ঢাকা, সোমবার 10 June 2019, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ৬ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আবারও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ইঙ্গিত

স্টাফ রিপোর্টার: আবারও গ্যাসের দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত দিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। তিনি বলেন, এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানির কারণে এরইমধ্যে ১৪ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। আরও ১৪ হাজার কোটি টাকার মতো প্রয়োজন হবে। এ অবস্থায় গ্যাসের দাম সমন্বয় করতে না পারলে ভর্তুকি আরও বাড়বে। গত ১০ বছরে ৬ বার বেড়েছে গ্যাসের দাম। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ইঙ্গিতে উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর শিল্পের উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ চরমে।
গতকাল রোববার সচিবালয়ে ঈদ পরবর্তী পুনর্মিলনী ও বিদ্যুৎ বিষয়ক সংবাদ সম্মেলন তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় পিডিবি চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ, পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মো. হোসেইন উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনের আগে প্রতিমন্ত্রী কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঈদের কুশল বিনিময় করেন এবং সবাইকে মিষ্টি মুখ করান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ পর্যন্ত ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়েছে। আরও ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি যোগ হবে। গত বছর আগস্ট থেকে এলএনজি আমদানি শুরু করেছি আমরা। এ গ্যাসের দাম অনেক বেশি। নিজস্ব গ্যাসেরই আমরা এখন ভর্তুকি দেই। গ্যাসের যে দাম তার থেকে অনেক কম দামে গ্রাহককে সরবরাহ করা হয়। চলতি অর্থবছরে ৫-৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। যদি দাম সমন্বয় না করা হয় তাহলে আগামী অর্থবছরে ৭-৮ হাজার কোটি টাকা বাড়তি লাগতে পারে।
তিনি আরও বলেন, গ্যাসের দাম সমন্বয় করা হলেও কিছু ভর্তুকি দিতেই হবে। সেক্ষেত্রে আগের অর্থবছরে যে পরিমাণ ভতুর্কি দেয়া হয়েছিল সেই পরিমাণ দিলেই হবে।
বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এবার বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতে ২৯-৩০ হাজার কোটির টাকার বাজেট বরাদ্দ হতে পারে। এরমধ্যে বিদ্যুৎ খাতে ২৬ হাজার কোটি বরাদ্দ দেয়া হবে। জ্বালানিতে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হতে পারে।
আবাসিকে গ্যাস সংযোগ দেয়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি পুরনো গ্যাস লাইন খুলে ফেলে নতুন করে পাইপলাইন বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। এজন্য ১২০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রিপেইড মিটারের মাধ্যমে গ্যাস সাশ্রয়ের কথা তিনি জানান।
তিনি বলেন, চলতি বছর আরও আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। ঈদের ছুটিতে সর্বোচ্চ ১২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে। এরমধ্যে ঝড়-বৃষ্টির কারণে সব জায়গায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে না পারলেও গ্রাহকদের ধৈর্য ও বিশ্বাসের কারণে বর্তমান সরকার এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী তিন বছরের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেয়া যাবে।
জানা গেছে, গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে প্রতিটি পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। বাড়াতে হবে পণ্যের দাম। ফলে রফতানির ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।
রফতানি কমারও আশঙ্কা রয়েছে। কমে যাবে প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা। বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন বিদেশি ক্রেতারা। অন্যদিকে পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে। কিন্তু আয় না বাড়ায় মানুষ জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে আপস করবে। ফলে পণ্যের চাহিদা কমে যেতে পারে। এতে দেশীয় শিল্প খাতে বড় ধরনের আঘাত আসার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, শিল্প খাতে মৌলিক কাঁচামালের মতো কাজ করে গ্যাস-বিদ্যুৎ। এগুলোর দাম বাড়লে সব খাতেই ব্যয় বেড়ে যাবে। ঘন ঘন গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে ব্যবসায়ীদেরকে পণ্যের দাম বাড়াতে হয়। এতে দেশের পণ্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়, যা বিশেষ করে রফতানি বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ব্যবসায়ীরা বলেছেন, দাম বাড়লে শিল্প খাতের বিকাশ রুদ্ধ হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প মুখ থুবড়ে পড়বে। দেউলিয়া হয়ে যাবেন উদ্যোক্তারা। তাদের বক্তব্য, গত ১০ বছরে ৬ বার বেড়েছে গ্যাসের দাম। এমনিতে বিশ্ব অর্থনীতির প্রভাবে শিল্প খাতে ব্যয় বাড়ছে, তার ওপর বারবার জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করবে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, গ্যাসের মূল্য সহনীয় রাখতে গত অর্থবছরে এ খাতে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা কর ছাড় দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কিন্তু বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ- গ্যাসের ওপর রাজস্বে এ ছাড়ের সুবিধা পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। উল্টো পেট্রোবাংলার নির্দেশে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে বিতরণ কোম্পানিগুলো।
মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে মন্ত্রী বলছেন, এলএনজি আমদানি ব্যয়ের তুলনায় এনবিআরের করছাড় অপ্রতুল। ফলে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সমন্বয় করার বিকল্প নেই। পেট্রোবাংলা বলেছেন, এক হাজার এমএমসিএফডি গ্যাস আমদানিতে এক অর্থবছরে তাদের ঘাটতির পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এ কারণেই গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রতিযোগিতা সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যখন-তখন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করা যায় না। তিনি গ্যাসের দাম এত না বাড়িয়ে সরকারকে ভর্তুকি দেয়ার দাবি জানান। তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি বলেন, আবেদন করার পর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সবেমাত্র গ্যাস সংযোগ পেতে শুরু করেছে। এ সময় দাম বৃদ্ধি কার স্বার্থে?
তিতাসকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আপনারা ৩৫ শতংশ লভ্যাংশ দিতে চাচ্ছেন কিন্তু ব্যবসায়ীরা তো দু-তিন ভাগও ব্যবসা করতে পারছেন না। তিনি গণশুনানিকে হাস্যকর আখ্যা দিয়ে বলেন, সারা বিশ্বে তেলের দাম কমলেও বাংলাদেশে জ্বালানির দাম কমেনি।
বাংলাদেশ অটো রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম বলেন, আগামী দিনগুলোতে ক্রেতাদের ওপর বাড়তি চাপ আসতে পারে। কারণ, গ্যাসের দাম বাড়বে, ডলারের দাম বাড়ছে। নতুন মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আইন কার্যকর হলে করের চাপও বাড়বে।
কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ালে পরিবহন, বিদ্যুৎ, পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে সব খাতে ব্যয় বাড়বে। এই বাড়তি ব্যয়ের প্রতিটি অর্থ আবার ব্যবসায়ীরা জনগণের কাছ থেকেই পণ্য ও সেবার দাম বাড়িয়ে আদায় করবেন। ফলে শেষ পর্যন্ত গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির মূল্য সাধারণ মানুষকেই দিতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ