ঢাকা, বৃহস্পতিবার 16 May 2019, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১০ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

পদ্মায় পানিপ্রবাহ হ্রাস পেয়েই চলেছে উজানের বাঁধ-ব্যারেজ অপসারণই সমাধান

ফারাক্কা লং মার্চ উপলক্ষে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা ময়দানের বিশাল গণসমাবেশে ভাষণ দিচ্ছেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী -ফাইল ফটো

সরদার আবদুর রহমান : আজ ১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চ দিবস। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৭৬ সালের এই দিনে গঙ্গার উপর নির্মিত ভারতীয় বহুমুখী বাঁধ ফারাক্কা অভিমুখে এই লং মার্চ অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে এই লং মার্চের চার দশক পর শুধু ফারাক্কা নয়- বাংলাদেশমুখী উজানের সবগুলো নদীপ্রবাহ এখন বাঁধ-ব্যারেজে বন্দী। যার বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের বেশিরভাগ এলাকা মরুময়তার শিকার হতে চলেছে। এখন গঙ্গার পানি পদ্মায় আসছে না বললেই চলে। দিন দিন এই প্রবাহ হ্রাস পেয়েই চলেছে। অন্যদিকে গঙ্গার দূষণ মারাত্মক আকার নেয়ায় পরিবেশ নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে খোদ ভারতেই। এ অবস্থায় ফারাক্কাসহ বাঁধ-ব্যারেজগুলো অপসারণ করা দুই প্রান্তেরই জনতার দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘ফারাক্কা লং মার্চ’-এর ঐদিন সারা দেশ থেকে রাজশাহীতে জমায়েত হওয়া লাখ লাখ মানুষকে নিয়ে স্মরণকালের বৃহত্তম মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে মওলানা ভাসানী চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট গমন করেন এবং সেখানে সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি সমাপ্ত হয়। দেশের অভ্যন্তরে এই কর্মসূচি পালিত হলেও এর রেশ উপমহাদেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পৌঁছে যায়। আজো এই দিনটি ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাবি আদায়ের পক্ষে প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। মওলানা ভাসানীর সেদিনের লং মার্চ ছিল বাংলাদেশে ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লাখো জনতার এক বজ্রনির্ঘোষ প্রতিবাদ যা দিল্লীর টনক নড়িয়ে দেয়। কানসাটের সমাবেশে মওলানা ভাসানী ভারতের উদ্দেশে বলেন, ‘তাদের জানা উচিত বাংলার মানুষ এক আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ভয় পায় না। কারো হুমকিকে পরোয়া করে না।’ তিনি বলেন, ‘আজ রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কানসাটে যে ইতিহাস শুরু হয়েছে তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করবে।’
বর্তমানে শুধু ফারাক্কা নয়- উজানে গঙ্গার বহুসংখ্যক পয়েন্ট থেকে হাজার হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। পরিণতিতে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহ দিন দিন হ্রাস পেয়ে চলেছে। ভারত তার বহুসংখ্যক সেচ ও পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মূল গঙ্গা এবং এর উপনদীগুলোর ৯০ ভাগ পানি সরিয়ে নিচ্ছে। ফলে নদীতে পানি প্রবাহিত হতে পারছে মাত্র ১০ ভাগ। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক এই নদীতে বাঁধের পর বাঁধ দিয়ে প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার ফলে মূল গঙ্গা তার উৎসের কাছে হারিয়ে যেতে বসেছে। অর্ধশতাব্দীর মধ্যে গঙ্গা নদীর প্রবাহ ২০ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। সব মিলিয়ে ভারতের নানা উচ্চাভিলাষি কর্মপরিকল্পনার শিকার হয়ে ভাটির দেশ বাংলাদেশ এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে চলেছে। শুধু ফারাক্কা নয়- গঙ্গা-পদ্মাকেন্দ্রিক বাঁধ, জলাধার, ক্রসড্যাম, রেগুলেটরসহ কমপক্ষে ৩৩টি মূল অবকাঠামো নির্মাণ করছে ভারত। এরসঙ্গে রয়েছে আনুষঙ্গিক আরো অসংখ্য ছোট-বড় কাঠামো। ফলে বাংলাদেশের হাজারো চিৎকার আর আহাজারি সত্ত্বেও ফারাক্কা পয়েন্টে পানি না থাকার ফলে বাংলাদেশ তার ‘ন্যায্য হিস্যা’ দূরে থাক সাধারণ চাহিদাটুকুও পূরণ করতে পারছে না।
এদিকে ভারতে গঙ্গা নদীর পানি-দূষণ পরিবেশ নিয়ে দুশ্চিন্তার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দূষণের কারণে গঙ্গার পানিও ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। এ নিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি সচেতন মহলে বিস্তর মত-অভিমত প্রকাশ করেও এর রাশ টানা যাচ্ছে না। এসবের জের টানতে হচ্ছে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মা নদীকেও। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ভারতের সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড এবং বায়ো কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড বা বিওডি এই মর্মে রিপোর্ঁ দিয়েছে, বিভিন্ন প্রকল্প দিয়েও গঙ্গা দূষণ তো কমেইনি, উল্টো দিনের পর দিন তা বেড়েই চলেছে। শুধু তাই নয়, গঙ্গার পানি বেশ কিছু জায়গায় ঘর সংসারের কাজ ও সেচের ক্ষেত্রে ব্যবহারেরও অযোগ্য হয়ে পড়েছে। গঙ্গার দূষণের মাত্রা এতোটাই বেড়ে গেছে- যার ফলে সেখানে বেশ কিছু ক্ষতিকারক ব্যাকটিরিয়ার সন্ধান মিলেছে। যেসব কারণে গঙ্গার দূষণ প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে তার মধ্যে রয়েছে, নদীর ঘাটে ঘাটে আবর্জনার স্তুপ, ভাসমান কঠিন বর্জ্য, সরাসরি গঙ্গাকেই ডাস্টবিনের মতো ব্যবহার, শহরের নালা থেকে উপচে পড়া ময়লা পানির স্রোত, জালিবিহীন নালা-নর্দমার মুখ, পূজার দেব-দেবী বিসর্জন, পোড়ানো মৃতদেহের ভস্ম নিক্ষেপ, মানুষের মল-মূত্র সরাসরি নদীতে পড়া, কাপড় কাঁচা ও রান্নার বাসনকোসন ধৌত করা, গবাদী পশু ধোয়ানো, শিল্প-কারখানার বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়া প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও অসংখ্য বাঁধ ও পিলারের সেতু নির্মাণ করে স্রোত বাধাগ্রস্ত করায় পানি দূষিত হচ্ছে। নদীর প্রায় ৮৫ শতাংশ দূষণের কারণ হচ্ছে এই মনুষ্য সৃষ্ট বর্জ্য। দূষণ সৃষ্টিকারী বাকি বর্জ্য আসে কারখানার শিল্প বর্জ্য, কৃষিতে ব্যবহৃত সার, অন্যান্য কঠিন বর্জ্য, মানব শরীর এবং মৃত পশুপাখির দেহ থেকে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ‘ন্যাশনাল মিশন ফর ক্লিন গঙ্গা’ প্রকল্পের রিপোর্টেও বলা হয়েছে, মারাত্মক ক্ষতিকারক কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া মিশছে গঙ্গায়। গঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমছে। প্রতি লিটারে পাঁচ মিলিগ্রাম দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকলে তা স্বাভাবিক। নদী দূষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এই নদীতে এখন পানিপ্রবাহ অত্যন্ত ক্ষীণ। পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্রের মতে, গঙ্গা কানপুরে পৌঁছার আগেই ৯০ শতাংশেরও বেশি পানি কৃষি জমিতে সেচের জন্য অপসারণ করে নেয়া হয়। ফলে যে সমস্যাটি হয় তা হচ্ছে আরো নি¤œাঞ্চলে দূষণ বা অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থ অপসারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া নদীর উজানে পানিবিদ্যুত প্রকল্পের জন্য বাঁধ নির্মাণ করে এই স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করা হচ্ছে। আড়াই হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীর যত্রতত্র বাঁধ নির্মাণ করে এবং পিলার দিয়ে সেতু নির্মাণের ফলে স্বাভাবিক প্রবাহও দিন দিন অবরূদ্ধ হয়ে পড়ছে। গঙ্গার নি¤œধারা কানপুর, বিজনৌর, নারোরা, রুকনপুর, কানজাউলি, হাকানিপুর, ভোসাওয়ালি, শেখপুর, কোচকপুর, লামুই, চাওকা প্রভৃতি স্থানে ছোট-বড় তিনশ’ বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে সেচের জন্য। এর ফলে নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে বদ্ধ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। একারণে পরিবেশকর্মীরা অনেকেই মনে করেন, পরিস্থিতির পরিবর্তনে গঙ্গার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার কোন বিকল্প নেই।
গত চার দশক আগে বাংলাদেশের নদীসমূহের যে পরিস্থিতি ছিল আজ তাতে যোগ হয়েছে আরো ভয়াবহ অবস্থা। ফারাক্কার প্রতিক্রিয়া ও প্রভাবে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের গঙ্গা-পদ্মা ছাড়াও অন্যান্য ছোট ও মাঝারি ধরনের নদ-নদী শুকিয়ে গেছে। নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা এখন অনেকটাই মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে এক ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় অতি আসন্ন। শুধু গঙ্গা নয়- তিস্তা, মহানন্দা, বারাক নদীতে বাঁধ এবং আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে একতরফা পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। ভারত বলে আসছে যে, বাংলাদেশের ক্ষতি হয়- নদীকেন্দ্রিক এমন কোন প্রকল্প তারা বাস্তবায়ন করবে না। কিন্তু পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত। ভারত নদীসদৃশ ৭টি ক্যানেল বা কৃত্রিম খাল প্রকল্পের মাধ্যমে হাজার হাজার কিউসেক পানি গঙ্গা থেকে সরিয়ে নিয়ে কয়েক লাখ হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান করছে। এর মধ্যে রয়েছে, ‘আপারগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’, ‘মধ্যগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’, ‘নিম্নগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’, ‘পূর্ব গঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’, ‘মধ্যগঙ্গা ক্যানেল ২য় পর্যায়’ এবং ‘সমান্তরাল নিম্ন গঙ্গা ক্যানেল’। এ ধরনের প্রকল্পের হাজার হাজার কিলোমিটার খালের মাধ্যমে গঙ্গার পানি সরিয়ে নিয়ে সেচ দেবার ব্যাপক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে বাংলাদেশে পানির অভাবে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৮ কোটি মানুষ এবং এক-তৃতীয়াংশ এলাকা সেচের পানির অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্পের ৬৫ শতাংশ এলাকায় সেচ কার্যক্রম চালানো সম্ভব হচ্ছে না, অতিরিক্ত লবণাক্ততার জন্য জমির উর্বরা শক্তি কমে গিয়ে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের প্রায় ১৭ ভাগ নষ্ট হয়ে গেছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়ায় হাজার হাজার হস্তচালিত পাম্প অকেজো হয়ে গেছে। দেশের প্রায় ২১ শতাংশ অগভীর নলকূপ ও ৪২ শতাংশ গভীর নলকূপ ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না, ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের বিষাক্ত প্রভাবে পশ্চিমাঞ্চলের অনেক জেলায় টিউবওয়েলের পানি খাবার অযোগ্য হয়ে পড়েছে, নদী শুকিয়ে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ যে পানি উত্তোলন করা হয় সেটা পূরণ (রিচার্জ) হচ্ছে না, ফারাক্কার কারণে যশোর-খুলনা অঞ্চলে মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেছে, বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় প্রচলিত ধান উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। মিঠাপানির অভাবে কৃষি ও অন্যান্য শিল্প-কারখানা অচল হয়ে পড়ছে, নদীর জীবনচক্র ধ্বংস হয়ে গেছে, জলজপ্রাণীকুল ধ্বংস হওয়ার পথে। দুই শতাধিক প্রজাতির মিঠাপানির মাছ ও ১৮ প্রজাতির চিংড়ির অধিকাংশই ধ্বংস হয়ে গেছে, নদীর বুকে জেগে উঠেছে বিশাল ধু ধু বালু চর, নদীর মূলধারা বিভক্ত হয়ে পড়েছে অসংখ্য সরু ও ক্ষীণ স্রোতধারায়। প্রায় ১৫০০ কি.মি. নৌ পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ