ঢাকা, বুধবার 12 June 2019, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ৮ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ওসি মোয়াজ্জেমের পেছনে ছুটছে পুলিশ ॥ সীমান্তে সতর্কতা জারি

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকান্ডের ঘটনায় সারা বিশ্বে আলোচিত এমন একটি ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত একজন আসামী, যিনি একজন পুলিশ কর্মকর্তা তিনি কিভাবে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, সে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে। অনেকেই এজন্য পুলিশের গাফিলতি এবং স্বজনপ্রীতির কারণে এমনটি ঘটেছে বলে অভিযোগ করছেন।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে খবর এসেছে তিনি পালিয়ে গেছেন। এমন খবর পাওয়ার পরই টনক নড়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের। অবশেষে ওই ঘটনায় আলোচিত ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের পেছনে ছুটতে শুরু করেছে পুলিশ।  ঢাকায় অবস্থানের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়ে তাকে রাজধানীতে খুঁজছে পুলিশ। আদালতের পরোয়ানা তামিল করতে ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেপ্তারে ঢাকায় অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন ফেনীর সোনাগাজী সার্কেলের এএসপি সাইকুল আহমেদ ভূঁইয়া। তিনি সোমবার রাতে বলেন, মোয়াজ্জেম সম্ভবত ঢাকায় আছেন বলে তথ্য তাদের কাছে আছে।“ঢাকায় সম্ভাব্য সকল জায়গায় অভিযান চালানো হয়েছে, এখনও চলছে।”
পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ওমর ফারুকও বলেন, “তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এ ব্যাপারে পুলিশ মাঠে কাজ করছে।”
এদিকে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন যেন কোনোভাবেই সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পালিয়ে যেতে না পারেন সেজন্য হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট ও হিলি সীমান্তে বাড়তি সতর্কতা জারি করেছে পুলিশ ও বিজিবি। হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের ওসি ফিরোজ কবির বিষয়টি গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।
আদালতের পরোয়ানার পর দুই সপ্তাহেও এই পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার না হওয়ায় সমালোচনার মুখে মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সোমবার সকালেই সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “একটা লোক পলাতক হলে তাকে অ্যারেস্ট করা কষ্টকরই হয়। তবে চেষ্টার কোনো ত্রুটি হচ্ছে না। খুব শিগগিরই হয়ত শুনবেন ধরা পড়েছে।”
গত মার্চ মাসে নুসরাত যখন তার মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছিলেন, তখন সোনাগাজী থানার ওসি ছিলেন মোয়াজ্জেম। ওই মামলায় নুসরাতের জবানবন্দী নেওয়ার পর তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে মামলা হয় ঢাকায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। ওই মামলায় গত ২৭ মে বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনাল এই পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি করে। কিন্তু এপ্রিলের শুরুতে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পর সমালোচনার মুখে ওসি মোয়াজ্জেমকে সোনাগাজী থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় পুলিশের রংপুর রেঞ্জে। পরে তাকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়। তারপর আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল নিয়ে ফেনী পুলিশের সঙ্গে রংপুর পুলিশের ঠেলাঠেলির মধ্যে লাপাত্তা হয়ে যান ওসি মোয়াজ্জেম। পরে ফেনী পুলিশই ওই পরোয়ানা তামিলের কাজ শুরু করে।
ওসি মোয়াজ্জেম পালিয়ে গেছেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকেই বলা হলেও পরোয়ানা জারির দুদিন পর আগাম জামিন চেয়ে হাই কোর্টে আইনজীবীর মাধ্যমে তার আবেদন জমা পড়ে।
সোনাগাজীর এএসপি সাইকুল বলেন, “জামিনের জন্য তাকে (ওসি মোয়াজ্জেম) ঢাকায় থাকতে হবে। পুলিশ সদর দপ্তরের সাথে যোগাযোগ করতে হলেও তাকে ঢাকায় অবস্থান জরুরি।”
অভিযানে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা বলেন, “ মোয়াজ্জেম ধরা না দিয়ে আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করতে পারেন। আমরা আদালতপাড়ায়ও নজরদারি রাখছি।”ওসি মোয়াজ্জেম কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, সেদিকেও দৃষ্টি রাখা হচ্ছে বলে জানান তিনি। তার গ্রামের বাড়ি যশোরেও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান এএসপি সাইকুল।
সীমান্তে সতর্কতা জারি
সোনাগাজীর সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন যেন কোনোভাবেই সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পালিয়ে যেতে না পারেন সেজন্য হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট ও হিলি সীমান্তে বাড়তি সতর্কতা জারি করেছে পুলিশ ও বিজিবি। হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের ওসি ফিরোজ কবির বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
ওসি ফিরোজ কবির জানান, ‘ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন যেন কোনোভাবেই এই পথ ব্যবহার করে ভারতে পালিয়ে যেতে না পারে এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা আমাদের প্রধান দফতর থেকে ইতোমধ্যে আমরা পেয়েছি। ইতোমধ্যে আমরা তার নাম ব্লক করে দিয়েছি। সে কোনোভাবেই এই পথ দিয়ে ভারতে যেতে পারবে না। সেই সঙ্গে হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে যাতায়াতরত সব ধরনের পাসপোর্ট যাত্রীদের ছবি ওয়ান্টেডভুক্ত তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে তাদের নাম-পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরেই তাদের আসা-যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।’
বিজিবির হিলি আইসিপি ক্যাম্প কমান্ডার সুবেদার চান মিয়া জানান, ‘আমরা সীমান্তে সবসময় সতর্কাবস্থায় থাকি। এরপরও কোনও অপরাধী যেন সীমান্ত অতিক্রম করে অবৈধপথে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যেতে না পারে, এমনকি ভারত থেকে বাংলাদেশে না আসতে পারে এজন্য আমরা সীমান্তে টহল ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি বাড়তি টহলের ব্যবস্থা করেছি। সেই সঙ্গে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সীমান্ত এলাকায় চলাচলরত ব্যক্তিদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।’
চাঁদরাতে গ্রামের বাড়িতে ফোন করেছিলেন ওসি মোয়াজ্জেম
নিরুদ্দেশ হওয়ার আগে চাঁদরাতেও যশোরে গ্রামের বাড়িতে ফোন করেছিলেন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। রংপুর থেকে করা সেই ফোনের পর পরিবারের সঙ্গে আর যোগাযোগ করেননি তিনি। ওসি মোয়াজ্জেমকে পুলিশ খুঁজে পাচ্ছে না-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর গত রোববার (৯ জুন) বিকালে যশোর শহরের চাঁচড়া ডালমিল রায়পাড়ায় তার পৈত্রিক বাড়িতে খোঁজ নিতে গেলে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের এ তথ্য জানান তার তৃতীয় ভাইয়ের স্ত্রী রেকসোনা খাতুন। তিনি আরও জানান, মাস ছয়েক আগে বাবার মৃত্যুবার্ষিকীর পর আর বাড়িতে আসেননি মোয়াজ্জেম।
গ্রামের দ্বিতল বাড়িটিতে ওসি মোয়াজ্জেমের ছোট দুই ভাই ও একমাত্র বিবাহিত বোন বর্তমানে মায়ের সঙ্গে  থাকছেন। মোয়াজ্জেমের স্ত্রী-সন্তানদের কেউ থাকেন না।
তার পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ওসি মোয়াজ্জেমের বাবার নাম খন্দকার আনসার আলী। পাঁচ ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি বড়। তার এক ভাই সৌদি আরবে ও আরেক ভাই আমেরিকা প্রবাসী। মোয়াজ্জেম এই বাড়িতে থেকেই শিক্ষাজীবন শেষ করেছেন। তবে চাকরিতে প্রবেশের পর বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ কমে গেছে তার। তার শ্বশুরের আদি বাড়ি ঝিনাইদহে। যশোর সদরের পুলেরহাটেও একটি বাড়ি আছে তাদের। তবে সেটা ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল বলেন, মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেপ্তারে ব্যর্থতা পুলিশ বাহিনীর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করবে।"এটা যদি পুলিশের গাফিলতি হয়, তাহলে আমাদের জন্য সেটা খুবই উদ্বেগের বিষয়। আর যদি সেটা পুলিশের অযোগ্যতার বিষয় হয়, তাহলে সেটা আরো বড় উদ্বেগের ব্যপার। কারণ অন্যায়ের প্রতিকার পাবার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা এতে নষ্ট হয়ে যায়।"
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন আগাম জামিনের আবেদন করেছিলেন উচ্চ আদালতে। গতকাল ১১ জুন সেই আবেদনের ওপর শুনানি হবার কথা ছিল। সেই শুনানিতে তিনি হাজির হননি।
এদিকে, আলোচিত এই হত্যার ঘটনায় ১৬জন আসামীর বিরুদ্ধে দেয়া চার্জশিট সোমবার আমলে নিয়েছে আদালত। আগামী ২০ শে জুন এ মামলার চার্জ গঠনের দিন ধার্য করা  হয়েছে।
মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী শাহজাহান সাজু জানিয়েছেন, আদালত নুসরাত হত্যায় গ্রেফতার ২১ জনের মধ্যে পাঁচজনকে অব্যাহতি দিয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ