ঢাকা, বৃহস্পতিবার 16 May 2019, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১০ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ অবিলম্বে সংস্কার না হলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে

খুলনা অফিস : একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ যায়, তবুও বেড়িবাঁধ ভাঙনের আতঙ্ক আর আশঙ্কায় কাটে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর। টেকসই বেড়িবাঁধ না থাকায় বর্ষাকালের স্বাভাবিক জোয়ারে ভঙ্গুর বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়ে নোনা পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হতে পারে। এমনি শঙ্কা খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার নদীকূলের বাসিন্দাদের। সিডরের এক যুগ পার হলেও বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধ টেকসই সংস্কার হয়নি। এর মধ্যে, সম্প্রতি ফূণী’র আঘাতে এ অঞ্চলের একশ’ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল হোসেন বলেন, খুলনা ও সাতক্ষীরার এক হাজার ছয়শ’ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অধিকাংশই ঝুঁকিপূর্ণ। বাগেরহাটের প্রায় ৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় ফূণী’র প্রভাবে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার ৩২টি পোল্ডারের প্রায় একশ’ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকটি স্থানে বাঁধ ভেঙে গ্রাম প্লাবিত হয়। জরুরিভাবে খুলনার ১৫টি, সাতক্ষীরার ২২টি ও বাগেরহাটের ৮টি স্থানে প্রাথমিকভাবে সিনথেটিক ব্যাগ, জিও ব্যাগ ও মাটির বস্তা দিয়ে বাঁধ রক্ষা করা হয়। তবে তা কোনভাবেই টেকসই হবে না; বর্ষা মওসুমের পূর্বেই ঝুঁকিপূর্ণ ভেড়িবাঁধ টেকসই সংস্কার করা না হলে স্বাভাবিক জোয়ারে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
এদিকে কয়রায় কপোতাক্ষ নদের অব্যাহত ভাঙনে গোবরা, ঘাটাখালী, হরিণখোলা ও গোবরা পূর্বচক গ্রামের বাসিন্দারা রয়েছেন আতঙ্কে। প্রায় ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হয়েছে ১৩-১৪/২-নং পোল্ডারের গোবরা, ঘাটাখালী ও হরিণখোলার বেড়িবাঁধ। সম্প্রতি নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় ধসে যাচ্ছে নদীর পাড়ের মাটি। অধিকাংশ জায়গায় বাঁধের গোড়ায় মাটি না থাকায় সঙ্কীর্ণ ও খাড়া হয়ে গেছে বেড়িবাঁধের রাস্তা। দুর্বল বাঁধ ভেঙে যে কোনো মুহূর্তে নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে এ অঞ্চলের জনপদ। ঘূর্ণিঝড় ফণির আঘাতে হরিণখোলা বেড়িবাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পথে। তাৎক্ষণিক দিনে রাতে এলাকাবাসী বাঁধ রক্ষায় কাজ করলেও ভাঙন আতঙ্কে রাত কাটাচ্ছে এলাকবাসী। বাঁধ রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে কাজ করার দাবি জানিয়েছে ভুক্তভোগী জনসাধারণ।
ঘাটাখালী ও হরিণখোলা গ্রামের মোস্তাফিজুর, আবুল হোসেন, ইমান আলীসহ অনেকেই বলেন, হরিণখোলা বেড়িবাঁধের গোড়ার মাটিতে ধস নেয়া বেড়েই চলেছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকার মানুষও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল গফ্ফার ঢালী বলেন, বৈরী আবহাওয়ায় হঠাৎ করে হরিণখোলার বেড়িবাঁধের গোড়ার মাটি ধসে ভাঙন দেখা দিয়েছে। তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের আমাদী সেকশন কর্মকর্তা মশিউল আলম বলেন, কয়রা এলাকার ওয়াপদা বেড়িবাঁধের স্পর্শকাতর স্থানগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি উল্লেখপূর্বক প্রতিবেদন তৈরি করে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থ পেলেই স্বল্প সময়ের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ সংস্কার করা হবে। ইতোমধ্যে হরিণখোলা বাঁধে টেন্ডার হয়েছে। দ্রুত কজ শুরু করা হবে।
কয়রা সদর ইউনিয়নের (ভারপ্রাপ্ত) ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তফা নাজমুছ ছাদাত বলেন, জরুরি ভিত্তিতে ভাঙনরোধে ব্যবস্থা না নেয়া হলে কয়রা সদরের দরিদ্র মানুষ বসতবাড়িসহ ফসলী জমি হারিয়ে আরও নিঃস্ব হয়ে পড়বে। ইতোপূর্বে নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা মওসুমে নদী ভাঙন শুরু হলেই ভাঙন রোধের নামে সরকারি অর্থ লুটপাটের তোড়জোড় শুরু হয়। যা শুধুই অপচয় মাত্র। স্থানীয়দের দাবি, নদীভাঙন রোধে টেকসই ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
খুলনার কয়রা ও দাকোপ, সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি, বাগেরহাটের শরণখোলার সাউথখালী এলাকার কয়েক জনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সামান্য পূর্ণিমার জোয়ারে ভেঙে যেতে পারে বেড়িবাঁধ। নদী উত্তাল হয়ে উঠলে অথবা সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতে বেড়িবাঁধ ভাঙন আতঙ্কে আঁতকে ওঠে উপকূলের মানুষ।
সাতক্ষীরার পাউবো-২ নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান খান বলেন, সাতক্ষীরার দুই ডিভিশনের আওতায় মোট ২৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। সেগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রেখেছি। এই বেড়িবাঁধকে স্থায়ীভাবে সংস্কারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। বাজেট পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কয়রা দক্ষিু বেদকাশি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এডভোকেট মঞ্জুর আলম নান্নু বলেন, ষাটের দশকে নির্মিত উপকূলীয় এলাকার বেড়িবাঁধের বেশির ভাগই এখন নাজুক। অনেক এলাকায় বাঁধের অস্তিত্ব নেই। উপকূলের বেড়িবাঁধ সংস্কার ও মেরামতের নামে প্রতিবছর চলে সীমাহীন দুর্নীতি। সরকারি অর্থের হয় হরিলুট। কিন্তু হয় না স্থায়ী টেকসই বেড়িবাঁধ। কার্যকর বিচারও হয় না সংশ্নিষ্টদের।
সাতক্ষীরার গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান জিএম মাসুদুল আলম জানান, ফূণী’র আঘাতে ইউনিয়নে ২৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অধিকাংশ স্থানের ক্ষতি হয়েছে। টেকসই সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া না হলে বর্ষাকালে কয়েকটি পোল্ডারে ভেঙে লোকালয়ে ঢুকে পড়বে নোনাপানি।
এ ব্যাপারে খুলনার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন বলেন, ‘পাউবো থেকে প্রাপ্ত ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছি। সুপারিশ করেছি-যাতে বর্ষা মওসুমের পূর্বেই সংস্কারের ব্যবস্থা নেয়া হয়। অন্যত্থায় কয়েকটি পোল্ডার ভেঙে নদীর নোনা পানিতে প্লাবিত হতে পারে লোকালয়।’
অনুরূপ মন্তব্য করলেন বাগেরহাট জেলা প্রশাসক তপন কুমার বিশ্বাস ও সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ