ঢাকা, বুধবার 22 May 2019, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১৬ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

কৃষকের ঘরে ঈদ আনন্দ থাকবে না

জিবলু রহমান : আমনের পর বোরো মৌসুমেও দেশে বাম্পার ফলন হয়েছে ধানের। ফলন দেখে খুশির আভা ফুটেছিল কৃষকের মুখে। তবে সেই খুশি মিলিয়ে গেছে দ্রুত। কারণ ফলন বাড়লেও দাম কম ধানের। স্থানভেদে ৪০০-৫০০ টাকায় ঘুরছে প্রতিমণ ধানের দাম। অথচ প্রতিমণ ধান উৎপাদন করতে খরচ হয়েছে ৭০০-৮০০ টাকা। গড়ে মণপ্রতি ৩০০ টাকা লোকসান হচ্ছে কৃষকের। জনবল সংকটে কোথাও কোথাও ফসল কাটার খরচই বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষকের জন্য। দুই মণ ধানের দামেও একজন দিনমজুর মিলছে না কোথাও কোথাও। ফলে অনেক এলাকায় কৃষকরা জমিতেই ফেলে রাখছে ধান।
১ বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে কৃষকের খরচের হিসাব হলো এইভাবে-সেচ বাবদ এক হাজার ২০০ টাকা, জমি তৈরি ৮০০ টাকা, রোপণ করা ৯০০ টাকা, ইউরিয়া, ডিএপি, এমওপি, জিপসাম, কুমুলাস, দানা ও তরল কীটনাশক, কাটা ও মাড়াইসহ ১১ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা।
বোরো মৌসুমে উৎপাদিত ধান নিয়ে সারা দেশের কৃষকরা ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চরমভাবে হতাশ। ক্ষোভের আগুন বুকের মধ্য থেকে এখন মাঠে প্রকাশ্য জ্বলছে। মূলতঃ উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রয় মূল্য কম হওয়ায় এই ধান নিয়ে কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। অনেক কৃষকের ঘরে আবার ২০১৮ সালের উৎপাদিত ধান রয়ে গেছে। দাম কম থাকার কারণে এ সব ধান কৃষকরা গত বছর বিক্রি করেনি। চাল, সবজি বা এ ধরনের পণ্যের দাম সামান্য চড়ে গেলেই চারদিকে শোরগোল পড়ে যায়। ‘বাজারে আগুন’, ‘পেঁয়াজের ঝাঁঝ’, ‘সবজি অগ্নিমূল্য’, ‘চালের সিন্ডিকেট’, ‘চিনিতে আগুন’-এসব কথা স্থান পায় সংবাদপত্রে। কিন্তু কৃষকের যন্ত্রণা-বঞ্চনায় আমাদের মন সামান্যই কাঁদে।
 শহুরে মানুষের আয় বেড়েছে কিন্তু সেই গতিতে কৃষকের আয় বাড়েনি। বীজ, সার, কীটনাশক, বিদ্যুতের যে হারে দাম বেড়েছে তাতে করে কৃষকেরা ফসল উৎপাদন করে অনেক ক্ষেত্রেই লোকসানের শিকার হচ্ছে। বাজারে এখন গরুর মাংস বিক্রয় হচ্ছে ৫২০-৫৫০ টাকার মধ্যে। এখন ১ মণ ধান বিক্রি করেও মেহমান আসলে একমণ ধান বিক্রি করে ১ কেজি গরুর মাংসও ক্রয় করা যাচ্ছে না। পকেট থেকে টাকা আরো বের করে দিতে হচ্ছে। প্রচ- রোদের মাঝে সরকারের কর্তারা যখন এসি ছেড়ে বাইরে বেড়ানোর সাহস পাচ্ছেন না তখন মাঠে গিয়ে দেখুন চামড়া পুড়িয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করছে কৃষকেরা। তাদের দেহ থেকে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম পড়ে ভিজে যাচ্ছে মাটি।
এক সময়ের একটি সুন্দর গানের লাইনের তৃতীয় শব্দটি নিয়ে যেন কৃষকরা হতাশায় নিমজ্জিত। ‘গোলা ভরা ধান’-এখন কৃষকের কাছে ‘গোলা ভরা কান্নায়’ পরিণত হয়েছে। পাকা ধান ক্ষেতে আগুন দিয়ে অভিনব কায়দায় প্রতিবাদও করছে কৃষকরা। কবি আলাম্মা ইকবাল যথার্থই লিখেছিলেন, ‘যে ক্ষেতের ফসল পায় না কৃষাণ খেতে, সে ক্ষেতে আগুন জ্বালিয়ে দাও।’
 সংবাদপত্রের প্রতিবেদন মতে, প্রতি মণ ধানে কৃষকের লোকসান হচ্ছে ৪৪০ টাকা। ন্যার্য্য মূল্য না পাওয়ার আশঙ্কা আর শ্রমিকের মজুরি বেশি হওয়ায় ধান ঘরে তুলতে না পেরে হতাশ কৃষকরা কী করবে তা তাদের মাথায় আসছে না। যদিও আমাদের শিক্ষার্থীরা অনেক কৃষকের ধান কেটে দিয়ে মানবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে পরিস্কার করেছে, ‘আপনারা কৃষক, আপনাদের কষ্টের বিনিময়ে আমরা খাবার পাই, আপনাদের কষ্ট পেতে দিবো না আমরা।’
সোহরাব হাসান লিখেছেন, ‘...ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন শিক্ষার্থীরা। কৃষক যাতে ন্যায্য দাম পান, সে জন্য তাঁরা আন্দোলন করছেন। খেতের ধান কেটে দিয়ে কৃষককে সহায়তা করছেন...। ...শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সিলেটের এক কৃষকের খেতের ধান কাটার কাজে সহায়তা করছেন। এর আগে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন কলেজের ১৫ জন শিক্ষার্থী এক কৃষকের ধান কেটে দিয়েছেন, যিনি মজুরের অভাবে ধান কাটতে পারছিলেন না। এক মণ ধান বিক্রি করে কৃষক পান ৫০০ টাকা। আর একজন মজুরকে দিনে দিতে হয় ৮৫০ টাকা। ফলে অনেক কৃষকই মজুর লাগাতে পারছেন না...।
...সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সদস্যরা দেশের ১৬টি স্থানে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে। প্রতিবাদ হয়েছে টাঙ্গাইল, ভোলা, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ ও নারায়ণগঞ্জে। দাম কম হওয়ায় জয়পুরহাটে ধানে আগুন দিয়ে প্রতিবাদ করেছে খেতমজুর সমিতি...।
...ছাত্রলীগ ও সাধারণ ছাত্র পরিষদ-দুটিই ডাকসুতে প্রতিনিধিত্ব করে। অথচ তাদের চরিত্র ও আচরণে কত ফারাক। ছাত্রলীগের নেতারা সাধারণ শিক্ষার্থী বা কৃষকের বঞ্চনা সম্পর্কে একটি কথাও বলেননি। (সূত্র : কৃষকের পাশে ছাত্ররা আছে, সরকার নেই!, সোহরাব হাসান, দৈনিক প্রথম আলো ১৮ মে ২০১৯)
ধানের দাম কম হওয়ার পেছনে বিভিন্ন জায়গায় মজুদদার ও মিল মালিকদের কারসাজি দেখছে কৃষক ও বিশেষজ্ঞরা। সেই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে ধান-চাল সংগ্রহের প্রক্রিয়াগত ক্রটি দ্রুত সংস্কার করার দাবিও জানাচ্ছে তারা। বিশেষ করে চাল সংগ্রহের নামে মিলার-ডিলারদের মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীদের সুযোগ করে দেওয়ার পদ্ধতি বাদ দিয়ে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান-চাল কেনার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, সেটি না হলে সরকারের এ কার্যক্রম সফল হবে না। চলতি বোরো মৌসুমে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ সন্তোষজনক নয়। বরং কৃষক তাদের অসহায়ত্বের প্রকাশ ঘটিয়েছে নানাভাবে। মাঠপর্যায়ে খাদ্য কর্মকর্তারাও ধান সংগ্রহে অনেকটা নির্লিপ্ত বলে অভিযোগ আছে। কেউ কেউ বলছে, মাঠপর্যায়ের একশ্রেণির কর্মকর্তা ও মিলার বা মজুদদার অপেক্ষায় আছে আরেক দফা বৃষ্টির। তখন কৃষকরা মাঠের পাকা ধান নিয়ে আরো বিপাকে পড়লে ধানের দাম আরো কমে যাবে, আর মিলাররা কম দরে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনে চাল বানিয়ে সরকারের কাছে বেশি দামে বিক্রি করার সুযোগ নেবে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ইসমত আরা বেগম বলেছেন, ‘বেশ কয়েক বছর ধরেই আমাদের দেশে এটা প্রায় স্বতঃসিদ্ধ হয়ে গেছে যে প্রকৃত কৃষকরা তাদের উৎপাদন মূল্য তুলতে হিমশিম খাচ্ছে। অথচ অন্য সব পেশার মতো তাদেরও উপার্জনের মূল উৎস হচ্ছে এই ধান উৎপাদন। যেখানে তার উৎপাদন খরচ এবং সংসার চালানোর মতো অর্থ ওঠানোর জন্যই কৃষকের চাষাবাদ করার কথা, সেখানে এখন উৎপাদন খরচই ঠিকমতো উঠছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে কৃষির ভবিষ্যৎ খুব একটা ভালো হবে না।’
ড. ইসমত আরো বলেছেন, ‘সরকারের দিক থেকে কৃষকদের ভাগ্যের উন্নয়নে সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি নেই, প্রচুর ভালো উদ্যোগও আমরা দেখছি। কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কেন যেন কিছু গলদ থেকে যায়। যে গলদের ফাঁক দিয়ে সহজেই মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষকের ভাগের লাভ খেয়ে ফেলে আর বঞ্চিত হচ্ছে কৃষক। এ ক্ষেত্রে আমার মতামত হচ্ছে, যে করেই হোক সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে ধান-চাল সংগ্রহ কর্মসূচির সময় সরকারের লোকজন সরাসরি যাতে কৃষকের কাছে গিয়ে ধান কিনে আনে। মাঝে যেন ডিলার বা মিলারদের কোনো প্রবেশ না থাকে। এ ছাড়া দাম নির্ধারণের সময় যেন কৃষকদের প্রকৃত খরচ ও তাদের লাভের অংশটির কথা মাথায় রাখা হয়।’
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেশে ২০১৯ সালে বোরো মৌসুমে ১ কেজি চাল উৎপাদনে ৩৬ টাকা খরচ পড়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় ১০ লাখ মেট্রিক টন সেদ্ধ চাল, দেড় লাখ মেট্রিক টন আতপ চাল এবং দেড় লাখ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করবে। কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা দরে সেদ্ধ চাল, ৩৫ টাকা দরে আতপ চাল এবং ২৬ টাকা দরে ধান সংগ্রহ করা হবে।
২০১৯ সালের ২৮ মার্চ এফপিএমসির সভায় চলতি বোরো মৌসুমে ২৫ এপ্রিল থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১২ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন ধান-চাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে এক লাখ ৫০ হাজার টন বোরো ধান (চালের আকারে এক লাখ টন), ১০ লাখ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল এবং এক লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন আতপ চাল থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সরকারি সংগ্রহ মূল্য ২৬ টাকা খুবই ইতিবাচক। অর্থাৎ মণপ্রতি দাম হয় এক হাজার ৪০ টাকা। এটাকে কৃষকবান্ধব দর বলা গেলেও বাস্তবে এই দাম কৃষকের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। সরকার মিলারদের মাধ্যমে বেশি দামে চাল কিনলেও মিলাররা কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনছে ৪০০-৫০০ টাকার মধ্যে। এককথায় সরকারি দামের অর্ধেকও পায় না কৃষক; ওই টাকা যায় মধ্যস্বত্বভোগী মিলারদের কাছে। আর মিলাররা ধান শুকানোর মানের অজুহাত তুলে কৃষককে বঞ্চিত করছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি লোকজনও ধান শুকানোর মান নিয়ে মিলারদের কারসাজির সুযোগ করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি হিসাবে এক মণ ধানের দাম হয় ১০৪০ টাকা। কিন্তু বর্তমানে বাজারে এক মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকায়। এতে করে প্রতি মণ ধানে কৃষকের লোকসান হচ্ছে ৪৪০ টাকা। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ