ঢাকা, সোমবার 27 May 2019, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ২১ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ভারতে কংগ্রেস যে কারণে হারল

এইচ এম আব্দুর রহিম : সম্প্রতি ভারতে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। উত্তর প্রদেশের আমেথি আসনটি কংগ্রেসের দুর্গ হিসেবেই পরিচিত। অথচ লোক লোকসভা নির্বাচনে সেই আসনে কিনা হেরেছেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। আমেথির পাশাপাশি এবার কেরালার ওয়েনাড থেকে ও দাঁড়িয়ে ছিলেন রাহুল। বিজেপি বলে আসছিল, আমেথি নিয়ে রাহুল ভয়ে আছেন। তাই ওয়েনাড ধরেছেন। শেষমেষ বিজেপির কথা সত্যি হলো। আমেথিতে হেরে মান গেলেও ওয়েনাড থেকে জিতে রাহুলের কিছুটা হলেও ইজ্জত ‘রক্ষা’ পেয়েছে।
লোকসভার এই নির্বাচনেও ‘মোদি-ঝড়’ বয়ে গেল। এবার ঝড়ের গতি আরও বেশী। আগের বারের চেয়ে আসন সংখ্যা বিজেপির আরো বেড়েছে ও তার জোট এনডিএর। ফলে বলা যায়, কংগ্রেসসহ বিরোধীদের আশা ভরসা আপাতত একেবারে শেষ। কদিন আগেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলে ছিলেন, কংগ্রেসের অবস্থা একবারে টাইটানিকের মতো। দলটি প্রতিদিন একটু একটু করে ডুবে যাচ্ছে। মোদি ভুল কিছু বলেননি। লোকসভা এই নির্বাচনের পর কংগ্রেসের ছন্নছাড়া অবস্থা আরও স্পষ্ট হলো। বিশেষ করে রাহুলের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অবশ্য রাহুলের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। তাঁকে দিয়ে যে কাজ হবে না, সে কথা তাঁর দলের সভাপতির পদ পাওয়ার বহু আগে থেকেই প্রচলিত রয়েছে। রাহুলের বাবা ৪২ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী হয়ে ছিলেন। আর রাহুল ৪৯ বছর বয়সে দলের নেতৃত্ব পেয়েছেন। তিনি তিন বারের এমপি। প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় নিজের দল কে টানা ১০ বছর ক্ষমতায় থাকতে দেখেছেন। এত কিছুর পর রাহুল সর্ম্পকে বলা হচ্ছে, তাঁর বয়সতো পড়েই আছে। তিনি পরিপক্ব হচ্ছেন। বড় দায়িত্ব নিচ্ছেন। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে তিনি আর কত বড় হবেন। আর কত সময় তাঁর সামনে পড়ে আছে ? যে মুলোটা বাড়ে, তা পত্তনেই বোঝা যায়।
 রাহুলের বয়স কম-এই যুক্তি প্রায় অচল হতে বসেছে। তিনি জন্মগতভাবে নেতৃত্বের গুণ পেলে আজ হয়ত কংগ্রেসের অবস্থা ভিন্ন হতো।
ভারতের সব চেয়ে পুরানো ও ঐতিহ্যবাহী দলের সভাপতি রাহুল। কিন্তু তাকে এই পদ পেতেই মোটেই কাঠ খড় পোহাতে হয়নি। কংগ্রেসের একটি পারিবারিক সম্পত্তি, উত্তারিধিকারসূত্রে তিনি তার মালিক হয়েছেন মাত্র-এটাই বাস্তবতা। দক্ষতা বা গুণে পদ অর্জনের মতো কিছুই তিনি  করেননি বা করতে হয়নি। আবার পদের অধিকারী হয়েও সেই পদে নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তোলার কাজে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।
 নির্বাচনের ফল আসার পর ভারতের অনলাইন ভিত্তিক নিউজ পোর্টাল দ্য ওয়্যারে নিরাজ মিশ্রের এক নিবন্ধে কংগ্রেস সভাপতির ব্যর্থতার কারণ উঠে এসেছে। নিবন্ধে রাহুলের বড় ব্যর্থতার কারণ হিসেবে কংগ্রেসের নতুন মুখ তুলে না আনার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। দলের কেন্দ্র কিংবা তৃণমূল-সর্বস্তরের নেতৃত্বেই ঘুরে ফিরে সেই পুরানো মুখ। যাঁরা ক্লান্ত, ব্যর্থ। পুরানো চিন্তা ভাবনা নিয়ে তাঁরা পড়ে আছেন। কংগ্রেসের এই নেতৃত্বে অনগ্রসর, সময় থেকে বহু দূরে। তাঁরা ভোটারদের পালস অনুভব করতে অক্ষম। তাঁরা নিজেরাও স্বপ্ন দেখেন না, অন্যদের স্বপ্ন দেখাতে পারেন না।
 কথা দিয়ে চিড়ে ভিজে না। রাজনীতি অনেক বদলে গেছে। কংগ্রেস নেতাদের দেখলে মনে হয় তারা ১৯৪৭ সালে পড়ে আছে। সভাপতি হওয়ার পর তরুণ রাহুলের অনেক সুযোগ ছিল নিজেকে উদ্ভাসিত করার। কিন্তু তিনি ‘চির- নবীশ’ হয়ে রইলেন। বিশ্বজুড়ে রাজনীতিশাস্ত্রকে মানববিদ্যার অংশ হিসাবে পড়া শুনার রেওয়াজ। কিন্তু ক্রমেই এই শাস্ত্র যেন বিজ্ঞানে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। ভারতের এবারের নির্বাচন তার সাক্ষী। ভারতের নির্বাচনী ফলাফল বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ । দ্বিতীয় দফায় মোদির ক্ষমতা লাভ তিস্তা চুক্তি ত্বরান্বিত করার পক্ষে সহায়ক হয়ে উঠতে পারে। মমতার বিরোধিতার কারণেই মোদি তিস্তা চুক্তি সই করতে পারেনি। মমতার দুর্বল হওয়া এবং রাজ্যে বিজেপির উত্থান সেই প্রতিবন্ধকতা দূর করে চুক্তি বাস্তবায়িত হওয়ার পথ মসৃণ করে তুলতে পারে। বাংলাদেশের পক্ষে সেটা হবে শস্তিদায়ক। বাংলাদেশের সাথে ভারতের সর্ম্পক কেমন যাবে আগামী দিন বলে দিবে। এদিকে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে মুসলমান আইন প্রণেতাদের সংখ্যা কিছুটা হলে ও বেড়েছে। এবারের নির্বাচনে ২৬ জন মুসলমান প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাদের মধ্যে কাশ্মীরের ফারুক আব্দুল্লাহ ও হায়দরাবাদের আলাদউদ্দীন ওয়াইসি উল্লেখযোগ্য। 
গত লোক সভায় ২৩ জন মুসলমান সদস্য ছিলেন। তাদের অধিকাংশই কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস থেকে নির্বাচিত হয়ে ছিলেন। ১৯৮০ সালে সব চেয়ে বেশী মুসলমান প্রার্থী লোকসভায় নির্বাচিত হয়ে ছিলেন। ভারতের জন সংখ্যার এক পঞ্চমাংশ মুসলমানরা এসব প্রার্থীরা তাদের হয়ে লোক সভায় প্রতিনিধিত্ব করেন। হায়দরাবাদ থেকে দুই লাখ ৮২ হাজার বেশী ভোট জয়ী হয়েছেন ওয়াইসি। এটা তার চতুর্থ বিজয়। ভারতের সবচেয়ে বেশী মেয়াদে নির্বাচিত মুসলমান প্রার্থী হচ্ছেন তিনি। তার দলের প্রার্থী সাবেক সাংবাদিক ইমতিয়াজ জলিল সাঈদ মহারাষ্ট্র থেকে ৪৫ হাজার বেশী ভোটে জয়ী হয়েছেন।
উত্তর প্রদেশ থেকে চারজন মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। আর দুই জন প্রার্থী এগিয়ে রয়েছেন। ১৪ ও ১৫তম লোকসভা নির্বাচনে ৩০ ও ৩৪ জন মুসলমান প্রার্থী জয়ী হয়েছিলেন। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার ক্ষমতায় ছিল। ১৯৮৪ সালে ক্ষমতায় আসে রাজিব গান্ধী। তখন দেশটির লোকসভার ৪২ জন মুসলমান সদস্য ছিলেন। আর লোকসভায় কম মুসলমান প্রার্থী নির্বাচিত হয়ে ছিল ১৯৫১ সালে। এর সংখ্যা ছিল মাত্র ১১ জন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ