ঢাকা, সোমবার 27 May 2019, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ২১ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ভারতে আবারও মোদি তুফান

আশিকুল হমিদ : প্রচলিত রীতি অনুযায়ী বিষয়টিকে আর ‘ঝড়’ বলা যাচ্ছে না, বলতে হচ্ছে ‘তুফান’। গত ২৩ মে ভারতের লোকসভা নির্বাচনের যে ফলাফল ঘোষিত হয়েছে এখানে তার কথাই বলা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি ও তার জোট এনডিএ ভারতের ক্ষমতার রাজনীতিকে নতুন পর্যায়ে উন্নীত করেছে। নতুন পরিচিতি দিয়েছে। বলা যায়, ১৯৪৭ সালের আগস্টে স্বাধীনতা পাওয়ার পর এবারই প্রথমবারের মতো ‘তুফান’ দেখেছে ভারতীয়রা।
২০১৪ সালের নির্বাচনেই নরেন্দ্র মোদী গান্ধী পরিবারকেন্দ্রিক ক্ষমতার মসনদকে ভেঙে খানখান করেছিলেন। এবারের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মিস্টার মোদী কংগ্রেসের নাড়ি ধরেও টান দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রচন্ড গতিশীল নেতৃত্বেই সোনিয়া ও রাহুল গান্ধীর ন্যাশনাল কংগ্রেস লোকসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় বরণ করেছে। সোনিয়া ও নিহত সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধীর মেয়ে এবং রাহুলের বোন প্রিয়াংকা গান্ধীকে নামিয়েও কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। ৫৪৩ আসনের লোকসভায় কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ৫২টি আসন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস জিতেছিল ৪৪টি আসনে। অন্যদিকে বিজেপি একাই জিতেছে তিনশ’র বেশি আসনে, ২০১৪ সালের নির্বাচনে যার সংখ্যা ছিল ২৮২টি। আর বিেেজপির জোট পেয়েছে ৩৫৩টি আসন। কোনো জোট বা দলের পক্ষে এভাবে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া ভারতের রাজনীতিতে অবশ্যই বিরাট ব্যাপার।
কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গান্ধীও শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি এমনকি নিজেদের ‘পারিবারিক’ আসন আমেথিকেও ধরে রাখতে পারেননি। সেখানে সুন্দরী অভিনেত্রী স্মৃতি ইরানীর কাছে হেরে গেছেন প্রায় ৫৬ হাজার ভোটের বিরাট ব্যবধানে (স্মৃতি ইরানী ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৮৬৩, রাহুল গান্ধী ৩ লাখ ৩১ হাজার ৩০৫ ভোট)। অথচ আমেথির এই আসনেই ২০১৪ সালের নির্বাচনে রাহুল গান্ধী এক লাখ সাত হাজার ভোটের ব্যবধানে স্মৃতি ইরানীকে হারিয়েছিলেন। লোকসভায় যাওয়ার জন্য রাহুল গান্ধীকে তাই কেরালা রাজ্যের ওয়ানাডায় যেতে হয়েছে। ওই আসনে কোনোভাবে জিততে পেরেছেন তিনি। ওদিকে রাহুল গান্ধীর মা এবং কংগ্রেসের মূল নেত্রী ও ইউপিএ জোটের চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধী অবশ্য আরেক ‘পারিবারিক’ আসন রায়বেরিলি থেকে জিতে এসেছেন। এটাই সম্ভবত ৮০ আসনের রাজ্য উত্তর প্রদেশে কংগ্রেসের একমাত্র সাফল্য।
এবারের নির্বাচনে কংগ্রেস লোকসভায় এমনকি প্রধান বিরোধী দলের অবস্থানও অর্জন করতে পারেনি। এই অবস্থানের জন্য ৫৪৩ আসনের লোকসভায় ১০ শতাংশ তথা ৫৫টি আসন থাকতে হয়। কংগ্রেস সেখানে জিতেছে মাত্র ৫২ আসনে। ২০১৪ সালের তুলনায় কংগ্রেস এবার অবশ্য কিছুটা এগিয়েছে। কারণ, সেবারের নির্বাচনে কংগ্রেস জিতেছিল ৪৪ আসনে। পদত্যাগের মাধ্যমে দলের প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরে যাবেন বলে নাটকীয়তা করতে চাইলেও রাহুল গান্ধীকে ৫২ জন এমপির নেতা হিসেবেই আগামী পাঁচ বছর কাটাতে হবে। কিন্তু তিনি বিরোধীদলীয় নেতার অবস্থান, মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা পাবেন না।
সবচেয়ে প্রাচীন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি সময় ভারতের ক্ষমতায় থাকার কারণে শুরুতে ন্যাশনাল কংগ্রেসের কথা বলা হলেও অন্য দলগুলোর পক্ষেও পরাজয় এড়ানো সম্ভব হয়নি। সব দলই মোদী তুফানে কুপোকাত হয়েছে। দলগুলোর মধ্যে বেশি আলোচিত হচ্ছে পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা নিজেও মিস্টার মোদীর মতো ‘তুফান’ তুলেই মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিএম-এর নেতৃত্বাধীন জোট বামফ্রন্টের ৩৪ বছরবাপী শাসনের অবসান ঘটিয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে কমিউনিস্টরা শুধু হেরে যায়নি, তাদের আসলে ঝেঁটিয়ে তাড়ানো হয়েছিল। তৃণমূল কংগ্রেসের জোট যেখানে ২২৫টি আসন পেয়েছিল সেখানে সিপিএম-এর আসন সংখ্যা ছিল মাত্র ৪১টি। সিপিএম-এর জোট বামফ্রন্টও ‘কানের গোড়া’ দিয়ে জিতেছিল ৬১টি আসনে। কেন বিরাট ব্যবধানে এই পরাজয়, তার কারণ নিয়ে ভারতে অনেক আলোচনা হয়েছে।
একটি কারণ হিসেবে প্রাধান্যে এসেছিলেন নির্যাতিত ও বঞ্চিত মুসলিমরা। শতকরা হিসাবে প্রায় ২৫ শতাংশ ভোট থাকলেও পশ্চিম বঙ্গে তারা ‘সংখ্যালঘু’। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, নির্বাচনে মুসলিমরাই নির্ধারকের ভূমিকা পালন করেন। সে কারণে মুসলিমদের ভোট পাওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সেবার অতি হাস্যকর প্রতিযোগিতা দেখা গিয়েছিল। দরদে উথলে উঠেছিলেন নেতা-নেত্রীরা। মুসলিমদের উন্নতি-সমৃদ্ধির নানা ধরনের অঙ্গীকারের ঘোষণা দিয়েছিলেন তারা। প্রতিটি দলই দু’চারজন করে মুসলিম প্রার্থী দাঁড় করিয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মাথায় ঘোমটা দিয়েছিলেন। পবিত্র কোরআন হাতে মুসলিমদের ‘দোয়া’ চেয়ে বেড়িয়েছিলেন। তৃণমূলের নারী কর্মিরা গায়ে বোরখা চাপিয়েছিলেন, পুরুষরা মাথায় টুপি পর্যন্ত পরেছিলেন। এতে কাজও হয়েছিল। সিপিএম এবং বামফ্রন্টকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছিলেন পশ্চিম বঙ্গের ভোটাররা।
বামফ্রন্টের পক্ষে আর ক্ষমতার ধারেকাছে আসা সম্ভব হয়নি। ২০১৬ সালের নির্বাচনেও তৃণমূল কংগ্রেসই ক্ষমতায় এসেছিল, দ্বিতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবারের লোকসভা নির্বাচনেও সিপিএম এবং বামফ্রন্ট শুধু হেরে যায়নি, দলগুলোর অস্তিত্বও প্রশ্নের মুখে এসে গেছে। কারণ, সিপিএমসহ বামফ্রন্টের প্রাপ্ত ভোট ২৪ শতাংশ থেকে মাত্র ছয় শতাংশে নেমে এসেছে। ভারতের অন্য কোনো রাজ্যেও কমিউনিস্টরা কোনো একটি আসনে জিততে পারেনি। এ বিষয়ে বিশেষ করে কেরালা রাজ্যের কথা বলা হচ্ছে। কারণ, কেরালায় কমিউনিস্টদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। কিন্তু সেখানেও তারা কোনো আসন পায়নি। নিবন্ধের এ পর্যন্ত এসে মনে হতে পারে যেন কমিউনিস্টরা ব্যর্থ হলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস তার সাফল্যের ধারা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু না, রাজ্যের জন্য নির্ধারিত ৪২ আসনের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস জিতেছে মাত্র ২২টি আসনে। অথচ ২০১৪ সালের নির্বাচনে তথা সদ্য বিদায়ী লোকসভায় দলটির আসন ছিল ৩৪টি। নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর দিনগুলোতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন, বিজেপিকে তিনি দুটি আসনেও জিততে দেবেন না। অন্যদিকে রীতিমতো চমক সৃষ্টি করে বিজেপি জিতেছে ১৮টি আসনে। অর্থাৎ তৃণমূল কংগ্রেসের চাইতে মাত্র চারটি আসন কম পেয়েছে বিজেপি। বিজেপির এই সাফল্যকে এখনো অনেকেই অবিশ্বাস্য বলে মনে করছেন। ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে এর কারণ নিয়ে জোর আলোচনা এবং নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে।
ওদিকে রাহুল গান্ধীর মতো মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু তাকেও তার দল অনুমতি দেয়নি। এখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সর্বশেষ একটি বক্তব্য উল্লেখ করা দরকার। তিনি অভিযোগ করেছেন, ভারতের নির্বাচন কমিশন নাকি ছয় মাস আগে থেকেই তার কাছ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল এবং তিনি নাকি স্বাধীনভাবে প্রচারণা ও কর্মকান্ড চালাতে পারেননি। এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরাসরি বিজেপির পক্ষে ভ’মিকা পালনের অভিযোগ এনেছেন বন্দ্যোপাধ্যায়।
মোদি তুফানে প্রবলভাবে আন্দোলিত হয়েছে ভারতের অন্য সব রাজ্যও। এসবের মধ্যে উত্তর প্রদেশকে নিয়ে আলোচনা চলছে বিশেষভাবে। দিল্লির সিংহাসনের প্রধান দরজা হিসেবে বর্ণিত এ রাজ্যটিকে তিন ভাগে বিভক্ত করা হলেও এখনো উত্তর প্রদেশের রয়েছে ৮০টি আসন। সেখানে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও দলিত জনগোষ্ঠীর নেত্রী মায়াবতীর বহুজন সমাজবাদী পার্টি (বিএসপি) এবং আরেক সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মোলায়েম সিং যাদবের ছেলে অখিলেশ যাদবের দল সমাজবাদী পার্টি ন্যাশনাল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধেছিল। কিন্তু ৮০টির মধ্যে এই জোট জিতেছে মাত্র ১৭টিতেÑ যার মধ্যে সোনিয়া গান্ধীর একটি আসনও রয়েছে। অর্থাৎ মোদির তুফানে উত্তর প্রদেশও তছনছ হয়ে গেছে। অথচ মাত্র বছর কয়েক আগেও মোলায়েম সিং যাদবকে ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ধরে নেয়া হতো। এবারের নির্বাচনের প্রাক্কালে মায়াবতীর নামও শোনা গিয়েছিল। কিন্তু সবাই বিতাড়িত হয়েছেন মোদির তুফানে।
বিজেপির জোট এনডিএ’র এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের কারণ নিয়ে স্বাভাবিক নিয়মেই পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। একটি প্রধান কারণ হিসেবে এসেছে বিরোধী দলগুলোর দৈন্য। কারণ, একমাত্র ‘মোদিকে হটাও’ ছাড়া আর কোনো বিষয়েই দলগুলোকে সোচ্চার হতে দেখা যায়নি। বিকল্প কোনো কর্মসূচি দূরে থাকুক, দলগুলো এমনকি সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও কারো নামকে সামনে আনতে পারেনি। বলা হচ্ছে, উত্তর প্রদেশের দুই সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মোলায়েম সিং যাদব এবং মায়াবতী ছাড়াও পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও মিস্টার মোদির বিকল্প হিসেবে সামনে আনা যেতো এবং এতে কাজও  হতে পারতো।
কিন্তু সর্বদলীয় জোট গঠন থেকে বিকল্প প্রধানমন্ত্রীর নাম জানানো পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে গোপনে ও প্রকাশ্যে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন রাহুল গান্ধী। জনসমর্থন না থাকলেও সবচেয়ে প্রাচীন দলের নেতা হিসেবে অহংকারের শেষ ছিল না তার। আসলে রাহুল নিজেই নাকি প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে রাহুলকে শুধু ‘নিকম্মা’ হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়নি, জনগণের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও সংশয় ছিল। এজন্যই মোদি এবং তার দল, জোট ও সরকারের বিরুদ্ধে জনমত থাকলেও মূলত বিরোধী দলগুলোর অনৈক্যের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ‘তুফান’ তুলতে পেরেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। লোকসভা নির্বাচনের বিভিন্ন দিক নিয়ে ভারতে যেমন বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেও তেমনি এখনো আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আলোচনা চলবে আরো বহুদিন পর্যন্ত। আমরাও পরবর্তী সময়ে আলোচনা করার ইচ্ছা রাখি।
শেষ করার আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র নাথ মোদী সম্পর্কে বলা দরকার। তাকে আসলে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার দরকার পড়ে না। ২০১৪ সালের আগে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে গুজরাট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি ভারতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছেন। সাম্প্রদায়িক ও উসকানিমূলক বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকান্ডের জন্য বিতর্কিতও তিনি যথেষ্টই হয়েছেন। কিন্তু ভারতের জনগণ তাকেই তাদের নেতা হিসেবে বেছে নিয়েছে। ইভিএম মেশিনের প্রশ্নসাপেক্ষ ব্যবহার এবং নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্বসহ আরো কিছু অভিযোগ থাকলেও মিস্টার মোদিকে তাই ভারতের ১৬তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেয়া হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি ভারতকে কিভাবে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ উপমহাদেশের দেশগুলো তো বটেই, সমগ্র বিশ্বও তার নীতি ও কার্যক্রমের ব্যাপারে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ