ঢাকা,বৃহস্পতিবার 30 May 2019, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ২৪ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ঝুঁকিতে বায়তুল মোকাররম

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম ভবনের ভার বহনকারী একটি প্রধান পিলার বা কলাম ভেঙে ফেলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, যে দুটি মূল পিলারের ওপর জাতীয় মসজিদ ভবন দাঁড়িয়ে আছে তার দক্ষিণ দিকের পিলারটি রাতের অন্ধকারে ভেঙে ফেলা হয়েছে। ২৪ দশমিক ৭৭ বর্গফুট ব্যাসের এই পিলার শুধু নয়, ইতিমধ্যে চিহ্নিত দুর্বৃত্তরা পিলারটির সঙ্গে যুক্ত ১৫ ফুটের দেয়ালও ভেঙে ফেলেছে। জানা গেছে, সবকিছুর পেছনে রয়েছেন একটি রাজনৈতিক দলের বায়তুল মোকাররম শাখার সভাপতি। নিজের স্ত্রীর মালিকানাধীন দোকানের পরিসর বা আয়তন বাড়ানোই তার উদ্দেশ্য। এজন্য তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বা মসজিদ কমিটিসহ কোনো পর্যায়ের কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেয়া দূরে থাকুক, সংশ্লিষ্ট কাউকে অবহিত করারও প্রয়োজন বোধ করেননি। সোজা রাতের অন্ধকারে চোর-ডাকাতের মতো পিলার এবং দেয়াল ভেঙে ফেলেছেন।
উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বায়তুল মোকাররমের মতো সব ভবনই কতগুলো পিলার বা কলামের ওপর ভর করে টিকে থাকে। এসব পিলারও মাটির বহু গভীর থেকে পর্যায়ক্রমে উঠিয়ে আনতে হয়। তারও আগে নিচের মাটি পরীক্ষা করে প্রয়োজনে পাইলিং করাসহ এমন ব্যবস্থা নিতে হয় যাতে সেখানে নির্মীয়মান ভবনের ভার চাপিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা না হতে পারে। তারপর ফাউন্ডেশন বা ভিত্তির স্তর থেকে পিলারগুলোর ব্যাস ক্রমাগত এমন অনুপাতে কমিয়ে আনতে হয়, যাতে প্রতিটি পিলার ওপরে নির্মিত সম্পূর্ণ ভবনের ভার আনুপাতিক হারে বহন করতে পারে এবং সব পিলারের ওপর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে ভার গিয়ে পড়ে। ভবন বা স্থাপত্য নির্মাণের স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত নিয়ম হলো, কোনো একটি পিলারও যদি কখনো কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে ওই পিলারটি যেমন এর জন্য নির্ধারিত ভার বা ওজন বহন করার সক্ষমতা হারাবে তেমনি ভবনটিও প্রচন্ড ঝুঁকির মুখে এসে যাবে। ফলে যে কোনো সময় দুর্ঘটনায় পুরো ভবনটিই ভেঙে পড়তে পারে।
বায়তুল মোকাররমের পিলার ও ১৫ ফুট দেয়াল যারা ভেঙেছেন তাদের সবারই ভবন নির্মাণের এসব নিয়ম সম্পর্কে জ্ঞান ও ধারণা থাকার কথা। নিশ্চিত ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য দুর্ঘটনায় প্রণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিসহ ভয়ংকর পরিণতি সম্পর্কেও নিশ্চয়ই তাদের ধারণা রয়েছে। কিন্তু সব জেনেবুঝেও মূল দুটি পিলারের একটিকে এবং সেই সাথে যুক্ত ১৫ ফুট দেয়ালও তারা ভেঙে ফেলেছেন। অন্তরালের উদ্দেশ্যও আবার ক্ষমতাসীন দলের একজন নেতার স্ত্রীর মালিকানাধীন দোকানের আয়তন বা পরিসর বাড়ানো। অর্থাৎ একটি দোকানকে কিছুটা বড় করা!
আমাদের অপত্তি ও প্রতিবাদের কারণ হলো, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে যে কোনো দুর্বৃত্ত গোষ্ঠী এ ধরনের অপকর্ম করতে বা করার উদ্যোগ নিতেই পারে। কিন্তু সেখানে তো কর্তৃপক্ষ হিসেবে মসজিদ কমিটি ছাড়াও ইসলামিক ফাউন্ডেশন রয়েছে। তাদের তো এত বড় একটি বিষয় তথা কর্মকান্ড সম্পর্কে না জানার কোনো কারণ থাকতে পারে না। কেননা, যতো রাতের অন্ধকারেই অপকর্ম করা হয়ে থাকুক না কেন, একটি পিলার এবং দেয়াল ভেঙে ফেলার কাজ নিশ্চয়ই এক রাতে বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন হয়নি। এজন্য কয়েকদিন পর্যন্ত সময় লাগার কথা। অন্যদিকে মসজিদ কমিটি এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্তাব্যক্তিরা বোঝাতে চাচ্ছেন যেন তারা কিছুই জানতেন না!
যুক্তিটি যে কত ভঙ্গুর এবং অগ্রহণযোগ্য সে সম্পর্কে নিশ্চয়ই কথা বাড়ানোর দরকার পড়ে না।  গত বছরের অক্টোবরে ভেঙে ফেলা হলেও কর্তাব্যক্তিরা প্রায় আট মাস পর অতি সম্প্রতি তৎপর হয়েছেন এবং দোষী ব্যক্তি ও দুর্বৃত্ত চক্রের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে তারা থানায় জিডি বা সাধারণ ডায়েরি করেছেন। এটুকুও করেছেন তারা প্রকাশ্যে অভিযোগ জানানোর পর। অথচ জাতীয় মসজিদের ভয়ংকর ক্ষতি করার অভিযোগে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা দায়ের করা এবং তাদের দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে পিলার এবং দেয়াল নির্মাণ করিয়ে নেয়া কর্তাব্যক্তিদের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য ছিল।
আমরা মনে করি, সামগ্রিক নির্মাণ শৈলী ও সৌন্দর্যের কারণে তো বটেই, বিশেষ করে বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ বলেই বায়তুল মোকাররমের ব্যাপারে কাল বিলম্ব না করে সরকারের উচিত তৎপর হয়ে ওঠা। ক্ষমতাসীন দলের নেতার পরিচিতি ব্যবহার করে কেউ যাতে ছাড় না পেতে পারে তা যেমন নিশ্চিত করতে হবে তেমনি ব্যবস্থা নিতে হবে ওই কথিত নেতার স্ত্রীর বিরুদ্ধেও। শুধু ক্ষতিপূরণ আদায় করলে চলবে না, তার কাছ থেকে সংস্কার ও নির্মাণ কাজের অর্থও আদায় করতে হবে। তাছাড়া এত অল্প আয়তনের দোকানে তার ব্যবসা যেহেতু চলছে না সে কারণে তাকে বায়তুল মোকাররম মার্কেট থেকেও বের করে দিতে হবে।
আমরা আশা করতে চাই, আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগেই প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা নেয়া হবে যাতে সম্ভাব্য দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ধর্মপ্রাণ মুসল্লীদের জীবন বিপন্ন না হয়। আমরা একই সাথে মসজিদ কমিটি এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্তাব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ