ঢাকা, শুক্রবার 31 May 2019, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ২৫ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নতুন টাকার গন্ধে মাতোয়ারা ব্যাংকপাড়া

ঈদ এলেই নতুন টাকার কদর বেড়ে যায়। পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর সন্নিকটে, তাই রাজধানীর গুলিস্তানে চলছে নতুন টাকার জমজমাট ব্যবসা। ছবিটি গতকাল বৃহস্পতিবারের - সৈয়দ নয়ন

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : দুনিয়ায় টাকার গন্ধই নাকি সবচেয়ে মধুময়। আর যদি সে টাকা নতুন হয়, তাহলে তো কথাই নেই। নতুন টাকার গন্ধে মাতোয়ারা ব্যাংকপাড়া। ঈদে কি আর নতুন টাকা না হলে চলে? নতুন টাকা ঈদের আনন্দে যোগ করে নতুন মাত্রা। বাঙালির ঈদ আয়োজনে নতুন টাকা বাড়তি আনন্দের সংযোজন ঘটিয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের নতুন জামার পাশাপাশি নতুন টাকা তাদের ঈদ আনন্দ আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই ঈদ সামনে রেখে রাজধানীর ব্যাংকপাড়া খ্যাত মতিঝিল এবং গুলস্থানের ফুটপাতে জমজমাট নতুন টাকার হাট। এই হাটে নতুন টাকার গন্ধে ঈদের আমেজ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনের ফুটপাতে হাকডাক দিয়ে বিক্রি হচ্ছে নতুন টাকা। নতুন টাকা কিনতে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। 

গতকাল বৃহস্পতিবার সরজমিনে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকার ব্যাংকপাড়া মতিঝিলসহ গুলিস্তান, চকবাজার, সদরঘাটের বেশ কয়েকটি জায়গায় চলছে নতুন টাকার ব্যবসা। ২ টাকার ১০০টি নতুন নোট নিতে আপনাকে গুণতে হবে অতিরিক্ত ৫০ টাকা। ৫ টাকার ১০০টি নতুন নোট নিতে ৮০ টাকা,  ১০টাকার ১০০টি নতুন নোট নিতে ১০০ টাকা, ২০টাকার ১০০টি নতুন নোট নিতে ৮০ টাকা, ৫০ টাকার ১০০টি নতুন নোট নিতে ১০০ টাকা, ১০০ টাকার ১০০টি নতুন নোট নিতে আপনাকে গুণতে হবে অতিরিক্ত ৭০ টাকা।

রাজধানীতে নতুন টাকাকে কেন্দ্র করে ব্যবসা বেশ পুরোনো। তবে নতুন টাকার ব্যবসা যেন দিনকে দিন আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ব্যাংক থেকে নতুন টাকা সংগ্রহ করে এসব ব্যবসায়ীরা বিশেষ লাভে (বাট্টা বা কমিশন) বিক্রি করে থাকেন।

রাজধানীর গুলিস্তান মোড়ে নিত্যদিন নতুন টাকা বেচাকেনার হাট বসে। গুলিস্তান মার্কেটের (বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের বিপরীত পাশে) ফুটপাত ঘেঁষে প্রায় অর্ধশত নতুন টাকার দোকান। ছোট একটি টেবিল আর টুল নিয়েই দোকানের অবকাঠামো। টেবিলের ওপর থরে থরে সাজানো বিভিন্ন নোটের নতুন টাকার বান্ডিল। দোকানিরা বিশেষ কমিশনে নতুন টাকা বিক্রির হাক ছাড়ছেন। ক্রেতা আসছেন। কেউ কিনছেন, কেউ আবার দাম হাকিয়ে চলে যাচ্ছেন।

আসন্ন ঈদুল উল ফিতর উপলক্ষে নতুন টাকা বেচাকেনায় ধুম পড়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সরেজমিনে সে দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। অনেকেই লাইন ধরে নতুন টাকা ক্রয় করছেন।

নতুন টাকার ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতিদিন ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। তবে প্রতিযোগিতাও কম নয়। কারো আয় হাজারের বেশি আর কারো একশ' টাকাও হয় না। তবে কেউ কাস্টমার ছাড়তে রাজি নয়। কম করে ১ বা ২ টাকা লাভেও অনেক সময় টাকাবিনিময় করতে হয়। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ব্যবসা করার কারণে পুলিশ টাকা-ব্যবসায়ীদের তাড়া করে। পাশাপাশি ছিনতাইকারীর ভয় তো আছেই। মাঝে মাঝে দেখা যায় ছিনতাইচক্র হাত থেকে ছিনিয়ে দৌড় দেয়।

আরেক ব্যবসায়ী বলেন, আমরা যে ৫০ বা ৮০ টাকা উপরি নিই, এতে আমাদের লাভ হয় ১০ থেকে ২০ টাকা। কারণ ব্যাংক আমাদের সরাসরি টাকা দেয় না। ব্যাংকে কিছু লোক থাকে যারা লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা উত্তোলন করে। তারপর তারা বিভিন্ন কমিশনে আমাদের কাছে বিক্রি করে। ২ টাকার ১০০টি নোট ২৩০ টাকা দিয়ে কিনে ২৫০ টাকায় বিক্রি করতে হয় বলেও জানান আব্বাস নামের এক ব্যবসায়ী। তবে সব সময় দাম একরকম থাকে না। অনেক সময় লাভ ছাড়াই বিক্রি করতে হয়। 

কথা হয় আরিফুল ইসলাম নামের এক ক্রেতার সঙ্গে। বাড়ি নাটোর। ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাবেন। ঈদের কেনাকাটার সঙ্গে নতুন টাকাও কিনেন তিনি। তিনি বলেন, বহু আগে থেকেই ঈদের ছুটিতে বাড়ি যেতে নতুন টাকা সঙ্গে করে নিয়ে যাই। সবার হাতে নতুন টাকা বিতরণ করার মজাই আলাদা। বিশেষ করে পরিবারের ছোটরা নতুন টাকা পাবার আশায় চেয়ে থাকে।

শফিকুল ইসলাম নামের নতুন টাকার দোকানি বলেন, এক বছর হয় নতুন টাকার ব্যবসা ধরেছি। অনেকেই ২০/৩০ বছর ধরেও এ ব্যবসা করছেন। অন্যান্য সময় বেচাকেনা হলেও দুই ঈদের সময় ধুম পড়ে যায়। বুধবার প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা লাভ হয়েছে। আজও তাই হবে। মৌসুমই তো এখন। অনেকেই আবার ফিতরার জন্য নতুন টাকা বিতরণ করে থাকেন। তারা ব্যাংক থেকে সংগ্রহ করতে না পারলে আমাদের কাছ থেকে নতুন টাকা কিনে নেন।

গত ২২ মে থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন অফিসের কাউন্টারের মাধ্যমে জনসাধারণের মাঝে নতুন নোট বিনিময় শুরু হয়। এছাড়া, ঢাকা শহরের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ৩০টি শাখা থেকেও আলোচিত সময়ে ১০, ২০, ৫০ ও ১০০ টাকা মূল্যমানের নতুন নোট বিনিময় করা হচ্ছে।

নতুন টাকা যেসব ব্যাংক ও শাখায় নতুন টাকা পাওয়া যাচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে- এনসিসি ব্যাংকের যাত্রাবাড়ী শাখা, জনতা ব্যাংকের আব্দুল গণি রোড কর্পোরেট শাখা, অগ্রণী ব্যাংকের জাতীয় প্রেস ক্লাব কর্পোরেট শাখা, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের মিরপুর শাখা, সাউথইস্ট ব্যাংকের কারওয়ান বাজার শাখা, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের বসুন্ধরা সিটি (পান্থপথ) শাখা, উত্তরা ব্যাংকের চকবাজার শাখা, সোনালী ব্যাংকের রমনা কর্পোরেট শাখা, ঢাকা ব্যাংকের উত্তরা শাখা, আইএফআইসি ব্যাংকের গুলশান শাখা, ন্যাশনাল ব্যাংকের মহাখালী শাখা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের মোহাম্মদপুর শাখা, জনতা ব্যাংকের রাজারবাগ শাখা, পূবালী ব্যাংকের সদরঘাট শাখা, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের মালিবাগ শাখা, ওয়ান ব্যাংকের বাসাবো শাখা, ব্র্যাক ব্যাংকের শ্যামলী শাখা, ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড এগ্রিকালচার শাখা, দক্ষিণখান, দি প্রিমিয়ার ব্যাংকের বনানী শাখা, ব্যাংক এশিয়ার ধানমন্ডি শাখা, দি সিটি ব্যাংকের বেগম রোকেয়া সরণী শাখা, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের নন্দীপাড়া শাখা, প্রাইম ব্যাংকের এলিফেন্ট রোড শাখা, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখা, এক্সিম ব্যাংকের শিমরাইল শাখা, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের গাজীপুর চৌরাস্তা শাখা, ইউসিবিএল, গাজীপুর চৌরাস্তা শাখা, উত্তরা ব্যাংকের সাভার শাখা, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাভার শাখা এবং ট্রাস্ট ব্যাংকের কেরানীগঞ্জ শাখায় নতুন টাকা পাওয়া যাচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ