ঢাকা, বৃহস্পতিবার 23 May 2019, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১৭ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ভারতের নতুন নির্বাচন নতুন আশাবাদ নিয়ে আসতে পারে

# নবম বছরেও যৌথ নদী কমিশনের কোন বৈঠকের খবর নেই
# উজানের গঙ্গায় অসংখ্য বাঁধ-ক্যানেল প্রসঙ্গ উপেক্ষিতই থাকে
# তিস্তা-বারাক-মহানন্দা নিয়ে কোন মাথাব্যথা দেখা যাচ্ছে না
# ফারাক্কা চুক্তি অনুযায়ী কখনোই পানি পায় না বাংলাদেশ
সরদার আবদুর রহমান : বাংলাদেশ-ভারত অভিন্ন নদীর পানি নিয়ে বিরাজ করছে এক দীর্ঘ নীরবতা। অচলাবস্থা চলছে যৌথ নদী কমিশন-জেআরসিতেও। এর একতরফা নেতৃত্ব কব্জা করে রেখেছে ভারত। বিদ্যমান ফারাক্কা চুক্তি অনুযায়ীও পানি পাচ্ছে না বাংলাদেশ। দেখা গেছে, বাংলাদেশের স্বার্থের বিভিন্ন ইস্যুতে কংগ্রেস-বিজেপি’র বাইরের সরকারগুলোই বরাবর অনুকূল থেকেছে।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, জেআরসি’র সর্বশেষ বৈঠকের নবম বছরেও নতুন করে কোন বৈঠকের খবর নেই। এযাবত বিশেষ করে ফারাক্কা নিয়ে যতো আলোচনা হয়েছে তাতে উজানের গঙ্গায় অসংখ্য বাঁধ-ক্যানেল প্রসঙ্গ উপেক্ষিতই থেকে গছে। তিস্তা-বারাক-মহানন্দা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য নদীর পানির হিস্যা নিয়েও কোন মাথাব্যথা দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে ফারাক্কা নিয়ে একটি চুক্তি থাকলেও সে অনুযায়ী কখনোই পানি পায় না বাংলাদেশ।
জেআরসি’র সাতকাহন : যৌথ নদী কমিশন (Joint Rivers Commission) ১৯৭২ সালে ঢাকায় বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমান এবং ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর শেষে ১৯ মার্চ যৌথ ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর কার্যবিধি ১৯৭২ সালের ২৪ নভেম্বর ঢাকায় স্বাক্ষরিত হয়। ভারতের নয়াদিল্লীতেও অনুরূপ একটি যৌথ নদী কমিশন রয়েছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সর্বশেষ ২০১০ সালে মার্চে দিল্লীতে জেআরসি’র মন্ত্রী পর্যায়ের ৩৭তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির ব্যাপারে দু’পক্ষ মোটামুটি একমত হয়। পরবর্তী সময়ে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে চুক্তির বিষয়ে আরো অগ্রগতি হয়। ঠিক হয়, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি হবে। তার সফরের আগেই চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হয়। বাকি ছিল শুধু ঢাকায় চুক্তি স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিকতা। শেষ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির দোহাই দিয়ে চুক্তিটি আর স্বাক্ষরিত হয়নি। কূটনৈতিক সূত্র জানায়, পরে ২০১৩ সালের ১৮ জুন ঢাকায় জেআরসির বৈঠক অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ ঠিক করা হয়। আলোচ্যসূচিতে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির খসড়ায় দু’পক্ষের ঐকমত্যের ভিত্তিতে কিছু পরিবর্তনসহ পদ্মায় পানিপ্রবাহের পরিমাণ কমতে থাকার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। বৈঠকের সব আয়োজন চূড়ান্ত হলেও শেষ মুহূর্তে ভারত জানায়, ভারতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের কারণে বৈঠক অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। ঠিক হয় দু’পক্ষের সুবিধা অনুযায়ী যতো দ্রুত সম্ভব বৈঠক হবে। কিন্তু সেই সময় আর আসেনি। সূত্র জানায়, নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকার গঠিত হওয়ার পর বাংলাদেশ ‘পানি কূটনীতি’ পুনরায় শুরু করে। ২০১৪ সালের জুনে জেআরসির বৈঠক অনুষ্ঠানের তাগিদ দিয়ে ভারতের নতুন সরকারকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ। এর জবাবে ভারতের পানিসম্পদ ও নদী উন্নয়নমন্ত্রী এক চিঠিতে তাদের বাজেট অধিবেশনের ধুয়া তুলে বৈঠকে অপারগতা জানান। এরপর ২০১৫ সালের ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে আসেন। এ সফরের আগেও তিস্তা চুক্তির বিষয়টি আলোচিত হয়। কিন্তু তখনো এ সমস্যার সমাধান হয়নি।
এদিকে যৌথ নদী কমিশনের বিধানের ৩ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে ২০১০ সাল থেকে ভারত কমিশনের চেরারম্যান পদে অধিষ্ঠিত রয়েছে। বিধি অনুয়ায়ী প্রতিবছর পালাক্রমে দুই দেশ কমিশনের চেয়ারম্যান পদে সমাসীন হওয়ার কথা। কিন্তু দীর্ঘদিন যাবত এই পদ তারা এককভাবে দখলে রেখেছে। বিধির ৫ অনুচ্ছেদ অনুয়ায়ী কমিশনের সাধারণ অধিবেশনগুলো নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হতে হবে, অন্তত বছরে চারবার। এছাড়াও সরকারের অনুরোধে যে কোনও সময়ে বিশেষ বৈঠক করা যেতে পারে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো, কমিশনের সর্বশেষ এবং ৩৭তম সভাটি ২০১০ সালের মার্চ মাসে নয়াদিল্লীতে অনুষ্ঠিত হয়। সূত্র জানায়, ২০১০ সালের পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে কমপক্ষে ১০টি চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু প্রতিবেশীর কাছ থেকে কোনও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
আড়ালেই থেকে যায় উজানের প্রকল্পগুলো : এযাবত বিশেষ করে ফারাক্কা নিয়ে যতো আলোচনা হয়েছে তাতে উজানের গঙ্গায় অসংখ্য বাঁধ-ক্যানেল প্রসঙ্গ উপেক্ষিতই থেকে গেছে। ভারত অনেক আগে থেকেই গঙ্গায় বৃহদাকার তিনটি খাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এগুলো দেখতেও একেকটি নদীর মতো। এরমধ্যে রয়েছে, ‘আপারগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’, ‘মধ্যগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’ এবং ‘নি¤œগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট।’ এ ধরণের প্রকল্পের হাজার হাজার কি.মি. খালের মাধ্যমে তারা গঙ্গার পানি সরিয়ে নিয়ে সেচ দেবার ব্যাপক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ‘উপর গঙ্গা খাল প্রকল্পের’ মাধ্যমে উত্তর প্রদেশের ২৫ লাখ একর জমিতে সেচ দেয়ার জন্য ৬ হাজার কি.মি. খাল, ‘মধ্যগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’ নামের প্রকল্পে মূল ও শাখাসহ খননকৃত খালের মোট দৈর্ঘের প্রায় ১৬শ’ কি.মি. এবং ‘নিম্নগঙ্গা সেচ প্রকল্পের’ জন্য ৬ হাজার কি.মি. খাল খনন করা হয়েছে। এছাড়াও ভারত গঙ্গার ‘বাড়তি’ পানি কাজে লাগিয়ে ৩ লাখ ১ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেবার জন্য নতুন করে ‘পূর্ব গঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’ তৈরি করেছে। এর মোট দৈর্ঘ প্রায় ১৪০০ কি.মি। এসব ক্যানেল প্রকল্প চাঙা রাখতে নিয়মিতভাবে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। ভারতের ভেতরের গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের পানির উৎস বৃদ্ধির সহায়ক উপনদীগুলোতেও বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পানির জন্য হাহাকার করলেও ফারাক্কায় পানি না থাকার অজুহাতে বাংলাদেশকে পানি বঞ্চিত করা হয়। কিন্তু এসব কার্যক্রমের বিষয় জেআরসি কিংবা অন্যকোন ফোরামে কখনোই আলোচিত হয় না।
গঙ্গার উজানে প্রবাহ হ্রাসের কারণ : গঙ্গার উজানে প্রবাহ কেন কমছে? এ ব্যাপারটি ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের মতামত থেকেই পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের বিশেষজ্ঞ শ্রী অশোক কুমার বসু তার ‘গঙ্গাপথের ইতিকথা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘উত্তরকাশী থেকে ফারাক্কা পর্যন্ত জলবিদ্যুৎ যোজনা সেচ বিভাগ ইত্যাদি সবাই মিলে গঙ্গা ও তার উপনদীগুলো নিয়ে এতো টানা-হেঁচড়া শুরু করেছে যে ফারাক্কার উজানে যথেষ্ট পরিমান পানি কমেছে। পাটনার উজানে সুবিশাল অববাহিকার জল সেচ কাজে লাগিয়ে বহুকাল ধরে গঙ্গার নাব্যতার ক্ষতি করা হয়েছে। ১৮টি ক্যানেল দিয়ে গঙ্গার জল ৫২ হাজার বর্গ কি.মি জমিতে সেচ দেয়া হয়। আপার-লোয়ার গঙ্গা ক্যানেল দু’টি ১৩ হাজার বর্গকিলোমিটারের জন্য সেচের জল টানে। পরিণতিতে হরিদ্বার থেকে এলাহাবাদের মধ্যে গঙ্গা সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। আজ ফারাক্কার কাছে শুকনো মওসুমে জলপ্রবাহের পরিমাণ বাস্তবিক কত তা চিন্তার বিষয়। হয়তো ৫০ হাজার কিউসেকের অনেক নিচে।’ ‘ইন্ডিয়া টুডে’ পত্রিকার এক সংখ্যায় প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়েছে, ফারাক্কা পয়েন্টে আসার আগেই উজানে উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে গঙ্গা থেকে ২৫ থেকে ৪৫ হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। ফলে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে।’
চুক্তি অনুয়ায়ী পানি নেই : যে চুক্তিটি বর্তমানে রয়েছে সে অনুয়ায়ীও পানি পাচ্ছে না বাংলাদেশ। ফারাক্কা পয়েন্টে পানি না থাকায় এবছর জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম দশ দিন পর্যন্ত মোট চারটি কিস্তির প্রতিটিতে পানি কম পেয়েছে বাংলাদেশ। চুক্তির ইন্ডিকেটিভ সিডিউল অনুযায়ী ভারত এ পরিমাণ পানি কম দেয়। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, চুক্তির আওতায় এ সময়ে বাংলাদেশ পাওয়ার কথা ২,২১,৬৬৬ কিউসেক পানি। কিন্তু পেয়েছে ১,৭৩,৬০৪ কিউসেক পানি। এবারে জানুয়ারি মাসের ১ থেকে ১০ দিনে চুক্তির ইন্ডিকেটিভ সিডিউল অনুযায়ী বাংলাদেশ ফারাক্কা পয়েন্টে পাওয়ার কথা ৬৭,৫১৬ কিউসেক পানি। কিন্তু বাংলাদেশ পেয়েছে ৬১,০২৪ কিউসেক। দ্বিতীয় দশ দিনে পানি আরো কমেছে। জানুয়ারির দ্বিতীয় দশ দিনে বাংলাদেশ পাওয়ার কথা ছিল ৫৭,৬৭৩ কিউসেক পানি। কিন্তু বাংলাদেশ এই দশ দিনে ১৫,০৯৩ কিউসেক পানি কম পেয়েছে। আর জানুয়ারির শেষ দশ দিনে অর্থাৎ ২১ থেকে ৩০ পর্যন্ত এই দশ দিনে পাওয়ার কথা ছিলো ৫০,১৫৪ কিউসেক পানি, কিন্তু পেয়েছে ৩৫,০০০ কিউসেক। এছাড়া, ফেব্রুয়ারির প্রথম দশ দিনে বাংলাদেশের পাওয়ার কথা ছিল ৪৬,৩২৩ কিউসেক। কিন্তু পেয়েছে ৩৫,০০০ কিউসেক। এই সিডিউল মে মাস পর্যন্ত চালু থাকে। সর্বশেষ হিসেব এখনো পাওয়া যায়নি। এবিষয়ে ভারতকে তাগাদা দেয়া হলে তারা ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে’ শিডিউল অনুযায়ী তারা পানি দিতে পারছে না বলে বাংলাদেশকে জানায়। তারা বলছে, বেশি বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ভাটিতে পানি কম পাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু উজানে অসংখ্য প্রকল্প করে গঙ্গার বেশিরভাগ পানি সরিয়ে নেয়ার বিষয়টি তারা বেমালুম চেপে যায়।
কংগ্রেস-বিজেপি’র বাইরের সরকারগুলোই অনুকূল : প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশের স্বার্থের বিভিন্ন ইস্যুতে কংগ্রেস-বিজেপি’র বাইরের সরকারগুলোই বরাবর অনুকূল থেকেছে। যেমন, সমঝোতা স্বাক্ষর বাদে বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গার পানি নিয়ে যে দু’টি পূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে তা হয়েছে আঞ্চলিক জোট সরকারের আমলে। ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর কেবল সমঝোতা স্বাক্ষরের উপরেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ ছিলো। এনিয়ে অচলাবস্থাও অব্যাহত থাকে। তবে ভারতে জনতা দল সরকার গঠনের পর আলোচনার জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ১৯৭৭ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের জিয়াউর রহমান সরকারের সঙ্গে ভারতের জনতা পার্টির প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই-এর পানি বণ্টন বিষয়ে পাঁচ বছর মেয়াদী একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৮২ সালে সে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। ১৯৮২ সালের ৪ অক্টোবর জেনারেল এরশাদ সরকার ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টন বিষয়ে দু’বছর মেয়াদী একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। ১৯৮৫ সালের ২২ নভেম্বর তিন বছরের জন্য আরেকটি সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু যেহেতু তখনো পানিপ্রবাহ বৃদ্ধির ব্যাপারে কোনো চুক্তি ছিল না, তাই ভারত পানিবণ্টন বিষয়ক সমঝোতা চুক্তির মেয়াদ আর বৃদ্ধি করতে সম্মত হয়নি। সর্বশেষ চুক্তিতে বাংলাদেশের ৩৪ হাজার ৫শ’ কিউসেক পানি পাওয়ার কথা থাকলেও ভারত ১৯৯৩ সালের শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে ১০ হাজার কিউসেকেরও কম পানির প্রবাহ রাখে। কোনো চুক্তি কার্যকর না থাকায় ভারত বাংলাদেশকে গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে অব্যাহতভাবে বঞ্চিত করে চলে। ভারতের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতি না হওয়ায় বিএনপি সরকার বিষয়টি আবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে উত্থাপন করে। ১৯৯৩ সালের অক্টোবরে সাইপ্রাসে অনুষ্ঠিত কমনওয়েল্থ শীর্ষ সম্মেলনেও তা উত্থাপিত হয়।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর গঙ্গার পানি বণ্টন সম্পর্কে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় এবং ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লীতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতেও কংগ্রেস-বিজেপি’র বাইরের সরকারই ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী জনতা দলের এইচ.ডি দেবগৌড়ার সঙ্গে এই চুক্তি হয়। এতে নির্ধারিত হয়, উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে গৃহীত ফর্মুলা মোতাবেক ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সময়ে দু’দেশের মধ্যে গঙ্গার পানি ভাগাভাগি হবে এবং ভারত নদীটির পানিপ্রবাহের মাত্রা গত ৪০ বছরের গড় মাত্রায় বজায় রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। যেকোন সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ৩৫ হাজার কিউসেক পানির নিশ্চয়তা পাবে। দীর্ঘ মেয়াদে গঙ্গার পানি প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে উভয় দেশ পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজনে এবং দু’দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত অন্যান্য নদীর পানি বণ্টনের ক্ষেত্রেও অনুরূপ চুক্তিতে পৌঁছানোর ব্যাপারে একমত হয়। কিন্তু এযাবত ভারত এই চুক্তির বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে উদাসীনতা দেখিয়ে চলেছে।
বিশেষজ্ঞ অভিমত : এবিষয়ে দেশের বিশিষ্ট নদী গবেষক ও নদীবিষয়ক বহু গ্রন্থ প্রণেতা মাহবুব সিদ্দিকী দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত অভিন্ন নদীর পানি নিয়ে যে সমস্যা তাতে উজানের দেশ হিসেবে ভারত একশত ভাগ সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। আর ভারত ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহিত আন্তর্জাতিক নদীবিষয়ক সনদেও স্বাক্ষর করেনি। সেই সুবাদে তারা কথিত ৫৪টি (প্রকৃতপক্ষে এখন পর্যন্ত ১০১টি) অভিন্ন নদীর পানি বাংলাদেশকে অবহিত না করেই ইচ্ছামাফিক প্রত্যাহার করে চলেছে। এ অবস্থায় নদী সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের আচরণ কখনোই নৈতিকতা ও প্রচলিত নিয়মনীতির পর্যায়ে পড়ে না। ইতোমধ্যে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ গুরুতর সংকটের শিকার হয়েছে। এই অবস্থায় ভারতীয় পক্ষ চুক্তি অনুয়ায়ী জেআরসি’র নির্ধারিত বৈঠকাদি করা থেকে বিরত থাকা তাদের অপকৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই বৈঠক না হওয়ার সুবাদে ভারত কৌশলে জেআরসি’র চেয়ারম্যান পদ দখল করে রেখেছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, বৈঠক না হলেই তাদের সুবিধা। এই মনোবৃত্তির পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ