূল্যে লাইমলাইটে চলে আসছেন এবং নানা ভঙ্গিতে দেশের মানুষকে উপদেশ খয়রাত করে যাচ্ছেন। এদের প্রতাপও কম নয়। মানুষ সঙ্গত কারণেই এদের মন থেকে সম্মান করতে পারে না। অথচ কি নির্মম পরিহাস, ওদেরকেও সমীহ করে চলতে হচ্ছে।
আমরা মনে করি, এ অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। দেশে গণমানুষের রাজনীতি চললে, গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশ ঘটলে ওই কৃত্রিম প্রতাপের অবসান হতে পারে। এখন জনমনে, তরুণমনে হতাশার যে বাতাবরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাও দূর হতে পারে। যারা আরো চাই, আরো চাই মন্ত্রে মুগ্ধ তাদের আয়ুষ্কাল দীর্ঘ হতে পারে না। দেশপ্রেমিক শক্তি নৈতিক চেতনায় বলীয়ান হয়ে উঠলে এই খামার বাংলায় গণআকাঙ্খার বিজয় অনিবার্য। কৃত্রিম রাজনীতি, কৃত্রিম সংস্কৃতি এই জনপদের মানুষ কখনো মেনে নেবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ