ঢাকা, বুধবার 26 June 2019, ১২ আষাঢ় ১৪২৬, ২২ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

গাইবান্ধায় দারিদ্রের কষাঘাতে সন্তানদের ‘বিক্রি’ করতে বাধ্য হচ্ছেন বাবা-মা

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক:দীর্ঘ দিন ধরে নানা রোগে আক্রান্ত সুন্দরগঞ্জ উপজেলার রাজবাড়ি গ্রামের হাবিল মিয়া। গতর খেটে স্ত্রী সন্তানসহ সাতজনের সংসার চালানো বড়ই কঠিন এ দিনমজুরের কাছে।

দারিদ্রের কষাঘাতে বিদ্ধ হাবিল ও তার স্ত্রী একপর্যায়ে তাদের নাড়িছেঁড়া ধন দুই মেয়েকে বিক্রি করে পরিবারের জন্য মাথাগোঁজার ব্যবস্থা করতে এক টুকরো জমি ক্রয়ের পরিকল্পনা করেন।

পরিকল্পনামতো তারা তাদের পাঁচ মাস বয়সের কন্যা সন্তানকে ৫০ হাজার ও তিন বছরের কন্যা সন্তানকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেন।

একটুখানি শান্তির জন্য মেয়েদের বিক্রির টাকায় কেনা জমিতে ঘর তুললেও শান্তিমতো ঘুমোতে পারেন না হতদরিদ্র্য হাবিল। প্রায়ই তার মনে পরে মেয়েদের কথা। মেয়েদেরকে একনজর দেখার জন্য মাঝেমধ্যেই মনটা ছটফট করলেও তাদের কথা মুখে নেয়াও বারণ তার! তাছাড়া মেয়রা এখন কোথায় আছে, কার কাছে আছে তাও জানেন না তিনি।

দারিদ্র্যের কারণে গত দুই বছরে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ফুলছড়িতে অন্তত পাঁচটি সন্তানকে বিক্রি করেছে তাদের বাবা-মা।

তবে নিজের সন্তানকে বিক্রি করা মোমেনা বেগমের কাহিনিটা একটু ব্যতিক্রম ছিল। তার গর্ভে আট মাসের সন্তান রেখে মারা যান তার স্বামী।

এদিকে জন্মের পর ওই শিশুটির নাম রাখা হয় মোস্তফা। মায়ের সাথে নানির বাড়িতে বড় হচ্ছিল শিশুটি। কিন্তু মোমেনার সাথে পরে আবার বিয়ে হয় গাইবান্ধা সদর উপজেলার দাড়ারবাতা গ্রামের রফিক মিয়ার।

বিয়ের পর রফিক মিয়া মোমেনার কোলের সন্তান মোস্তফাকে মেনে নিতে রাজী নয়। তাই সৎ বাবার চাপের মুখে মোমেনা তার কোলের সন্তানকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন।

পরে ওই এলাকার ক্রেতা আমজাদ হোসেনের ঘরে বড় হতে থাকে শিশু মোস্তফা। কিন্তু ঘটনাটি জেনে যায় মোস্তফার নানি জয়গুন বেগম। তিনি নাতিকে ফেরত নিতে গেলে ক্রেতা ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। চাহিদামত টাকা দিয়ে জয়গুন বেগম নাতি মোস্তফাকে ফেরত পেলেও মোস্তফার মতো এমন খুব কম শিশুই রয়েছে যারা বিক্রি হয়ে যাবার পরও পরিবারের কাছে যাওয়ার সুযোগ পায়।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দরিদ্র আশরাফুল ইসলামের অবস্থা হাবিল মিয়ার মতো। বড় সংসারের ভার বহন করতে অক্ষম পরিবারটি তিন বছর আগে দুই কন্যা সন্তানকে ৫ হাজার ও ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে বিত্তবান দুই ব্যক্তির হাতে তুলে দেন তিনি।

ক্রেতারা সন্তান পাওয়ার পর তাদের নাম পরিচয় বদলে ফেলেন জানিয়ে আশরাফুল ইসলাম বলেন, তারা এখন কোথায় কার কাছে আছে, সে ব্যাপারে কিছুই জানেন না তিনি।

যোগাযোগ করা হলে স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, সন্তান বিক্রির এমন ঘটনার কিছুই জানেন না তিনি। তবে এখন জানলেও বিক্রিত সন্তানদের উদ্ধারে তার কিছুই করার নেই জানিয়ে বলেন, ‘এটি স্থানীয় প্রশাসন দেখবে।’

পরবর্তীতে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোলেমান আলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে সংসদ সদস্য শামীম হায়দার দারিদ্রতার সমস্যাটি স্বীকার করে বলেন, নদী ভাঙনসহ বিভিন্ন কারণে জেলার কিছু কিছু এলাকায় দারিদ্রতা ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে।

তবে এসব দরিদ্র মানুষের জন্য সরকার ত্রাণ সামগ্রী সরবরাহ ও তাদের স্থানীয়ভাবে আর্থিক অবস্থার উন্নতিতে পদক্ষেপ নেয়ারও পরিকল্পনা করছে বলেও জানান তিনি। 

এদিকে সন্তান বিক্রির বিষয়টি অস্বীকার করে তারাপুর ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম জানান, ‘যারা একটু বিত্তবান তারা নিজের বাড়িতে কাজের মেয়ে হিসাবে অগ্রিম টাকা দিয়ে এসব সন্তান নিয়ে যান।’

‘গোটা নদী ও পল্লী এলাকা খুঁজলে এরকম সন্তান বিক্রি বলেন আর দত্তক বলেন অনেক পাওয়া যাবে। বিশেষ করে গৃহহীন, নদী ভাঙন ও বাধে আশ্রিত পরিবারে সন্তান হস্তান্তর অনেক হয়েছে,’ যোগ করেন তিনি।-ইউএনবি

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ