ঢাকা, রোববার 26 May 2019, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ২০ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ভারতে হিন্দুত্ববাদের বিশাল জয়

ভারতের লোকসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অগ্রিম ধারণা দিয়েছিলেন যে, এই নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি তথা এনডিএ জোট জিতবে, কিন্তু গত বারের তুলনায় তাদের আসন সংখ্যা কমে যাবে। কিন্তু নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গেলো সম্পূর্ণ উল্টো। বিজেপির আসন সংখ্যা কমেনি, বরং বেড়েছে। গতবারে তারা পেয়েছিল ২৮২টি আসন। এবার তারা পেয়েছে ৩০৩টি আসন। অর্থাৎ এককভাবে শুধুমাত্র বিজেপিরই আসন সংখ্যা বেড়েছে ২১টি। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। এমনকি প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং ২৭টি মিটিং করেছেন এবং বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ ৪০টির বেশি সভা করেছেন। বিজেপি এবং তৃণমূলের ভেতরে অনেক জায়গায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও হয়েছে। তদসত্বেও সাধারণ ধারণা ছিল এই যে বিজেপির হয়তো ৩/৪ রটি আসন বাড়তে পারে। তার পরেও সেখানে তৃণমূলের দুর্গ অক্ষুণœ থাকবে। কিন্তু এখানেও ফল হয়েছে উল্টো। সারা ভারত জুড়ে বিজেপি যে অতিরিক্ত ২১টি আসন পেয়েছে তার ১৮টি পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। গতবার বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে পেয়েছিল মাত্র ২টি আসন। আর এবার তারা সেখানে পেয়েছে ১৮টি আসন। অর্থাৎ তাদের আসন বেড়েছে ১৬টি। মমতা ব্যানার্জি দাবি করেছিলেন, ৪২টির মধ্যে ৪২টি আসনই তার দল তৃণমূল পাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, গতবারে তিনি যে ৩৪টি আসন পেয়েছিলেন এবার সেটাও কমে গেল। এবার তিনি পেয়েছেন ২২টি আসন। অর্থাৎ তার আসন কমেছে ১২টি। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এই যে শুধুমাত্র আসন সংখ্যা নয়, ভোটের হারও বিজেপির পশ্চিমবঙ্গে বেড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের ভোট কমে হয়েছে ৪৩ শতাংশ, আর বিজেপির ভোট বেড়ে হয়েছে ৪০ শতাংশ।
মন্তব্য করার আগে আরও কয়েকটি তথ্য পরিবেশন করা প্রয়োজন। সারা ভারতে রাজ্য বা প্রদেশ রয়েছে ২৯টি। তার মধ্যে ১৬টি প্রদেশ বা রাজ্যে কংগ্রেস রাউটেড। অর্থাৎ তারা একটি আসনও পায়নি। এই ১৬টি প্রদেশ হলো, অন্ধ্র প্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, চন্ডিগড়, গুজরাট, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু এবং কাশ্মীর, লাক্ষ্মাদ্বীপ, মনিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, দিল্লী, রাজস্তান, সিকিম, ত্রিপুরা এবং উত্তরখন্ড। এছাড়া দুটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলেও তারা একটি আসনও পায়নি। এই দুটি অঞ্চল হলো দাদরা ও নগর হাভেলী এবং দমন ও দিউ।
সুতরাং এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ভারতের  অধিকাংশ রাজ্যে গেরুয়া নিশান সমুন্নত হয়েছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে মৌলবাদী হিন্দুত্ববাদ পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের অধিকাংশ জনগোষ্ঠীকে গ্রাস করেছে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ২৭২টি আসন। সেখানে এনডিএ (যার প্রধান শরীক বিজেপি) পেয়েছে ৩৫০টির বেশি আসন। কংগ্রেসের জোট ইউপিএ পেয়েছে ৯০টি আসন। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হলো এই যে, বিজেপির গেরুয়া বসন পশ্চিমবঙ্গকেও অনেকাংশে গ্রাস করেছে। গত নির্বাচনে (২০১৪) গেরুয়া ধারীরা অর্থাৎ বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ২টি আসন। এবার তারা কব্জা করেছে ১৮টি আসন। অর্থাৎ হিন্দুত্ব পশ্চিমবঙ্গে গ্রাস করেছে অতিরিক্ত ১৬টি আসন। আমি ২৯টি রাজ্য ওয়ারী ফলাফলে গেলাম না। সেগুলো ধীরে ধীরে বিস্তারিত জানা যাবে। তবে হিন্দুত্ববাদীরা ধাক্কা খেয়েছে ভারতের সর্ববৃহৎ  প্রদেশ উত্তর প্রদেশে। গতবার এই প্রদেশের ৮০টি আসনের মধ্যে তারা দখল করেছিল ৭১টি আসন। এবার সেটি কমে গিয়ে হয়েছে ৫৭টি আসন। অর্থাৎ এই প্রদেশ গেরুয়া মুক্ত হয়েছে ১৪ টি আসনে। ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজ্য হলো মহারাষ্ট্র। সেখানেও হিন্দুত্ববাদ জয়লাভ করেছে ২৩টি আসনে।
॥দুই॥
কেন বিজেপির এই বিশাল বিজয়। রাজনৈতিক পন্ডিতরা ধারণা করেছিলেন যে, বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ এবারও নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। কিন্তু তাদের গতবারের তুলনায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা কমে যাবে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি এবার খেলেছেন ২টি তাস। একটি হলো হিন্দুত্ব। আর একটি হলো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হামলা তথা কাশ্মীর তাস।
ডনর্বাচনী প্রচারণার পূর্বাহ্নে বেকারত্ব, রুপি ডিমানিটাইজেশন প্রভৃতি কারণে বিজেপির জনপ্রিয়তা কমে যায়। এছাড়া হিন্দুপ্রধান ৫টি রাজ্য, যেগুলোকে ভারতের হার্টল্যান্ড স্টেট বলা হয় সেগুলোর বিধান সভা নির্বাচনে বিজেপি হেরে যায়। ঐ দিকে উত্তর প্রদেশে বহুজন সমাজবাদী পার্টির মায়াবতী এবং সমাজবাদী পার্টি অখিলেশ যাদব  ঐক্যজোট গঠন করেন। এর ফলে ধারণা করা হয় যে উত্তর প্রদেশ এবং হার্টল্যান্ড স্টেটসমূহে বিজেপির আসন অনেক কমবে। কিন্তু কাশ্মীরের ঘটনা সমস্ত রাজনৈতিক হিসাব নিকাশকে ল-ভ- করে দেয়।
নির্বাচনের আগে কাশ্মীরের স্বাধীনাত সংগ্রামীরা গেরিলা আক্রমণ করে ভারতের ৪২ জন আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্যকে হত্যা করে। মোদি দেখেন যে নির্বাচনের আগে এটিই তার জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ। তিনি পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিমান হামলা করেন এবং সারা দেশব্যাপী তীব্র পাকিস্তান বিরোধী জিগির তোলেন। ভারতীয়রা ১৯৪৭ সালের পর থেকেই প্রবলভাবে পাকিস্তান বিরোধী। সুতরাং তারা মনে করেন যে, মোদির মতো শক্ত মানবের হাতেই ভারতের নিরাপত্তা সুরক্ষিত। আর এই কারণে জনগণ সাময়িকভাবে বেকারত্ব এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সমস্যা ভুলে গিয়ে স্ট্রং ম্যান মোদির পেছনে জমায়েত হন। 
কিছুক্ষণ আগেই এই নির্বাচনের প্রভাব বাংলাদেশে কিভাবে পড়তে পারে সে সম্পর্কে কিঞ্চিত আলোচনা করা হয়েছে। ভারত ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারী। আর বাংলাদেশের আওয়ামী সেক্যুলার শিবির সেই ধর্মনিরপেক্ষতার জয়গানে মুখর। বাংলাদেশে ইসলামের কথা বলা হলেই বলা হয় মৌলবাদী। কিন্তু ভারতে যখন হিন্দুত্বের কথা বলা হয় তখন তারা সেটাকে মৌলবাদী বলে না। কিন্তু এই নির্বাচনে দেখা গেলো, হিন্দু মৌলবাদ ভারতকে তো গ্রাস করেছে বটেই, হিন্দুত্বের আগ্রাসী থাবা থেকে মুসলিম বান্ধব মমতা ব্যানার্জিও নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি। গতবারে তাঁর তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গে যেখানে পেয়েছিল ৩৪ টি আসন, এবার সেখানে মমতা পেয়েছেন ২৫টি আসন। অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদ পশ্চিমবঙ্গে উদারপন্থী মমতার নিকট থেকে কেড়ে নিয়েছে ৯টি আসন।   
॥তিন॥
ভারতে বিজেপির এই বিশাল বিজয় বাংলাদেশের ওপর কতখানি প্রভাব বিস্তার করবে? এই প্রশ্নটি এখন একশ্রেণীর রাজনীতিক দল এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মাথায় ঘোরাফেরা করছে। এখনও কেউ ঝেড়ে কাশছেন না। তবে বর্ষীয়ান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রওনক জাহান  বিবিসির কাছে তার মতামত খোলামেলা ব্যক্ত করেছেন। ভারতের লোকসভা নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি যে ব্যাপক বিজয় পেয়েছে, তা বাংলাদেশের জন্য চিন্তার কারণ হতে পারে বলে মনে করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান।
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন যে, বহু বছর ধরে উপমহাদেশে ভারতের পরিচিতি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির একটি মডেল হিসেবে। তবে তিনি মনে করেন যে ভারতে পরপর দুটো নির্বাচনে বিজেপির জয় বাংলাদেশের সেক্যুলার রাজনীতি যারা করতে চায়, তাদেরকে চিন্তায় ফেলবে।
অধ্যাপক জাহানের মতে, বাংলাদেশ সরকার চাইবে ভারত সরকারের সাথে সম্পর্ক ভালো রাখার। কিন্তু ভবিষ্যতে সে সম্পর্ক কোন দিকে যাবে, সেটি নির্ভর করছে বিজেপি সরকারের মনোভাবের ওপর।
রওনক জাহান বলেন, ভারতে যদি সেক্যুলার রাজনীতি না চলে এবং তারা যদি আমাদের চারদিকে বিদ্বেষের রাজনীতি নির্বাচনে জেতার জন্য আরম্ভ করে দেন, তখন সরকারের পক্ষে সে জিনিসটা ম্যানেজ করা আরো অসুবিধা হবে। হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি ভারতে যেভাবে দিনকে দিন শক্তিশালী হচ্ছে, তার প্রভাব বাংলাদেশের উপরে থাকবে বলে অনেকে মনে করেন। কারণ বাংলাদেশকে ঘিরে থাকা ভারতের রাজ্যগুলোতে এবারের নির্বাচনে বিজেপি বেশ ভালো ফলাফল করেছে।
ভারতে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান হলে, বাংলাদেশ সরকার চাইলেও  ভারতের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব নাও হতে পারে? - এমন এক প্রশ্নে তেমন আশংকা একেবারে উড়িয়ে দেননি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান। তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের বৃহৎ প্রতিবেশী। বাংলাদেশের সব সরকারই চাইবে যে ভারতের সাথে সুসম্পর্ক বজায় থাকুক। তবে বাংলাদেশের সরকারকে দেশের জনগণের মনোভাবের দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ কোন কনসেশন বা ছাড় পাচ্ছে না বলে মনে করেন অধ্যাপক জাহান। এ ক্ষেত্রে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ভারতের অনাগ্রহকে একটি বড় উদাহরণ হিসেবে তিনি মনে করেন।
সাম্প্রতিক বছরে ভারতের আসাম রাজ্যে নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ায় বলা হয়েছে যে ৪০ লাখ মানুষ অবৈধভাবে সেখানে বসবাস করছে, যাদের বেশিরভাগ মুসলমান। বিভিন্ন সময় বিজেপির সিনিয়র নেতারা বলেছেন যে অবৈধভাবে যারা আসামে বসবাস করছেন, তাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে। নির্বাচনের প্রচারণার সময় বিজেপি পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে আসামের মতো নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কাজ পশ্চিমবঙ্গেও তারা করতে আগ্রহী।
এ প্রসঙ্গে রওনক জাহান বলেন, তাদের নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য মুসলমানদের উপরে কিংবা বাঙালিদের উপরে তারা যে ধরনের শ্লোগান ব্যবহার করছেন, এগুলো হলে আমাদের সাধারণ মানুষ তো খুব বিক্ষুব্ধ থাকবে। কিন্তু আমাদের সরকার তো কখনোই চাইবে না ভারতের সাথে সম্পর্ক বিরূপ হোক। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষের সেন্টিমেন্টকে তো তাদের দেখতে হবে। এ বিষয়টি বাংলাদেশে সরকারের জন্য এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে বলে মনে করেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। ভারতে বিজেপি যদি মুসলিম-বিরোধী কথাবার্তা জোরালো করে, তাহলে সে বিষয়টি বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সুযোগ  তৈরি করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এই নির্বাচন সম্পর্কে আমাদের নতুন করে কিছু বলার নাই। যিনি যত কথাই বলুন না কেন ভারতীয় জাতীয়তাবাদ যে হিন্দু জাতীয়তাবাদ সেটিই ২০১৪ ও ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলো।
Email:asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ