ঢাকা,বৃহস্পতিবার 30 May 2019, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ২৪ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মাদরাসা শিক্ষার কিছু সংস্কার প্রয়োজন

শাহ আবদুল হান্নান : মাদরাসার দাখিল ও আলিম শ্রেণিতে বিজ্ঞান ও মানবিক শাখা চালু থাকা সত্ত্বেও সেখানে ব্যবসায় শিক্ষা শাখা নেই। বিষয়টি আমার জানা ছিল না। এমনকি বিষয়টি আমার নজরেও আসেনি। কিন্তু যখন বিষয়টি জানতে পারলাম তখন আমি এটা না থাকার কোনো যুক্তি পাচ্ছি না। যখন বিজ্ঞান ও মানবিক শাখা করা হলো তখনই ব্যবসায় শিক্ষা শাখা চালু করতে পারলে ভালো হতো। কেন তারা করেনি বা কেন তারা বিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করবে, ব্যবসায় শিক্ষা করবে না তার কোনো কারণ আমার মাথায় আসছে না। হয়তো কোনো কারণ ছিল, যে জন্য তারা এটা করতে চায়নি। কিংবা তারা ভেবেছে মাদরাসা শিক্ষায় এত ভাগ ইসলামের অংশ থাকতে হবে। বাকিটা আমরা আস্তে আস্তে চেষ্টা করবো। হয়তো ভেবেছে বিজ্ঞান নিলে এর বিরাট ক্ষেত্র, তাই টেকনিক্যাল সাইডে তারা অনেক দূর যেতে পারবে। তখনো হয়তো ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স এতটা প্রসার লাভ করেনি, যেটা গত বিশ বছরে করেছে। বর্তমান সময়ের আলোকে হয়তো তাদের সে রকম খেয়াল হয়নি।
এদের দায়দায়িত্ব কাদের? দায় দুই রকমের হয়। একটা হচ্ছে নির্দিষ্ট করে দায়ী করা, আরেকটা হচ্ছে সাধারণভাবে দায়ী করা। সাধারণভাবে বললে বলবো, জাতির ব্যর্থতা। গোটা জাতিরই ব্যর্থতা এজন্য যে, জাতির পক্ষ থেকে কোনো অংশই এ ব্যাপারে সঠিকভাবে পদক্ষেপ নেয়নি। আবার এখন সঠিক মনে হচ্ছে তখন হয়তো তাদের মাথায়ই আসেনি। যেমন আমিও তো এ বিষয়ে লিখিনি-তাহলে আমিও দায়ী। আমাকে যিনি এ বিষয়ে প্রশ্ন করেছেন তিনিও তো এটা লেখেননি, তাহলে তিনিও দায়ী। আমাকে যিনি এ বিষয়ে প্রশ্ন করেছেন তিনিও তো এটা লেখেননি, তাহলে তিনিও দায়ী। গোটা জাতিই একত্রে দায়ী। তবে বেশি দায়ী হচ্ছেন মাদরাসার শিক্ষকবৃন্দ। তাদেরই তো ছাত্রদের সমস্যাগুলো সবচেয়ে বেশি বোঝার কথা। তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা বোঝা উচিত ছিল। তাদের এ ব্যাপারে বক্তব্য রাখা উচিত। তবে সর্বোপরি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে গত ৩০ বছরে যারা দায়িত্বে ছিলেন তাদের সবারই কম-বেশি ভুল হয়েছে বলে আমি মনে করি। নির্দিষ্ট করে এক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশি আর বলতে চাচ্ছি না।
ব্যবসায় শিক্ষা শাখা দ্রুত চালু করা দরকার এ সম্পর্কে আমি একমত। যেহেতু অনেক দিন এটা হয়নি, প্রকৃতপক্ষে তারা যদি এটা করতে চান তাহলে দাখিল লেভেলেই কমার্স রাখা দরকার। তা না হলে উপরের ক্লাসে পড়তে পারবে না। শুধু তাই নয়, যদি ব্যবসায় শিক্ষা শাখা পূর্ণাঙ্গ রূপ চাই তাহলে কামিল লেভেলেও এটা খুলতে হবে। কামিল লেভেলে কামিল হাদিস, কামিল ফিকাহ, কামিল তাফসির এগুলোর সঙ্গে কামিল অর্থনীতি, কামিল বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, সেই সঙ্গে কামিল পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন মোট তিনটি বিভাগ অন্তত খুলতে বলবো। আর তা যদি করতে হয় তাহলে ফাজিলেও সেভাবে শিক্ষাক্রম সাজাতে হবে। আলিম ও দাখিলে তো অবশ্যই করতে হবে। ভবিষ্যতে মাদরাসার সামগ্রিক সংস্কারের অংশ হিসেবে এটা করতে হবে।
মাদরাসা শিক্ষা সংস্কারের ব্যাপারে আমি আলাদা করে লিখেছি। আমি কওমি মাদরাসাকে তাদের একটি দাওরা হাদিসের পাশাপাশি আরো কয়েকটি খুলতে বলেছি। নিচের দিকে ঠিক রেখে উপর দিকে দাওরায়ে পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, দাওরায়ে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন খোলা যেতে পারে। তা হলে মাদরাসার ছেলেরা প্রায়ই সমপর্যায়ের হয়ে যাবে। তা ইসলামের জন্য কল্যাণকর হবে। দেশের জন্য কল্যাণকর হবে। নৈতিকতার জন্য ভালো হবে। কিন্তু এই মুহূর্তে আমরা বলছি, আলিম ও দাখিলে এটা করা হোক এজন্য যে, ছাত্ররা চাইলে যাতে সাধারণ কলেজ/ বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ব্যবসায় শিক্ষা ও ব্যবসায় প্রশাসনের সাবজেক্ট নিতে পারে, বিবিএতে ভর্তি হতে পারে। আর আমি তো তাদেরকে বলেছিও কামিলে গিয়ে এসব বিষয়ে ডিগ্রি দিতে হবে। তাতে ইসলামের সবই থাকবে। কামিলে গিয়ে শুধু সেসব বিষয় যেমন অর্থনীতি, বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের মতো বিষয়গুলো বেশি থাকবে। এ পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য।
আলেমরা এখনো স্বাতন্ত্র্য বিঘ্নিত হওয়ার আশংকা করেন, যা হওয়া উচিত নয়। তারা যেটা দাবি করতে পারেন সেটা হলো, কী ধরনের সিলেবাস হওয়া উচিত। এটা কতগুলো শব্দের ঝগড়ামাত্র যে, আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হবে, না জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হবে। অদ্ভূত ঝগড়া। আসল কথা হচ্ছে কামিলের মান। মান চাই। হতে পারে কোর্সের উন্নয়ন দরকার। তা যদি হয় তাহলে আলেম সাহেবরা কেন একমত হয়ে বলে দেন না যে, এই কোর্স হওয়া দরকার।
আমরা জানি, ব্রিটিশ আমলে আলিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপ্যালের প্রথম কয়েকজনই ছিলেন ইংরেজ। তাদের হাতেই মাদরাসা শিক্ষাধারা গড়ে উঠেছে; যদিও কোর্স তৈরি করেছেন মুসলমানরা। ওয়ারেন হেস্টিংসের ডায়েরিতে আছে কলকাতার মুসলিম নেতারা তাকে অনুরোধ করলেন যে ১৭৫৭ সাল থেকে আপনারা ক্ষমতায় আছেন। আমাদের অবস্থা তো কাহিল। আমরা একটা মাদরাসা নতুন করে করতে চাই, আপনি মাওলানা মজদুদ্দীন সাহেবকে বলুন। তখন ওয়ারেন হেস্টিংস মাওলানা মজদুদ্দীনকে ডেকে কোর্স তৈরি করে দেয়ার জন্য অনুরোধ করলে মাওলানা সাহেব দরসে নেজামির আলোকে কোর্স তৈরি করে দিয়েছেন। এটাই হলো ইতিহাস।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ