ঢাকা, বুধবার 22 May 2019, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১৬ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বাজারে এখনো নিম্নমানের পণ্য

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : ‘আমাদের সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলে গণ্য হইবে।’ অথচ দেশে ঠিক উল্টোটি লক্ষ করছি আমরা। খাদ্যের পুষ্টিমান দূরের কথা, আসল খাদ্যই পাওয়া মুশকিল হয়ে গেছে এখন। ভেজালে ভেজালে সয়লাব যেসব খাবার, সে খাবারে পুষ্টি খোঁজার কী আছে আমাদের? ভেজালের জালে এমনভাবে জড়িয়ে গেছি আমরা যে ইচ্ছে করলেও সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না সহজেই। বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলে হয়তো না খেয়ে জীবন খোয়াতে হবে, নচেৎ খেয়ে জীবন খোয়াতে হবে। এমন একটা সংকটাপন্ন অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। সঙ্গত কারণে বলা যেতে পারে, আমরা পনবন্দী অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে’। কথাগুলো বলছিলেন বিশিষ্ট গবেষক ও বণ্যপ্রাণী বিশারদ আলম শাইন।
সূত্র মতে, আদালতের নির্দেশনাও মানা হচ্ছেনা। এখনো নিন্মমানের পণ্যে সয়লাব রাজধানীর অধিকাংশ দোকান। নিম্নমানের ৫২টি পণ্য বাজার থেকে তুলে নিয়ে ধ্বংস করতে আদালতের নির্দেশের পরেও কিছু কোম্পানি বাজার থেকে তাদের পণ্য তুলে নেয়নি। অনেক দোকানে এখনো রয়ে গেছে নিম্নমানের বেশকিছু নিত্যপণ্য। রাজধানীর বেশ ক’টি বাজার ঘুরে দেখা যায়, এখনো দোকানে দোকানে রয়ে গেছে ৫২ টি নিম্নমানের পণ্যের বেশ কয়েকটি।
রাজধানীর বাজার ঘুরে দেখা যায়, মোল্লা সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড তাদের উৎপাদিত লবণ, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেড (বিইওএল) রূপচাঁদা সরিষার তেল ও সিটি গ্রুপ তাদের তীর সরিষার তেল বাজার থেকে তুলে নিয়েছে। তবে টিকে গ্রুপের পুষ্টি সরিষার তেল এবং প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রাণ হলুদ গুঁড়া এখনো বাজারে রয়েছে। এছাড়া বাজারে নিষিদ্ধ এসিআই এর লবণসহ বেশ কিছু পণ্য এখনো দৃশ্যমান।
মোহাম্মদপুর কৃষিমার্কেটের মুদি দোকানি শাহজাহান জানান, নিম্নমানের পণ্যের তালিকাভুক্ত অনেক প্রোডাক্ট এখানো আমাদের কাছে থেকে গেছে। কোম্পানির পক্ষ থেকে কিছু পণ্য নিয়ে গেলেও অনেক পণ্যের কেউ আসেনি। এর মধ্যে মোল্লা সল্ট এবং তীর সরিষার তেল আমাদের কাছ থেকে তাদের পণ্য নিয়ে গেছে। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে যখন দোকানীর কথোপকথন চলছিল, তখন ওই দোকানে আসেন রফিকুল ইসলাম নামে এক ক্রেতা। প্রাণের হলুদ গুঁড়া দেখে তিনিও প্রশ্ন করেন, এই পণ্যগুলো এখনো বাজারে আছে?
সেগুন বাগিচা কাঁচা বাজারেও দেখা যায় আদালতের নিষিদ্ধ বেশ কিছু পণ্য এখনো বিক্রি হচ্ছে। ওই বাজারের বিক্রেতারা বলেন, আদালতের নির্দেশনার বিষয়ে আমরা অবগত। অনেক কোম্পানি এখনো তাদের পণ্য নিতে আসেনি। ফলে আমাদের দোকানে পণ্যগুলো থেকে গেছে। ভিন্ন নয় শান্তিনগর বাজারের চিত্রও। ‘অনিক স্টোরে’ দেখা যায়, প্রাণের হলুদ গুঁড়া ও লাচ্ছা সেমাই এখানো রয়ে গেছে। পুষ্টি সরিষার তেলও দেখা যায়। অনিক স্টোরের ম্যানেজার ফয়সাল হক বলেন, কোম্পানি এলে এসব পণ্য দিয়ে দেওয়া হবে। আমরা কোনো ক্রেতাকে এসব পণ্য বলছি না। তিনি জানান, এই বাজার থেকে শুধুমাত্র তীর সরিষার তেল তুলে নিয়ে গেছে। অন্য কোম্পানিগুলো এখনো আসেনি।
এ প্রসঙ্গে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরিচালক ড. সহদেব চন্দ্র সাহা বলেন, আদালতের নির্দেশের অনুলিপি হাতে পেয়ে আমরা প্রত্যেকটি কোম্পানিকে নোটিশ দিয়েছি। যেন দ্রুত সম্ভব বাজার থেকে পণ্যগুলো তুলে নেওয়া হয়। এরই মধ্যে অনেকে তুলে নিয়েছে বলেও খবর পাওয়া গেছে। যেমন খুলনার বাজার থেকে মোল্লা সল্ট তুলে নেওয়ার পর জেলা প্রশাসক গুদাম সিলগালা করেছে। তিনি আরও বলেন, আমরা মনিটরিং করছি। ঢাকার বাজার থেকে তীর তেল তুলে নিতে শুরু করেছে বলে জানতে পেরেছি। আশা করি, বাকিরাও দ্রুত তুলে নেবে। বাজারে ওইসব পণ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে গত ১২ মে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্স অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) পরীক্ষায় নিম্নমান প্রমাণিত হওয়ায় নামি-দামি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৫২ ব্র্যান্ডের পণ্য জব্দ ও সেসব বাজার থেকে তুলে নিয়ে ধ্বংসের নির্দেশ দেন আদালত। সেইসঙ্গে এসব পণ্য উৎপাদন বন্ধেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
পণ্য গবেষক আলম শাইন আরও বলেন, আমরা জানি, উৎকৃষ্ট দ্রব্যের সঙ্গে নিকৃষ্ট দ্রব্যের মিশ্রণই হচ্ছে ভেজাল। ভেজালের রয়েছে নানা রকমফের। ভেজাল দিতে গিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে অসাধু ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছেন, যে কৌশলের কাছে আমরা বার বার হেরে যাচ্ছি। এর কারণ ভেজালের ধরণ স্থায়ী নয়, একেকবার একেক ধরনের ভেজালের মুখোমুখি হতে হচ্ছে আমাদের। অর্থাৎ কৌশল বদলানো হচ্ছে। তিনি বলেন, আদালত হয়ত কিছু পণ্যের বাজারজাত নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু তাতে কি? তারা ভিন্ন পথে এগুলো আবারো বাজারজাত করবে। ভেজালের বিষয়টা এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, প্রতিনিয়ত ভেজাল খেয়ে খেয়ে এখন আজেবাজে খাবারও অনায়াসে হজম করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি আমরা। এ অভ্যাস একদিনে হয়নি, দীর্ঘদিনের অনুশীলনে এমনটি হয়েছে। বলতে হবে, পর্যায়ক্রমে ভেজাল খেয়ে খেয়ে এমন সহনশীল পর্যায়ে পৌঁছেছি আমরা।
রামপুর বাজারে আসা পণ্য ক্রেতা আলমগীর সিরাজ বলেন, বলতে দ্বিধা নেই, ভেজালে ভেজালে সয়লাব এ দেশের পণ্যসামগ্রী কিংবা খাবার-দাবার। কোথায় নেই ভেজাল! ওষুধ থেকে শুরু করে কাফনের কাপড়ে পর্যন্ত ভেজাল দিচ্ছে অসাধুরা। খাদ্যদ্রব্যের কথায় আর বলার কিছু নেই! পঁচানব্বই শতাংশ মওসুমি ফল ও শাকসবজিতে এখন কেমিক্যাল মেশানো হচ্ছে। মাছ, গুঁড়া মসলা, দুধ তথা শিশু খাদ্যে ভেজাল দেয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা। রোজার মাসে বিষয়টা আরও কঠিন পর্যায়ে পৌঁছে আমাদের দেশে। জিলাপি মচমচে রাখতে মবিল মেশানো হচ্ছে। মুড়ি ধবধবে করতে মেশানো হচ্ছে ইউরিয়াসহ নানা কেমিক্যাল। কিছু নামিদামি কোম্পানি তরল শরবতের বোতলের লেবেলে বিভিন্ন ফলের ছবি এঁকে দিলেও ফলের কোনো নির্যাস পায়নি বিএসটিআই। হতাশা ব্যক্ত তিনি বলে, আমাদের কিছুই করার নেই। সরকারের রাগব বোয়ালরা যেখানে নিরব সেখানে সাধারণ জনগণের কিই-বা করার আছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু নামিদামি কোম্পানিই নয়, ফুটপাতের দোকানি মাছে দেয়ার বরফ গলিয়ে শরবত বানিয়ে খাওয়াচ্ছেন রোজাদারকে। কিছু অসাধু দুধ ব্যবসায়ী দুধের ড্রামে নদীর পানি মেশাচ্ছে। শুধু তাই নয়, কৃত্রিম দুধ-ঘি-ডিম-চাল বানানোর কথাও জানা যাচ্ছে। প্যাকেটজাত দুধের অবস্থা আরও ভয়ানক। সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। কীটনাশক, সিসা, অ্যান্টিবায়োটিক এসব নাকি মেশানো হচ্ছে! বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেমিক্যাল মিশ্রিত সেসব ফলমূল কিংবা খাদ্রসামগ্রী খেয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে মানুষ। তা কিন্তু সহজেই টের পাচ্ছে না কেউ। টের পাচ্ছে না কেউই কেন তারা ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে অথবা ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের কিডনি, লিভার, বিকল হচ্ছে। কারণ, বিষয়টা খুব সহজে বোঝার উপায় নেই। ফলে রোগ-ব্যাধি বাঁধিয়ে হাসপাতালে গিয়েও স্বস্তি পাচ্ছেন না রোগী। সেখানেও আরেক দফা ভেজালের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ও নকল ওষুধের খপ্পরে পড়ে রোগ জটিলতর পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ