ঢাকা, রোববার 26 May 2019, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ২০ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

একেশ্বরবাদী ব্রাহ্মসমাজ মন্দির

পাটুয়াটুলি ব্রাহ্মসমাজ মন্দির

ইবরাহীম খলিল : বাংলাবাজার চৌরাস্তা মোড় থেকে পাটুয়াটুলীর দিকে রওনা করলে ১০ কদম পরই ডান পাশে চোখে পড়বে সুদৃশ্য একটি দালান। সিঁদুর রঙের এ দালানটি ব্রাহ্মসমাজ মন্দির। সাজানো-গোছানো পরিবেশে মন্দিরের সামনে প্রশস্ত ফুলের বাগান। পেছনে আছে নানা ফলের বাগান। ফলের গাছ-গাছালি ছাড়িয়ে মন্দির পরিচালকদের বসতি। এখানে বসবাস করেন বাংলাদেশের প্রথম নারী বিবাহ নিবন্ধক কবিতা রানী দত্ত রায় ও আরো একজন চন্দনা পাল। এ দুজন বাংলাদেশের একমাত্র নারী বিবাহ নিবন্ধক। সুচিত্রা সেন একবার ব্রাহ্মসমাজে এসেছিলেন। সে সময়ের ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক পাখাটিসহ শত বছরের পুরনো ঘড়ি, রাজকীয় পালংক টি-টেবিল, টেবিল, মুখ দেখার আয়না এখনো ব্যবহার হচ্ছে প্রাণেশ সমদ্দার খোকনের শোয়ার ঘরে।
দালানটির দোতলায় আছে এন্টিক পালংক, আলমারি, টেবিলের এক বিশাল সংগ্রহশালা। রয়েছে কুমিল্লার জমিদার ও বরিশালের রানীর ব্যবহৃত পালংক। একতলা হলরুমে মাঘ মাসে বসে বার্ষিক প্রার্থনা সভা ও কাউন্সিল। ভারতবর্ষের নানা অঞ্চল থেকে ব্রাহ্মবাদীরা এসে অংশ নেয় সেই প্রার্থনা সভায়।
বাংলা পিডিয়া থেকে জানা যায়, বেদান্তের একেশ্বরবাদের ওপর ভিত্তি করে ১৮২৮ সালে রাজা রামমোহন রায় ‘ব্রাহ্মসভা’ গঠন করেন। পরে এটি ‘ব্রাহ্ম সমাজ’ নামে পরিচিত হয়। প্রাহ্মরা নিরাকার ঈশ্বরের আরাধনা করেন। এই সমাজের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় হিন্দুদের মধ্যে ধর্মীয় ভেদাভেদ ও কুসংস্কার দূর করা। এর সঙ্গে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কেশবচন্দ্র সেনসহ বিখ্যাত ব্যক্তির নাম জড়িয়ে আছে।
১৯৪৩ সালের ২১ ডিসেম্বর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার দত্তসহ ১৯জন তরুণ ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষাগ্রহণ করেন। এটা তার ব্রাহ্মসমাজে প্রথম দীক্ষাদান অনুষ্ঠান। পরবর্তী সময়ে ঢাকা, মেদিনরীপুর, রংপুর, কমিল্লা, বাঁশবেড়িয়া, সুখসাগরসহ আরো কিছু জায়গায় মানুষ ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে ব্রাহ্মসমাজ গড়ে তোলেন। ব্রাহ্মরা হিন্দু ধর্মের গোঁড়ামি বিরোধী, তাঁরা মূর্তিপূজার বিরোধী। তারা জাতিভেদ প্রথাও মানেন না। মূলত হিন্দু ধর্মের সংস্কারের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেও পরবর্তী সময়ে ব্রাহ্ম একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্ম সম্প্রদায়ের রূপ গ্রহণ করে।
১৮৪৬ সালের দিকে ব্রজসুন্দর মিত্র, যাদবচন্দ্র বসু, গোবিন্দচন্দ্র বসু, নরোত্তম মল্লিক, রামকুমার বসুসহ অন্যরা মিলে ঢাকায় বাহ্মসমাজ আন্দোলন শুরু করেন। প্রথম দিকে ব্রাহ্মসমাজের সভ্যদের বাড়িতেই এর কার্যক্রম চলত। তবে ঢাকা ব্রাহ্মসমাজের প্রথম উপাসনা সভা অনুষ্ঠিত হয় ব্রজসুন্দর মিত্রের ভাড়াবাড়িতে। ১৮৪৭ থেকে শ্রীশচন্দ্র দাসের বাড়ি ‘ত্রিপালী’ এবং ১৮৫৭ সালে ব্রজসুন্দর মিত্রের বাড়িতে ব্রাহ্মসমাজের কার্যক্রম চলাকালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকায় ব্রাহ্মসমাজ পরিদর্শনে এসেছিলেন। পাটুয়াটুলীতে ব্রাহ্ম সমাজের মন্দিরে প্রতি রোববার প্রার্থনা হয়। সমাজের সাধারণ সম্পাদক রনবীর পাল বললেন ব্রাহ্ম সমাজের আদ্যোপান্ত। ব্রাহ্মদের মধ্যে দুটি ভাগ আছে। এ দুটি হলো জন্মসূত্রে ব্রাহ্ম ও অ-আনুষ্ঠানিক ব্রাহ্ম। হিন্দুদের মধ্যে যাঁরা ব্রাহ্মধর্ম সমর্থন করেন, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেননি, তাঁরাই অ-আনুষ্ঠানিক ব্রাহ্ম। তাঁরা সমাজের সদস্যও হতে পারেন। এ ছাড়া দীক্ষালাভের মাধ্যমেও ব্রাহ্ম সমাজের সদস্য হওয়া যায়। বর্তমানে সারা দেশে মোট ব্রাহ্মের সংখ্যা ৬২। তবে জন্মসূত্রে ব্রাহ্ম আছেন মাত্র ১৩ থেকে ১৫ জন। ব্রাহ্ম সমাজের কার্যনির্বাহী কমিটি সাত সদস্যের। এ ছাড়া সাত সদস্যের ট্রাস্টি বোর্ডও আছে। তাঁরা মন্দিরসহ সব সম্পদের দেখভালের দায়িত্বে আছেন।
বেদান্তের একেশ্বরবাদের ওপর ভিত্তি করে ১৮২৮ সালে রাজা রামমোহন রায় ‘ব্রাহ্মসভা’ গঠন করেন। পরে এটি ‘ব্রাহ্ম সমাজ’ নামে পরিচিত হয়। ব্রাহ্মরা নিরাকার ঈশ্বরের আরাধনা করেন। এই সমাজের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় হিন্দুদের মধ্যে ধর্মীয় ভেদাভেদ ও কুসংস্কার দূর করা
ব্রাহ্ম সমাজ জনহিতকর কাজের জন্য বিখ্যাত ছিল। রনবীর পাল বললেন, এখন খুবই স্বল্প পরিসরে এ ধরনের কাজ হচ্ছে। শীতকালে গরিব মানুষের মধ্যে কম্বল বিতরণ করে থাকেন তাঁরা। কখনো সহায়সম্বলহীন অসুস্থ ব্যক্তিদের ওষুধ কিনে দেয়া হয়।
ঢাকার প্রথম নারী বিদ্যালয়, জগন্নাথ স্কুল, যা এখন বিশ্ববিদ্যালয়, উপমহাদেশে উল্লেখ করার মতো লাইব্রেরি ‘রাজা রামমোহন লাইব্রেরী’ যেখানে পৃথিবীর তাবত্ বইয়ের সংগ্রহশালা ছিল একসময়। এখানে পড়াশোনা করেছেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কবি শামসুর রাহমান, মিজানুর রহমান, কাজী মোতাহার হোসেনসহ অনেকে। প্রায় ১০ হাজার বইয়ের এক বিশাল সংগ্রহ ছিল এ লাইব্রেরিতে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যা লুট হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বহু জ্ঞানী-গুণীর স্মৃতিবিজড়িত এ লাইব্রেরির পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে সামর্থ্য না থাকলেও ঐতিহাসিক এ লাইব্রেরি স্বনামে আবার চালু করার আশা প্রকাশ করলেন ব্রাহ্মসমাজ উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যান প্রসূন সমাদ্দার খোকন। সে সময় ব্রাহ্মসমাজের উদ্যোগে একটি পত্রিকা প্রকাশ হতো। একই বছর দীননাথ সেন ও বঙ্গচন্দ্র রায় ব্রাহ্ম মতবাদের প্রচার ও ব্রাহ্ম বিশ্বাস অনুযায়ী শিক্ষা দেয়ার জন্য গঠন করেন ‘সঙ্গত সভা’। সভায় ঢাকার বিশিষ্ট ব্রাহ্মদের মধ্যে নাম করার মতো ছিলেন দীননাথ সেন, নবকান্ত চট্টোপাধ্যায়, ব্রজসুন্দর মিত্র, রেবতী মোহন দাস, কালীপ্রসন্ন ঘোষ, কুঞ্জলাল নাগ, নলিনীকান্ত ভট্টশালী, কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার, বঙ্গচন্দ্র রায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ