ঢাকা, শনিবার 25 May 2019, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১৯ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ভারতে নয়া মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে

সংগ্রাম ডেস্ক : বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দেশটির ৫৪৩ আসনের লোকসভায় সাত দফায় ভোট হয় ৫৪২টিতে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ২৭২টি আসন।
গতকাল শুক্রবার সকালে নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোদির বিজেপি ভারতের লোকসভার ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ২৮৭টি আসন পেয়েছে, যার মাধ্যমে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে দলটি। সাড়ে তিনশ’র কাছাকাছি দখল করেছে বিজেপির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক জোট (এনডিএ)। তাদের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস পেয়েছে ৫০টি আসন। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নেতৃত্বাধীন অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস ১৯টি আসন জিতেছে।
একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ১৩০ কোটি জনসংখ্যার দেশটির নেতৃত্ব দিতে চলেছেন মোদি। তার ‘হিন্দু-প্রথম’ জাতীয়তাবাদের ওপরই আস্থা রেখেছে ভারতবাসী। বুথফেরত জরিপকেও পেছনে ফেলেছে বিজেপি।
গত ১১ এপ্রিল থেকে ১৯ মে পর্যন্ত মোট সাতটি ধাপে দীর্ঘ ছয় সপ্তাহব্যাপী ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সারা দেশে মোট ভোটার ছিল প্রায় ৯০ কোটি।
২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির দল ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করেছিল। গত নির্বাচনে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক জোট (এনডিএ) পেয়েছিল ৩৩৬টি আসন। যার মধ্যে ২৮২টি আসন জিতে নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল বিজেপি। কংগ্রেস জিতেছিল মাত্র ৪৪টি আসনে।
নির্বাচনে জয়ের পর টুইট করে দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। তারা বলেছেন, ‘এই জয় দেশের মানুষের জয়, যুব সম্প্রদায়ের জয়, গরিবের জয়’।
এদিকে জয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। তিনি বলেন, ‘জনতা সবকিছুর মালিক। আমরা দেশবাসীর রায় মেনে নিলাম। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘দেশের যত্ন নিন। দেশের স্বার্থ রক্ষা করুন।’ পাশাপাশি রাহুল জানান, আদর্শের লড়াই তারা লড়াই চালিয়ে যাবেন।
প্রোটেম স্পিকার নির্বাচিত হতে চলেছেন বেরেলি থেকে নির্বাচিত প্রবীণ সংসদসদস্য সন্তোষ কুমার গাঙ্গোয়ার। তিনিই নবনির্বাচিত সংসদসদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান।
ভোটের ফলে স্পষ্ট জনমত। এ বার সরকার গঠনের পালা। সেই লক্ষ্যেই গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠক করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র  মোদি। আলোচনা হয়েছে শপথগ্রহণের দিনক্ষণ নিয়েও। তার মধ্যেই ভাসছে মন্ত্রিসভার জল্পনাও। স্বরাষ্ট্র, অর্থ, প্রতিরক্ষা, বিদেশ এই ‘বিগ-ফোর’ এ কারা থাকবেন, সে সব নিয়ে রাজনৈতিক শিবিরে শুরু হয়েছে গুঞ্জন। বিজেপির অন্দরের খবর, অমিত শাহকে সংগঠনের পাশাপাশি মন্ত্রিত্বে আনা হতে পারে। অসুস্থতার জন্য মন্ত্রিসভার বাইরে রাখা হতে পারে অরুণ জেটলিকে। পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক সাফল্যের পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় এ রাজ্যের উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব থাকার সম্ভাবনা প্রবল।
শনিবারের এই বৈঠকের পর থেকেই কার্যত শুরু হয়ে গেল সপ্তদশ লোকসভা গঠনের প্রোটোকল বা রীতিনীতি। সব মন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার নেতা হিসেবে ইস্তফা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সেই পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দকে পাঠিয়ে দেবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র  মোদি। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতিকে ষোড়শ লোকসভা ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ করবেন। রাষ্ট্রপতি লোকসভা ভেঙে দেওয়ার পরই নবনির্বাচিত সংসদসদস্যদের তালিকা রাষ্ট্রপতিকে তুলে দেবে নির্বাচন কমিশন। তার পর সপ্তদশ লোকসভা গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রীর শপথগ্রহণের দিনক্ষণ জানতে চাইবেন রাষ্ট্রপতি।
 প্রোটেম স্পিকার নির্বাচিত হতে চলেছেন উত্তরপ্রদেশের বেরেলি থেকে নির্বাচিত প্রবীণ সাংসদ সন্তোষ কুমার গাঙ্গোয়া। তিনিই নবনির্বাচিত সংসদসদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন। অন্য দিকে স্পিকার নির্বাচন নিয়েও জল্পনা রয়েছে। কারণ এবার সুমিত্রা মহাজনকে টিকিট দেয়নি বিজেপি। ফলে সপ্তদশ লোকসভার স্পিকার নিয়েও শুরু হয়েছে ভাবনাচিন্তা।
শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান নিয়েও এ দিনের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব সূত্রে খবর। ২০১৪ সালে সার্কভুক্ত সব দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। শপথগ্রহণের দিনক্ষণ ঠিক করার পাশাপশি এ বার কাকে কাকে আমন্ত্রণ জানানো হবে, এ দিনের বৈঠকে তার একটা রূপরেখা নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। সেই মতো আমন্ত্রণ জানানোর প্রক্রিয়াও শীঘ্রই শুরু হবে।
২০১৪-র চেয়েও বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ফের সরকার গঠন করছে এনডিএ তথা বিজেপি। ফের প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসছেন নরেন্দ্র  মোদি। এই পর্যন্ত স্পষ্ট। মোদি-শাহ জুটির এই বিপুল সাফল্যের পর মন্ত্রিসভা কি ঢেলে সাজবে, নাকি পুরনোদের উপরেই আস্থা রাখবেন, তা নিয়ে বিজেপির অভ্যন্তরে এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে গুঞ্জন চরমে।  মোদি-অমিত শাহ জুটির ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রে খবর, এ বার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে অমিত শাহকে। বিগ ফোর’-এর বাকি তিন মন্ত্রকÍঅর্থ, বিদেশ এবং প্রতিরক্ষা নিয়েও জোর গুঞ্জন।
অরুণ জেটলি দীর্ঘদিন ধরে কিডনি সংক্রান্ত রোগে ভুগছেন। একাধিক বার বিদেশে গিয়েও চিকিৎসা করিয়ে এসেছেন। ফলে এ বার তাকে মন্ত্রিসভার বাইরে রাখার সম্ভাবনা জোরদার। তা হলে অর্থমন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব কে পেতে পারেন? উঠে আসছে পীযূষ গয়ালের নাম। অরুণ জেটলি বিদেশে থাকার সময় তিনিই অর্থমন্ত্রনালয় সামলেছেন। এমনকি, ভোটের আগে অন্তর্বরতী বাজেটও পেশ করেছেন। তা ছাড়া ব্যক্তিগত ভাবেও তিনি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। ফলে অরুণ জেটলি দায়িত্ব নিতে না চাইলে বা দলের সিদ্ধান্তে তাঁকে বাইরে রাখা হলে অর্থের দৌড়ে এগিয়ে মহারাষ্ট্র থেকে নির্বাচিত রাজ্যসভার সাংসদ গয়াল।
পিররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের কাজে সন্তুষ্ট প্রধানমন্ত্রী। মনোহর পর্রকির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ছেড়ে গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন নির্মলা সীতারামন। তার পারফরম্যান্সও সন্তোষজনক। ফলে এই দুই দফতর পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সেক্ষেত্রে অবশ্য রাজনাথ সিংহকে গুরুত্বপূর্ণ কোনও মন্ত্রণালয় দেওয়া নিয়ে চিন্তা রয়েছে।
বিরোধী শিবিরে সবচেয়ে বড় ইন্দ্রপতন অমেঠীতে। প্রায় চার দশক ধরে উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেস তথা গাঁধী পরিবারের দুর্গ অমেঠীতে এ বার জিতেছেন স্মৃতি ইরানি। তাও আবার বিরোধী শিবিরের প্রধান মুখ তথা কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধীকে হারিয়ে। তার পুরস্কার হিসেবে বস্ত্র মন্ত্রণালয় থেকে তার পদোন্নতি প্রায় নিশ্চিত বলেই বিজেপি সূত্রে খবর।
 দেশ জোড়া সাফল্যের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে বিরাট সাফল্য পেয়েছে বিজেপি। ২ সংসদসদস্য থেকে এ বার ১৮তে পৌঁছে গিয়েছে পদ্ম। আগের বার দার্জিলিংয়ের সুরেন্দ্র সিংহ অহলুওয়ালিয়া এবং আসানসোলের সংসদসদস্য বাবুল সুপ্রিয় দু’জনই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এ বার সেই সংখ্যাটা যে বাড়বে তা প্রায় নিশ্চিত। শুধু কতজন বাড়বে এবং কারা শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভায় জায়গা পাবেন, তা নিয়েই জল্পনা তুঙ্গে উঠেছে বিজেপির কেন্দ্রীয় এবং বাংলার নেতৃত্বের মধ্যেই।
ভোটে ভরাডুবির পর কংগ্রেসে পদত্যাগের হিড়িক : লোকসভা নির্বাচনে টানা দ্বিতীয়বার ভরাডুবির পর পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে ভারতীয় কংগ্রেসে। উত্তর প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি রাজ বাব্বরসহ তিন রাজ্যপ্রধান এরইমধ্যে দলের সভাপতি রাহুল গান্ধীর কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো।
কংগ্রেসের কর্ণাটক প্রচারণা ব্যবস্থাপক এইচ কে পাতিল ও উড়িষ্যা প্রধান নিরঞ্জন পাটনায়েকও পদত্যাগ করেছেন। আনন্দবাজার পত্রিকা।
পদত্যাগের গুঞ্জন রয়েছে রাহুলেরও। শনিবার (২৫ মে) দলের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী কমিটির কাছে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে।
ভারতের ১৭তম লোকসভা নির্বাচনে মোটেও সুবিধা করতে পারেননি কংগ্রেস সভাপতি। নির্বাচনী প্রচারণায় তার ‘চৌকিদার চোর’ স্লোগান একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে। গান্ধী পরিবারের দুর্গ বলে পরিচিত আমেথির আসনেও হেরে গেছেন রাহুল। নির্বাচনে বিজেপির সাড়ে তিনশ’র বেশি আসনের বিপরীতে কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ৯২টি।
বলা হয়, উত্তর প্রদেশ যাদের, ভারত সরকার তাদের। সেখানকার ৮০টি আসনের মধ্যে এবার কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র একটি আসন। রাহুল গান্ধীর বোন প্রিয়াংকা গান্ধীকে সাধারণ সম্পাদকের পদ দিয়ে জোর প্রচারণা চালালেও লাভ হয়নি তাতে। রাজ্যের একমাত্র জেতা আসনটি হচ্ছে সোনিয়া গান্ধীর রায়েবারেলি।
ফতেহপুর সিকরি আসন থেকে কংগ্রেসের হয়ে নির্বাচন করেছেন প্রখ্যাত বলিউড অভিনেতা রাজ বাব্বর। জিততে পারেননি তিনিও। একারণে, দলের ভরাডুবির দায় নিজের কাঁধে নিয়েছেন এ নেতা।
বৃহস্পতিবার এক টুইট বার্তায় রাজ বাব্বর বলেন, উত্তর প্রদেশে কংগ্রেসের ফলাফল লজ্জাজনক। নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে না পারায় নিজেকে দোষী মানছি। দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দেখা করে আমার সিদ্ধান্ত জানাবো।  এসময় জনগণের ভরসা জেতায় নির্বাচনে বিজয়ীদের অভিনন্দনও জানিয়েছেন তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ