ঢাকা, মঙ্গলবার 21 May 2019, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১৫ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সামগ্রিক কৃষি বিপর্যয়ের পূর্বাভাষ : কৃষকদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি অপরিহার্য

-ড. মো. নূরুল আমিন

১.

কৃষি প্রধান বাংলাদেশের ইতিহাসে অভূতপূর্ব এক কৃষি বিপর্যয়ের আভাস পরিলক্ষিত হচ্ছে বলে মনে হয়, চলতি বোরো মওসুমে ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় হতাশাগ্রস্ত কৃষকরা ধান ক্ষেতে আগুন লাগিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন বলে পত্র-পত্রিকায় রিপোর্ট বেরিয়েছে। কৃষকদের দাবি অনুযায়ী প্রতি মণ ধানে তাদের উৎপাদন ব্যয় হচ্ছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। পক্ষান্তরে বাজারে এক মণ ধান বিক্রি করলে তারা পাচ্ছেন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। প্রতি মণে তাদের লোকসান তিন শতাধিক টাকা। ধান কাটার জন্য গ্রামাঞ্চলে দিনমজুরও পাওয়া যাচ্ছে না। একজন মজুর বাবত তাদের ৫০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা পরিশোধ করতে হয়। এর উপরে আছে ২ বেলা খাবার। এ অবস্থায় কোন কোন এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও জেলা প্রশাসকরা স্বয়ং মাঠে নেমে কৃষকদের ক্ষেতের ধান কেটে দেয়ার বদান্যতার রিপোর্টও বেরিয়েছে। সরকার সীমিত আকারে প্রতি মণ ধান ১০৪০ টাকা দরে কেনার একটা কর্মসূচির কথা বললেও তাতে কৃষকরা খুব একটা লাভবান হচ্ছেন না। অন্যদিকে ধানের দাম কম হবার কারণে বাজারে চালের দাম হ্রাস পাবারও কোন লক্ষণ নেই। বলাবাহুল্য, বিদ্যমান ঈড়হাবৎংরড়হ ৎধঃব অনুযায়ী তিন মণ ধানে ২ মণ চাল হয়। এই হিসাবে ৬০০ টাকা মণের ধানের প্রতি মণ চালের দাম ৯০০ টাকা হবার কথা কিন্তু বাজারে তা ২০০০ টাকার নিচে নাই। এর অর্থ বর্তমান বাজারে শুধু কৃষকরাই বঞ্চিত হচ্ছে না, সাধারণ মানুষও বঞ্চিত হচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে দেশে সামগ্রিক কৃষি বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, স্বাধীনতার সূচনালগ্নে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৯৫ লক্ষ টন।  বর্তমানে এই পরিমাণ সাড়ে তিন কোটি টন (মতান্তরে ৩ কোটি ৮৬ লাখ টন) অতিক্রম করেছে। কৃষির আধুনিকায়ন, বিশেষ করে অধিক ফলনশীল ফসলের চাষ, সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার প্রভৃতি এর জন্য দায়ী। নতুন প্রযুক্তির প্রচলন ও ব্যবহারে প্রথম প্রথম কৃষকদের কাছ থেকে অনীহা প্রতিরোধও এসেছিল প্রচুর। উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ তারা ব্যবহার করতে চায়নি। রাসায়নিক সারের প্রতি তাদের ব্যাপক এলার্জি ছিল। নতুন জাতের ধানের চালে স্বাদ নেই প্রভৃতি অজুহাতে তারা এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এমনও দেখা গেছে যে, খরা মোকাবিলায় কুমিল্লার কোতোয়ালীতে গভীর নলকূপ খনন করে তার পানি দিয়ে ধান চাষ পরিকল্পনায়ও তারা বাধা দিয়েছে। টিউবওয়েল, কন্ট্রাক্টরের তাঁবু তারা জ্বালিয়ে দিয়েছে। তাদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল, খরা আল্লাহ দিয়েছেন, তার মোকাবেলায় মাটির নিচ থেকে পানি তুলে সেচ দেয়া আল্লাহর সাথে বিদ্রোহ করার সামিল। এ অবস্থায় আল্লাহর গজব অবশ্যম্ভাবী। এই সময়ে মানুষের এই বাধা দূর করেছে পল্লী উন্নয়নের খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ ড. আখতার হামিদ খান ও তার প্রতিষ্ঠিত পল্লী উন্নয়ন একাডেমী এবং তাদের উদ্ভাবিত দ্বিস্তর সমবায় পদ্ধতি। গ্রামে কৃষক সমবায় সমিতি ও থানা পর্যায়ে তাদের সমন্বয়ে গঠিত হয় থানা সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ এসোসিয়েশন। একাডেমীর বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির উপর ব্যাপক অধ্যয়ন ও গবেষণা করে উদ্ভাবন করেন যে আমাদের কৃষকদের প্রধান সমস্যা দু’টি; একটি হচ্ছে উৎপাদনের সমস্যা, আরেকটি হচ্ছে উৎপাদন উত্তর তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ তথা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির সমস্যা। এই দুটি সমস্যার সমাধানের জন্য এই দ্বিস্তর বিশিষ্ট সমবায় ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে তারা সমাধান খুঁজে পেয়েছিলেন এবং এ সংক্রান্ত পাইলট প্রকল্প সফল প্রমাণিত হওয়ায় তৎকালীন সরকার সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচি নামে এই ব্যবস্থাকে সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তারই প্রেক্ষাপটে পর্যায়ক্রমে প্রথমে প্রোগ্রাম অর্গানাইজেশন হিসেবে আইআরডিপি ও পরে আধাসরকারি সংস্থা হিসাবে আশির দশকের শুরুতে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এই কর্মসূচিকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এর অধীনে প্রতিটি গ্রামে কৃষক সমবায় সমিতি (কে.এস.এস) গড়ে উঠে। উৎপাদন ও উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্যের সমস্যা সমাধানের দায়িত্বও তাদের উপর অর্পিত হয়।
এই কর্মসূচির আওতায় সারা দেশে গ্রাম পর্যায়ে কৃষক সমবায় সমিতি গঠিত হয়। এই সমিতিসমূহ থেকে একজন ম্যানেজার, একজন আদর্শ কৃষক এবং একজন চেয়ারম্যানকে থানা প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কেন্দ্রে (পরবর্তীকালে উপজেলা প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কেন্দ্রে) এনে উন্নত পদ্ধতিতে ফসল চাষ, বিশেষ করে আধুনিক কৃষি সামগ্রী তথা সার, বীজ, কীটনাশক ও সেচের পানি ব্যবহার, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, সমবায় ব্যবস্থাপনা, বাজার ব্যবস্থানা প্রভৃতির উপর ব্যাপক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। থানা বা উপজেলা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রাথমিক সমিতির এই প্রতিনিধিরা গ্রামে গিয়ে সমিতির সাপ্তাহিক সভায় সাধারণ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিতেন। তাদের সহযোগিতা করতেন বিআরডিবি কর্মকর্তা ও কেন্দ্রীয় সমিতির পরিদর্শক ও গ্রাম্য হিসাব রক্ষকরা। এইভাবে সারা বাংলাদেশে নতুন কৃষি প্রযুক্তি ও গ্রামীণ কৃষক সমিতি পরিচালনার কৌশল ছড়িয়ে পড়ে। কৃষক প্রশিক্ষণে থানা বা উপজেলা পর্যায়ের সকল উন্নয়ন কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত করা হয়। সাথে সাথে কৃষি উপকরণ সংগ্রহ ও সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। সার, বীজ ও সেচযন্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিএডিসিকে শক্তিশালী করা হয়। উৎপাদন উপকরণ ক্রয়ের জন্য সমবায় কৃষকদের পূঁজি সরবরাহের লক্ষ্যে বিআরডিবি-ইউসিসি’র মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদী এবং মধ্যমেয়াদী কৃষি ঋণ হিসেবে শত শত কোটি টাকা বিতরণ করা হয়। এই ঋণ কখনো তামাদি হয়নি। সারা দেশে এর ফলে ফসল চাষের ব্যাপকতা (cropping intensity) বেড়েছে; এক ফসলী জমি সেচাবাদের মাধ্যমে তিন ফসলী হয়েছে। স্থানীয় জাতের ফসল চাষ ছেড়ে কৃষকরা অধিক ফলনশীল জাতের ফসল চাষ শুরু করেছে। আগে যেখানে স্থানীয় জাতের ফসল চাষ করে একর প্রতি কৃষকরা ৫/৭ মণ ধান পেতো, এখন উফসীজাত চাষ করে তারা ৭০/৮০ মণ এমনকি কখনো কখনো ১০০ মণ ধানও পায়। এভাবে গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশে কৃষি বিপ্লব সাধিত হয়েছে এবং এর কৃতিত্ব সরকারের তুলনায় চাষীদের অনেক বেশি। উৎপাদন সমস্যার অনেকটা সমাধান হবার ফলেই এই বিপ্লব সাধিত হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণ তথা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির সমস্যাটির কোনও সমাধান হয়নি। এটা শুধু ধান নয়, গম, ভুট্টা, আলু, মরিচ, তরিতরকারি সবকিছুর বেলায়ই প্রযোজ্য। কোন পণ্যেরই ন্যায্য মূল্য তারা পায় না। বেপারী ফড়িয়ারা তাদের কাছ থেকে পানির দরে ফসল কিনে মুনাফা লুটে।
শুধু বাংলাদেশ নয় সকল দেশেই কৃষি পণ্য বাজারজাতকরণের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। উৎপাদন মওসুমে পণ্য সরবরাহ বেশি থাকার কারণে স্বাভাবিকভাবেই দাম পড়ে যায়। অন্যদিকে বহুমুখী চাহিদার কারণে ঐ সময়ে চাষীরা ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হয়। তাদের ফসলী ঋণ শোধ করতে হয়, পারিবারিক বিভিন্ন চাহিদা পূরণের জন্য তাদের নগদ টাকার প্রয়োজন হয়।
এতে করে ফসল ধরে রাখার ক্ষমতা তাদের থাকে না। এই সুযোগ গ্রহণ করে বেপারী-ফড়িয়ারা। তারা কম দামে ফসল ক্রয় করে মওজুত করে রাখে। মওসুম শেষে যখন বাজারে পণ্য সরবরাহ হ্রাস পায় এবং দাম বৃদ্ধি পায় তখন তারা বিক্রি করে মুনাফা লুটে নেয়। অনেক কৃষক আছেন, যারা নগদ টাকার জন্য ফসলের মওসুমে ফসল বিক্রি করেন কিন্তু কয়েক মাস পর খোরাকী ও পারিবারিক চাহিদা পূরণের জন্য আবার ফসল ক্রয় করতে বাধ্য হন। দেখা গেছে যে, যে দামে তারা ফসল বিক্রি করেন অফ সিজনে তার তিন চার গুণ বেশি দামে তাদের সেই ফসলই কিনতে হয় চড়া দামে, যদি কিনতে পারেন তাহলে তাদের খোরাকী জুটে, না হয় অভুক্ত অর্ধভুক্ত অবস্থায় তাদের থাকতে হয়। তারা ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া ও পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারে না। সংসার চলে না। এই অবস্থা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।
গত ছয় দশকে বাংলাদেশের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। রাস্তাঘাট, পুল কালভার্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষিত লোকের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। দেশ প্রায় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। Wealth X নামক বৈশ্বিক পর্যায়ের একটি আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশে অতি ধনী অর্থাৎ যাদের সম্পদ ২৫০ কোটি টাকার বেশি তাদের সংখ্যা বার্ষিক ১৭.৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এখনো পাচ্ছে। বিশ্বে এই হার সর্বোচ্চ। এই অতি ধনীদের মধ্যে কোনও কৃষক নেই, যারা কৃষকদের ঘৃণা করেন তারা আছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক হিসাব অনুযায়ী জনসংখ্যার দরিদ্রতম ১০ শতাংশের হিস্সা গত আট বছরে ২ শতাংশ থেকে ১.০১ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। অর্থাৎ আয় সম্পদ ও ধনী দরিদ্রের বৈষম্য সাংঘাতিক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখানে যারা ভুক্তভোগী তাদের সকলেই কৃষক।
আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির আরেকটি বেদনা দায়ক দিক হচ্ছে দেশে অতি ধনী বৃদ্ধির পাশাপাশি গত দুই দশকে দেশ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ কোটি টাকার সম-পরিমাণ পূঁজি বিদেশে পাচার হয়েছে। আবার ব্যাংক সমূহের প্রায় সোয়া লক্ষ কোটি টাকার ঋণ খেলাপীও হয়েছে। এটা যারা করেছেন তারা সকলেই বিত্তশালী। পক্ষান্তরে কৃষকদের অবস্থা হচ্ছে এই যে তারা জাতির খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একাত্তর সালের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি ফসল উৎপাদন করেও ফসলের ন্যায্য মূল্য পান না, তাদের খোরাকী জোটে না। তাদের উৎপাদিত ফসল তারা দেশেই রাখেন। তাদের দেশপ্রেম প্রশ্নাতীত। আমি কৃষকদের দুরবস্থার কথা বলছিলাম। তাদের দুরবস্থা দূরীকরণের জন্য তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তীর কোন বিকল্প নেই। তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য ফড়িয়ামুক্ত বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা অপরিহার্য। এর অনেকগুলো পদ্ধতি আছে:
এক) উৎপাদিত ফসলের (ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজ যে পণ্যই হোক) বিপরীতে কৃষকদের ৩ থেকে ৬ মাস মেয়াদী বাজারজাতকরণ ঋণ প্রদান। এতে কৃষকদের ফসল ধরে রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, তারা ঋণের টাকা পেয়ে পরিবারের আশু চাহিদা পূরণ করতে পারবে। মওসুম শেষে ফসলের দাম বৃদ্ধি পেলে তা বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করবে। সরকার কৃষকদের দিয়ে ব্যাংকে ১০ টাকার একাউন্ট খুলিয়েছিলেন বলে জানা যায়। সে একাউন্টগুলোকে বর্তমানে ব্যাংকগুলো বোঝা বলে গণ্য করছে বলে পত্রিকায় রিপোর্ট বেরিয়েছে। সরকার বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন।
(দুই) উৎপাদনের ব্যয়ের সাথে কিছু মুনাফা যোগ করে সরকার একটা মূল্য নির্ধারণ করে কৃষকদের কাছ থেকে ঐ মূল্যে ফসল ক্রয় করতে পারেন। মূল্যটি অবশ্যই কৃষক বান্ধব হতে হবে। গত কয়েক দশক ধরে সরকার খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এ কাজটি করেছেন কিন্তু দেখা গেছে সরকারি ক্রয় কেন্দ্রের ক্রয় ব্যবস্থা কৃষকদের খুব একটা উপকার করতে পারে না। কৃষকরা ক্রয় কেন্দ্রে যাবার আগেই বেপারীরা সেখানে পৌঁছে যান এবং পাইকারী সরবরাহকারী হিসেবে সেখানে ধান চাল ও অন্যান্য পণ্য জমা দিয়ে মুনাফা লুটেন। দিনের পর দিন লাইনে থেকে কৃষকদের পক্ষে সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে ফসল সরবরাহ করা সম্ভবপর হয় না। এখানে অনেক রাজনৈতিক নেতা পাইকারী ব্যবসার সাথে জড়িত। আবার রাইস মিল মালিকদের কারসাজিও এখানে আছে। এই অবস্থায় মন্দের ভাল হলেও সরকারি ক্রয় কর্মসূচি কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে পারে না।
(তিন) কৃষকদের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের তৃতীয় ব্যবস্থাটি হচ্ছে সমবায় ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার। তারা উৎপাদন সমস্যার সমাধান করেছে, বাজারজাতকরণ সমস্যাটি তাদের উপর ছেড়ে দেয়া যেতে পারে। পুরাতন সমবায়ের সংস্কার করে ষাটের দশকে যে নতুন সমবায় ব্যবস্থা বাংলাদেশে চালু হয়েছিল তার উদ্দেশ্যও ছিল এটাই। বাংলাদেশের সকল উপজেলাতেই এখন বিআরডিবির পরিচালনাধীন কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি আছে। ২০০৪ সাল নাগাদ এই সমিতির অধীনে আড়াই শত গুদাম ছিল ও এখনো আছে। বিএডিসিরও গুদাম আছে দু’শতাধিক এবং খাদ্য বিভাগের অব্যবহৃত গুদাম আছে। এই গুদামগুলোকে সংস্কার করে যদি কৃষিপণ্য মওজুতের উপযোগী করা হয় তাহলে একটি বিরাট কাজ হতে পারে। এই গুদামগুলোর সবগুলো স্বস্ব উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির হাতে ন্যস্ত করে যদি ফসলের বিপরীতে বাজারজাতকরণ ঋণ চালু করা হয় তাহলে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সহজতর হয়। ফসল কাটার মওসুমে কৃষকরা বাজারে ফসল বিক্রির পরিবর্তে কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির গুদামে ফসল জমা দিয়ে বাজার দরের ৮০% হারে আগাম ঋণ নিয়ে যাবেন এবং সরকার বা সরকারি ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতিকে এ বাবত প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ করবে। গুদাম ব্যবস্থাপনা ও ফসল সংরক্ষণের জন্য সরকার/বিআরডিবিকে যাবতীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আমার জানা মতে বিআরডিবির মাঠবিভাগের অধীনে সমবায় ঋণ ও বাজারজাতকরণ শীর্ষক একটি অনুবিভাগ রয়েছে। এই কাঠামোটি এখন যথাযথভাবে কাজ করছে। এটাকে সক্রিয় করে যদি গুদাম ঋণ চালু হয় এবং চার-ছয় মাস পর বাজারে যখন ফসলের দাম বৃদ্ধি পাবে তখন যদি কেন্দ্রীয়ভাবে তা বিক্রি করা হয় তাহলে কৃষকরা যথেষ্ট পরিমাণে লাভবান হতে পারেন। বিক্রি লব্ধ অর্থ থেকে ঋণ পরিশোধ করার পর মুনাফার যে মার্জিন থাকবে তা থেকে প্রশাসনিক ব্যয় ও সার্ভিস চার্জ বাবত কেন্দ্রীয় সমিতি কিছু পার্সেন্টেজ রেখে বাকীটা কৃষকদের মধ্যে তাদের শেয়ার ও ফসল জমার হারের ভিত্তিতে বন্টন করে দিতে পারে। এই ব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট বৃটেন, সুইডেন ও জাপানে অত্যন্ত ফলপ্রসু প্রমাণিত হয়েছে। কৃষকদের রক্ষা করার জন্য এটি একটি অনুপম কর্মসূচি হতে পারে এবং পাইলট ভিত্তিতে অবিলম্বে চালু করার জন্য সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। আমরা খামার বহির্ভুত বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের জন্য লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় করতে পারি, কৃষক ও দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য চেষ্টা করলে অবশ্যই পারবো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ