ঢাকা, বৃহস্পতিবার 16 May 2019, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১০ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ভারতেও খেলতে পারলেন না সাবিনা

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : বাংলাদেশের মেয়েদের ফুটবলে এখন পর্যন্ত বড় তারকার নাম সাবিনা খাতুন। জাতীয় দলের এই অধিনায়ক নিজের নামের পাশে অনেক বড় বড় অর্জন করেছেন। দেশের বাইরে খেলা প্রথম খেলোয়াড়ও তিনি। এবার টানা দুটি দেশে খেলার সুযোগ সামনে আসলেও একটিও কাজে লাগাতে পারেনি। ভিসা জটিলতার কারণে যেতে পারেননি চাইনিজ তাইপেতে। এরপর ভারতের ক্লাবের খামখেয়ালিপনার কারণে যেতে পারেননি পাশের দেশটিতে। প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে দেশের বাইরে লিগ খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে সাবিনা খাতুনের। দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে গত বছর সেই অভিজ্ঞতা হয়েছে কেবল কৃষ্ণা রানী সরকারের। এবার সাফ চ্যাম্পিয়নশীপ চলাকালীন সময়ে চাইনিজ তাইপে লিগ থেকে খেলার অফার আসে জাতীয় দলের অধিনায়ক সাবিনার কাছে। চায়নিজ তাইপের প্রিমিয়ার লিগের হ্যাং ইউয়ান ফুটবল ক্লাবের হয়ে খেলার কথা ছিল বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুনের। কিন্তু ভিসা না পাওয়ায় তার তাইওয়ানে খেলতে যাওয়া হচ্ছে না। ফলে হতাশই হতে হলো তাকে। কারণ তাইওয়ানের ক্লাবে খেলার জন্য ভারতের সিথু এএফসিতে খেলার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সাবিনা। বাংলাদেশে মেয়েদের ফুটবল লিগ বন্ধ। প্রায় ছয় বছর লিগ বন্ধ থাকার কারণে দেশের বাইরে লিগ খেলার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন সাবিনা। আগেও মালদ্বীপের লিগ ফুটবলে দুই মৌসুম খেলে এসেছেন। ইন্ডিয়ান উইমেন্স লিগে খেলেছেন সিথু এফসির হয়ে। সাতটি গোলও করেছিলেন তিনি। এবারও তামিলনাড়–র ক্লাব সিথু এফসি সাবিনাকে প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু তাইওয়ানের ক্লাবের প্রস্তাবটা বেশি লোভনীয় হওয়ায় সেটি গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন সাবিনা। দেশে তাইপে (তাইওয়ান) দূতাবাস না থাকায় দিল্লিতে গিয়ে ভিসার আবেদন করেছিলেন। ওয়ার্ক পারমিট না পাওয়ায় ভিসা পাননি। এখন ভারতের ক্লাবেও খেলতে পারবেন না। কারণ সিথু এফসি বিদেশি কোটায় এরই মধ্যে দুই নেপালি ফুটবলারকে নিয়েছে। হতাশ সাবিনা ভিসা না পাওয়ার পর সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, ‘প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম। ক্ল¬াব এখনো ওয়ার্ক পারমিটের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আপাতত অলস সময় কাটানো ছাড়া আমার কোনো উপায় নেই। ‘বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের হয়ে অনেক দিন ধরেই অসাধারণ পারফরম্যান্স করে আসছেন সাবিনা। গোল করার বিশেষ দক্ষতার কারণে তাকে ‘গোল মেশিন’ও বলা হয়ে থাকে। প্রথম বাংলাদেশি নারী ফুটবলার হিসেবে তিনি মালদ্বীপ এবং ভারতের ঘরোয়া লিগেও খেলেছেন। মালদ্বীপ ও ভারতের লিগে খেলার অভিজ্ঞতা আছে বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুনের।
এবার সাবিনাকে চায় চায়নিজ তাইপের প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব। সাবিনা খাতুনের নেতৃত্বে ভুটানকে হারিয়ে নেপালে চলমান সাফ চ্যাম্পিয়নশীপে শুভ সূচনা করেছে বাংলাদেশ। এই জয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখে টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে পৌঁছে গিয়েছে বর্তমান রানার্সআপরা। তবু আজ নেপালের বিপক্ষে বাংলাদেশের ‘বাঁচা-মরার’ লড়াই। কারণ সেমিফাইনালে শক্তিশালী ভারতকে এড়াতে হলে স্বাগতিকদের বিপক্ষে প্রয়োজন ছিল জয়। চাপ নিয়ে মাঠে নামার আগে একটি সুসংবাদ পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ অধিনায়ক সাবিনার কানে। তাঁকে চায় চায়নিজ তাইপের প্রিমিয়ার লিগের হ্যাং ইউয়ান ফুটবল ক্লাব। মেয়েদের ঘরোয়া লিগ বন্ধ আছে প্রায় ছয় বছর হলো। তবে জাতীয় দলের খেলা না থাকলে সাবিনাকে অলস সময় কাটাতে হয় না বললেই চলে। বেশ কয়েক বছর ধরেই দেশের বাইরের লিগগুলোতে নিয়মিত হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের গোলমেশিন। মালদ্বীপের পর গত বছর খেলেছেন ইন্ডিয়ান উইমেনস লিগে তামিলনাড়ু সিথু এফসির জার্সিতে। সেখানে প্রায় একক কৃতিত্বে দলকে তুলে নিয়েছেন সেমিফাইনালে। তামিলনাড়ুর দলের মোট ১১ গোলের ৭টিই এসেছে সাবিনার পা থেকে। ফলস্বরূপ চলতি বছরও সাবিনাকে চায় ভারতীয় ক্লাবটি।
কিন্তু তাঁকে পেলে তো! ইতিমধ্যে বড় প্রস্তাব নিয়ে হাজির তাইপের ইউয়ান ক্লাব। সাবিনার হাতে পৌঁছে গেছে বিশ্ব মহিলা ফুটবলে র‌্যাঙ্কিংয়ে ৪০ নম্বরে থাকা দেশের ক্লাবটির আমন্ত্রণও। এখন শুধু বিমানে উঠে বসার পালা বাকি ছিল। নেপাল থেকে তাইপের ক্লাবের প্রস্তাবের বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন সাবিনা, ‘সত্যি কথা বলতে কি, আমি আমন্ত্রণ পেয়েছি। তবে এখন সাফ ফুটবল নিয়েই ভাবছি। টুর্নামেন্ট শেষ করে দেশে ফিরে ভিসার ব্যাপারে কাজ শুরু হবে।’ সাবিনাকে তাইপের ক্লাবে খেলার ব্যাপারে মধ্যস্থতা হিসেবে কাজ করেছেন বাংলাদেশের তরুণ ফুটবল এজেন্ট নিলয় বিশ্বাস। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী খুব ভালো পারিশ্রমিকই পাবেন বাংলাদেশ অধিনায়ক এবং চুক্তিটা হবে সাত মাসের। বাংলাদেশের মহিলা ফুটবলের অনেক প্রথমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাবিনার নাম। বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ফুটবলার হিসেবে খেলেছেন মালদ্বীপ ও ভারতের লিগে। ২০১০ সাল থেকে টানা জাতীয় দলে খেলা সাতক্ষীরার এই মেয়ে পাঁচ বছর ধরে জাতীয় দলের অধিনায়ক। এসএ গেমস, সাফ, এএফসি, ফুটসাল, প্রীতি টুর্নামেন্ট ও ক্লাব ফুটবল মিলিয়ে ১১৩টি ম্যাচ খেলে গোল করেছেন ৩২৩ টি। বাংলাদেশের মেয়েদের ফুটবলে যা এক বিরল রেকর্ড। আর হ্যাঁ, নারী সাফের পাঁচটি আসরে খেলা একমাত্র বাংলাদেশি ফুটবলারও তিনিই। চাইনিজ তাইপেতে ভিসা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে যাওয়া হয়নি তার। এরপরই ভারতে খেলার সুযোগ আসে তার সামনে। কিন্তু সেখানেও খেলা হয়নি হয়নি তার। পার্শ্ববর্তী দেশে লিগ খেলতে কলকাতা পর্যন্ত পৌছে গেলেও না খেলেই আবারো ফিরে আসতে হয়েছে দেশে। ভারতের ক্লাব গকুলাম কেরালার হয়ে ইন্ডিয়ান মহিলা লিগে খেলার কথা ছিল তার।
ক্লাবটির অদূরদর্শিতার কারণেই মূলত না খেলেই দেশে ফিরে আসতে হয়েছে তাকে। কলকাতায় গিয়ে জানতে পারেন ক্লাবের বিদেশি কোটায় খেলোয়াড় নিবন্ধনের সময় পেরিয়ে যাওয়ায় তিনি খেলতে পারছেন না। বিদেশি কোটার নিবন্ধন শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ক্লাব কর্তৃপক্ষও সাবিনাকে অবহিত করেননি। সে কারণে তাকে কলকাতা গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। জানা গেছে, ১২টি দল নিয়ে ইন্ডিয়া উইমেন্স লিগের চূড়ান্ত পর্বের খেলা ৫ মে পাঞ্জাবের লুধিয়ানার গুরুনানক স্টেডিয়ামে শুরু হয়েছে। যা চলবে ২২শে মে পর্যন্ত। ২০১৮ সালে ইন্ডিয়া উইমেন্স লিগে সাবিনা খেলেছিলেন সেথু এফসি ক্লাবে। সঙ্গে ছিলেন আরেক ফরোয়ার্ড কৃষ্ণা রানী সরকার। এবারও সাবিনাকে পেতে চেয়েছিল সেথু এফসি। কিন্তু সাবিনা চাইনিজ তাইপের প্রিমিয়ার লিগে খেলার প্রস্তাব পাওয়ায় সেথু এফসিকে না করে দিয়েছিলেন। পুরনো ক্লাবটি নেপালি খেলোয়াড় দিয়ে বিদেশি কোটা পূরণ করায় এবং চাইনিজ তাইপের ভিসা না পাওয়ায় এ বছর দেশের বাইরে লিগ খেলা হচ্ছে না দেশের অন্যসরা সেরা এই ফুটবলারের। যা তাকে চরমভাবে হতাশ করেছে। একই সাথে দুটি দেশ থেকে না খেলার কারণে আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাবিনা। দেশের বাইরে খেলা তার জন্য নতুন নয়। এবার ডাক এসেছিল ভিন্ন দেশ থেকে। প্রথমবার খেলেছিলেন মালদ্বীপের মহিলা লিগে।
এরপর ভারতের সেতু এফসির হয়ে মাঠ মাতিয়েছিলেন। দুই দেশের লিগ খেলে অভিজ্ঞতায় পুষ্ট হয়েছে জাতীয় দলের এই অধিনায়ক। এবার তার ডাক এসেছিল চাইনিজ তাইপের প্রিমিয়ার লিগে খেলার। এরই মধ্যে তার সঙ্গে চুক্তি হয়ে গিয়েছিল দেশটির ক্লাব হ্যাং ইউয়েন নামক ক্লাবের। আগামী নভেম্বর মাস পর্যন্ত চুক্তি করা হয়েছিল সাবিনার সঙ্গে। তবে এই সময়ে জাতীয় দলের কোন খেলা থাকলে বাফুফে তাকে ফিরিয়ে আনতে চাইলে দেশে ফিরতে বাধ্য থাকবেন সাবিনা। বাফুফের টেকনিক্যাল ও ষ্ট্রাটেজিক ডিরেক্টর পল স্মালিই মূলত চাইনিজ তাইপেতে খেলার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ভিসা জটিলতাই তার খেলার পথে বাধা হয়ে দাড়িয়েছে। এদিকে জাতীয় পুরুষ দলের সাবেক ষ্ট্রাইকার জাহিদ হাসান এমিলিকে ছাড়িয়ে সাবিনার মাইলফলক আলোচনায় এসেছে। ঘরোয়া ফুটবল বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্যের পসরা সাঁজানো দেশ সেরা নারী ফুটবলার এখন চীন যাওয়ার অপেক্ষায়। চীনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি ক্লাবে খেলার ডাক পেয়েছেন সাতক্ষীরার এই ফুটবলার। এর আগেও মালদ্বীপ-ভারত মাতানো সাবিনা এখন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে নেপালে। নেপালেই সাফের সেমি ফাইনাল নিশ্চিত করেছে সাবিনা-মান্ডা-মৌসুমীরা। সাবিনার গোলে ভুটানকে হারিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বকাপখ্যাত সাফের শেষ চারে জায়গা করে নিয়েছে লাল-সবুজরা। বাঘিনীদের হয়ে দুর্দান্ত এক গোল করেছেন সাবিনা খাতুন। তার এই গোলে আরেকটি নজির স্থাপন করলেন এই অধিনায়ক।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে লাল-সবুজ জার্সি পড়ে তিনি বল জালে পাঠিয়েছেন ১৯ বার। দেশের ফুটবল ইতিহাসে যা সর্বোচ্চ। সর্বোচ্চ বলতে নারী-পুরুষ উভয়কে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ তিনি আগেই ছাড়িয়ে গেছেন দেশের পুরুষ ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে জায়গা করে নেয়া সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমানে মোহামেডানের তারকা ফুটবলার জাহিদ হাসান এমিলিকে। এমিলির গোলসংখ্যা ১৫। আর সাবিনার ১৯। ধারাবাহিক সাফল্যে তিনি রেকর্ডের পাশাপাশি মাইলফলক স্থাপন করেছেন। এমন সাফল্যই তাকে আন্তর্জাতিক ক্লাব ফুটবলেও সুযোগ করে দিচ্ছে। এইতো চায়নিজ তাইপের প্রিমিয়ার লিগের হ্যাং ইউয়ান ফুটবল ক্লাবের হয়ে খেলার প্রস্তাব পেয়েছেন তিনি। বয়সভিত্তিক, ঘরোয়া ফুটবল-ক্লাব, ফুটসাল বা আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ বলেন সব মিলিয়ে তার ক্যারিয়ার গোলসংখ্যা কত জানেন? ১১৪ ম্যাচে ৩২৪! এমনি এমনি তো তাকে ‘বাংলার মেসি’ বলা হয়না। মাঝে মধ্যেই তার পায়ে আর্জেন্টাইন সুপারষ্টারের ঝলক দেখা যায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ