ঢাকা, বুধবার 22 May 2019, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১৬ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

পানির তীব্র সংকট

এবার পবিত্র মাস রমযান শুরু হওয়ার পর থেকেই রাজধানী ঢাকার প্রায় সকল এলাকায় পানির তীব্র সংকটের কবলে পড়েছেন মানুষ। অবস্থা এমন হয়েছে যে, মোহাম্মদপুর, আদাবর, শেকেরটেক, জুরাইন মাদরাসা রোড, দনিয়াবাজারসহ বহু এলাকার মানুষ গোসল দূরে থাকুক এমনকি নামাজের আগে ওজু করার মতো পানিও পাচ্ছেন না। গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বহু এলাকার মসজিদ ব্যবস্থাপকদের পক্ষ থেকে ওয়াক্তিয়া নামাজের আগে মুসল্লীদের যার যার বাসা থেকে ওজু করে আসার অনুরোধ জানিয়ে মাইকে ঘোষণা প্রচার করা হচ্ছে।
কোনো কোনো এলাকার মুসলিমরা সাহরীর পর খাওয়ার মতো যথেষ্ট পানি পাচ্ছেন না। পানি না খেয়ে রোযা তো থাকছেনই, সাহরীর সময় শেষ হতে না হতেই তারা বালতি ও কলসি নিয়ে এলাকার পানির ট্যাংকের সামনে গিয়ে লাইনেও দাঁড়াচ্ছেন। সেখান থেকে অনেক কষ্টে আনা পানি দিয়েই তাদের বাসাবাড়িতে কোনোভাবে সারাদিনের রান্নাবান্নাসহ সব কাজ সারা হচ্ছে।
অভিজাত অনেক ফ্ল্যাটে বসবাসকারীদের অবস্থাও শোচনীয় হয়ে পড়েছে। দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে বৃহত্তর মোহাম্মদপুর এলাকার এমন একটি হাউজিং সোসাইটির কথা জানানো হয়েছে যেখানে তিনশ’র বেশি ফ্ল্যাট রয়েছে। পানি না পাওয়ার কারণে ওই সোসাইটির পক্ষ থেকে ওয়াসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর ওয়াসার কর্তা ব্যক্তিরা নাকি সমস্যা দূর করার জন্য ঘুষ দাবি করেছেন। এই ঘুষের অর্থ যোগাড় করার জন্য সোসাইটির ব্যবস্থাপকরা আবার প্রত্যেক ফ্ল্যাট মালিকের কাছে এক হাজার টাকা চেয়ে নোটিস পাঠিয়েছেন। এভাবে তিনশ’ মালিকের কাছ থেকে এক হাজার করে অন্তত তিন লাখ টাকা যোগাড় হলে সেই টাকা ওয়াসার কর্তা ব্যক্তিদের ঘুষ হিসেবে দেয়া হবে। তারপর নাকি পানি সরবরাহ নিশ্চিত করবে ওয়াসা! সোসাইটির ব্যবস্থাপক এবং ফ্ল্যাট মালিকরা জানিয়েছেন, এই ঘুষ দিতে হবে শুধু রমযান মাসের পানির জন্য। পরবর্তীকালে নিয়মিতভাবে পানি পাওয়ার জন্য আরো ঘুষের কথা আগাম জানিয়ে রেখেছেন ওয়াসার কর্তা ব্যক্তিরা!
বলার অপেক্ষা রাখে না, একদিকে সমগ্র রাজধানীতে তীব্র পানির সংকট এবং অন্যদিকে কর্তা ব্যক্তিদের খোলামেলা ঘুষের বাণিজ্যÑ এমন অবস্থা কোনোক্রমেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। ঘটনাপ্রবাহে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে, সংকট আসলে সুচিন্তিতভাবেই সৃষ্টি করা হয়েছে। তাছাড়া ওয়াসার নিজের দেয়া পরিসংখ্যানও সংস্থাটির পক্ষে যায় না। কারণ, মাত্র কিছুদিন আগেই এক গণশুনানিতে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা প্রতিদিন ২৪৫ থেকে ২৫০ কোটি লিটার পর্যন্ত পানি উৎপাদন ও সরবরাহ করতে সক্ষম। এদিকে পুরো রাজধানীতে বর্তমানে চাহিদা রয়েছে ২৪০ কোটি লিটার পানির। সে হিসাবে সংকটের পরিবর্তে বরং ৫ থেকে ১০ কোটি লিটার পানি উদ্বৃত্ত থাকার কথা। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে অবস্থা এতটাই মারাত্মক হয়েছে যখন এমনকি ওজু করার মতো পানিও পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক এলাকায় সাহরীর সময়ও খাওয়ার জন্য পানি পাচ্ছেন না রোযাদাররা। ওদিকে একই ওয়াসার কর্তা ব্যক্তিরা আবার ‘নগদ নারায়ণের’ বিনিময়ে বিভিন্নস্থানে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করছেন!
সব মিলিয়েই আমরা পবিত্র রমযানে ওয়াসার কার্যক্রমকে অগ্রহণযোগ্য মনে করি এবং ঘুষ বাণিজ্য ও সুচিন্তিতভাবে সৃষ্ট পানি সংকটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাই। আমরা মনে করি, গ্রীষ্মকালে এমনিতেই যেহেতু পানির চাহিদা অনেক বেড়ে যায় এবং রমযানের কারণে যেহেতু পানি অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়ে, সেহেতু ওয়াসা কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল অনেক আগে থেকে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ব্যাপারে পরিকল্পনা করা এবং উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ব্যবস্থা নেয়া। আমরা আশা করতে চাই, ওয়াসা নিজেই যেহেতু ২৫০ কোটি লিটার পর্যন্ত পানি উৎপাদন ও সরবরাহ করতে সক্ষম বলে জানিয়ে রেখেছে সেহেতু কর্তা ব্যক্তিরা বিশেষ করে রমযানের বাকি দিনগুলোতে রাজধানীবাসীদের পানির সংকট থেকে মুক্তি দেয়ার জরুরি ব্যবস্থা নেবেন। বিষয়টির প্রতি আমরা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ সরকারের দায়িত্বশীল সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ