ঢাকা, মঙ্গলবার 28 May 2019, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ২২ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ভারতীয় নির্বাচনে বিজেপির বিজয় ইমেজ উদ্ধার ও সুশাসনই কাম্য

ড. মো. নূরুল আমিন : ভারতীয় নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হয়েছে। দেশটির নির্বাচন কমিশন ৫৪২টি আসনের মধ্যে ৫২৮টি আসনের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করেছে। অবশিষ্ট ১৪টি আসনের ফল বাকি আছে। তবে এই আসনগুলোতে এগিয়ে থাকা দল ও প্রার্থীদের নাম তারা ঘোষণা করেছেন। গত শুক্রবার পর্যন্ত দেশটির নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিজেপি দল এককভাবে পেয়েছে ৩০৩টি আসন যা গত নির্বাচনের তুলনায় ২১টি আসন বেশি। একইভাবে বিজেপি জোট পেয়েছে ৩৫৪টি যা গত নির্বাচনের তুলনায় ১৯টি আসন বেশী, অর্থাৎ ভারতীয় জনতা পার্টির অবস্থা আগের তুলনায় অনেক ভাল হয়েছে। ক্ষমতায় যাবার জন্য ২৭২টি আসনের প্রয়োজন হয়। বিজেপি এককভাবে তার তুলনায় ৩১ আসন এবং জোটগতভাবে ৮২ আসন বেশি পেয়েছে। ফলাফল অনুযায়ী বিজেপি এককভাবে অথবা জোটগতভাবে সরকার গঠনের নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট পেয়েছে। নির্বাচনে দল ও জোটওয়ারী অবস্থা হচ্ছে: বিজেপি এককভাবে ৩০৩ আসন, জোটগতভাবে ৩৫৪ আসন। জাতীয় কংগ্রেস এককভাবে ৫২ আসন, জোটগতভাবে ৯০ আসন। অন্যান্য দলের অবস্থা নি¤œরূপ: জনতা দল ১৬, শিবসেনা ১৮, শিরোমণি আকালি ২, লোক জনশক্তি ৬, মিজোন্যাশনাল ফ্রন্ট ১, ডিএমকে ২৩, ন্যাশনাল কংগ্রেস ৫, মুসলিম লীগ ৩, জনতা দল  (সেক্যুলার) ১, ঝাড়খ- মুক্তি মোর্চা ১, কেরালা কংগ্রেস (মনি) ১, বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক পার্টি ১, তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি ৯, ওয়াই এস আর কংগ্রেস ২২, জনতা দল ১২, তৃণমূল কংগ্রেস ২২, সমাজবাদি দল ৫, বহুজন সমাজ ১০ এবং তেলেগু দেশম পার্টি ৩ আসন।
এবারের নির্বাচনে ভারতের রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদির জনতা পার্টির অবস্থা আরো মজবুত হয়েছে। দিল্লিতে চমক দেখানো অরবিন্দ কেজরীওয়ালের আম আদমী পার্টি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তারা একটি আসনও পায়নি। পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপির শক্তিশালী উত্থান ঘটেছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে এই রাজ্যে বিজেপির আসন সংখ্যা ছিল ২টি, এবার হয়েছে ১৮টি এবং তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি ২২টি আসন নিয়ে কোনমতে, তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা টিকিয়ে রেখেছেন। তবে তার দলের কেউ যদি বিক্রি হয়ে না যান তাহলে এবারের মত অন্তত তিনি মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসতে পারবেন বলে মনে হয়।
ভারতের লোকসভা নির্বাচনে এবার দ্বিতীয়বারের মত কট্টর হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক দল বিজেপির ভূমি ধস বিজয় হয়েছে। মুসলিম বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক বিষবাস্প ছড়ানোর পথিকৃত বলে পরিচিত নরেন্দ্র মোদির হাতকে যেমন সাম্প্রদায়িক হিন্দুরা শক্ত করেছে তেমনি যারাই নিজেদের মুসলিম বিদ্বেষী বলে প্রমাণ করতে পেরেছেন তারাই বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসিকে হাতিয়ার বানিয়ে বিজেপি উত্তর পূর্বাঞ্চল এমনকি পশ্চিমবঙ্গেও ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছে।
২০০৮ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর মালিগাঁওয়ে মুসলমানদের ইফতার মাহফিলে বোমা হামলার জন্য দায়ী প্রধান আসামী প্রজ্ঞা ঠাকুরও এই নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। ঐ বোমা হামলায় কমপক্ষে ১০ জন রোজাদার মুসলমান নিহত হয়েছিলেন। তাছাড়াও ১৯৯২ সালে অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ধ্বংসেও নরেন্দ্র মোদির সাথে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। প্রজ্ঞা তার প্রতিদ্বন্দ্বি কংগ্রেস প্রার্থী ও মধ্য প্রদেশের দু’দুবারের মুখ্যমন্ত্রী দিগ্বিজয়ের চেয়ে ৩ লাখ ৬০ হাজার বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। এদিকে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদি এবং রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্য নাথ আবারো ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা দেখা দেয়ায় উত্তর প্রদেশের মুসলমানরা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন পত্র পত্রিকায় রিপোর্ট বেরিয়েছে। জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকে কেন্দ্র করে আসামেও মুসলমানদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
উত্তেজনা শুধু মুসলমানদের মধ্যে দেখা দেয়নি, দেখা দিয়েছে খৃস্টান, শিখ ও দলিতদের মধ্যেও। চরম সাম্প্রদায়িক দল বিজেপি দ্বিতীয়বারের মত ক্ষমতায় আসায় এই উত্তেজনা। তাদের ভয় ২০১৪ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় এসে এই দলটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর যে অত্যাচার করেছে এবং উগ্র হিন্দুদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়ে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে সে অত্যাচার নির্যাতনকে আরো শাণিত করবে। এর ফলে মুসলমান, খৃস্টান, শিখ, দলিত মিলিয়ে প্রায় ৪০ কোটি মানুষের জীবনে বিভীষিকা নেমে আসবে।
এই বিভীষিকা কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে কালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক জরিপে কিছু তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে। এতে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসার পর থেকে মুসলিম বিরোধী যে সমস্ত অমানবিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনকে সামনে রেখে যেগুলোকে উস্কানি হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছিল সে সম্পর্কে কিছু প্রামাণ্য তথ্য দেয়া হয়েছে। বলা বাহুল্য এর ফলে হিন্দুদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক চেতনা বৃদ্ধি পায় এবং তারা নরেন্দ্র মোদি ও তার দল বিজেপিকে ব্যাপকহারে ভোট দিয়ে ধর্ম নিরপেক্ষ ভারতকে কট্টর হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করতে সাহায্য করে। এই পদক্ষেপগুলো হচ্ছে নি¤œরূপ:
১) ঘর ওয়াপেজি বা ঘরে প্রত্যাবর্তন কর্মসূচি: আরএসএসসহ চরমপন্থী হিন্দু সাম্প্রদায়িক দলসমূহের এটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় কর্মসূচি। এই কর্মসূচির মূল কথা হচ্ছে, ২০২১ সালের মধ্যে ভারতবর্ষকে একটি হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করা। মুসলমান ও খৃষ্টানদের এই রাষ্ট্রে বসবাস করার কোনও অধিকার নেই। যদি তারা ভারতে বসবাস করতে চায় তাহলে তাদেরকে হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেই তা করতে হবে। এখানে তাদের যুক্তি হচ্ছে এই যে, ভারতবর্ষে মুসলমানসহ যত অহিন্দু আছে তাদের পূর্ব পুরুষরা সবাই হিন্দু ছিল। ঘর ওয়াপেজি প্রোগ্রামের মাধ্যমে তাদের পুনরায় হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনা হবে। এই উদ্দেশ্যে আরএসএস এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ যৌথ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এ প্রেক্ষিতে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নেতা প্রবীণ তোগাদিয়া ঘোষণা করেছন, সারা বিশ্ব হিন্দু হবে। সাত শ’ কোটি বিশ্ববাসীই এক সময়ে হিন্দু ছিল। এখন আছে মাত্র ১০০ কোটি। ঘরে প্রত্যাবর্তন কর্মসূচি ইসলাম ও খৃস্ট ধর্মকে উৎখাত করে তাদের অনুসারীদের পুনরায় হিন্দু ধর্মে প্রত্যাবর্তন করাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ২০১৫ সালে তাদের বার্ষিক রিপোর্টে উল্লেখ করেছে যে তারা ঐ বছর ৩৪০০০ লোককে হিন্দু ধর্মে দীক্ষা দিয়েছে এবং ৪,৯০০০ হিন্দুকে অন্যধর্ম গ্রহণে বাধা দিয়েছে।
ধরম জাগরণ সমিতির উদ্যোগে উড়িষ্যা, গুজরাট, ছত্রিশ গড়, ঝাড়খ- এবং আসামে এসব ধর্মান্তকরণের কাজ সম্পন্ন করা হয়। এই উদ্দেশ্যে ধরম জাগরণ সমিতি প্রতিটি মুসলিম পরিবারকে হিন্দু বানানোর জন্য পাঁচ লাখ টাকা (৭৫০০-ডলার) এবং খৃস্টান পরিবারকে হিন্দু বানানোর জন্য দুই লক্ষ টাকা (৩০০০ ডলার) করে তহবিল সংগ্রহ করছে। টাকা ছাড়াও জবরদস্তি বহু মুসলিম ও খৃস্টান পরিবারকে আরএসএস-বিজেপি সদস্যরা হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করছে। যারা অস্বীকার করছে তাদের হত্যা করা হচ্ছে। উত্তর প্রদেশে ৫৭টি মুসলিম পরিবারকে এভাবে জবরদস্তি হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়েছে। যারা হিন্দু হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে তাদের মেরে বাড়ি ঘর থেকে বের করে দেয়া হয়েছে অথবা তাদের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে পুরা রাজ্যটিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
গো রক্ষার নামে ভারতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে নির্মম হত্যাযজ্ঞ মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। নির্যাতিতরা আইনের কোনও আশ্রয় পাচ্ছে না। ঘরে গরুর গোশত থাকার অভিযোগে উগ্র হিন্দুরা মুসলমানদের হত্যা করছে। গরু পালন, ট্রাকে গরু পরিবহন, গরু জবাই এমন কি গরু কুরবানীও কোন কোন রাজ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।উগ্রবাদীরা মুসলমানদের গরু খোয়াড়ে নিয়ে যাচ্ছে, হিন্দুদের মালিকানায় দিয়ে দিচ্ছে। আবার এই গরুকে কেন্দ্র করেই প্রায় সব রাজ্যেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হচ্ছে এবং নিরপরাধ মুসলমানরা হিন্দুদের হাতে মারা যাচ্ছে। ২০১৭ সালে উত্তর প্রদেশ কর্নাটক, মহারাষ্ট্র, মধ্য প্রদেশ বিহার, রাজস্থান পশ্চিম বঙ্গ, ঝাড়খন্ড, তেলেঙ্গানা ও আসাম রাজ্যে রাজনৈতিক উস্কানীতে ১৯৭২টি সাম্প্রদায়িক রায়টের ঘটনা ঘটেছে। এগুলো হচ্ছে ভারতে বিজেপি শাসিত সরকারের অধীনে সংখ্যালঘু মুসলমানদের অবস্থার সামান্য কিছু বর্ণনা। খৃষ্টান, শিখ, দলিতদের অবস্থাও শোচনীয়। এদের সকলেই সেদেশের অচ্যুত শ্রেণি; নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। মুসলমান হবার কারণে তারা রাষ্ট্রীয় সুুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
নির্বাচনে বিজেপি জয়ী হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নরেন্দ্র মোদি দলটির নেতা হিসাবে সরকার গঠন করবেন। আমরা তাদের অভিনন্দন জানাই।
ভারত একটি বিশাল বহুজাতিক দেশ। দেশটির গঠন, পুনর্গঠন ও উন্নয়নে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে দেশটির সকল নাগরিকের অবদান রয়েছে। এই নাগরিকদের মৌলিক মানবাধিকার সংরক্ষণ, মান সম্মান, জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। বিজেপি সরকার গত মেয়াদে তাদের শাসনামলে নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় যে ইমেজ সংকটে পড়েছিল আমরা আশা করি এবার তার উত্তরণ ঘটবে, তারা আইনের শাসন ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় ব্রতি হবেন। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকলের জন্য কাজ করে সকলের আস্থা তারা অর্জন করুক এটাই আমাদের কামনা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ