ঢাকা, শুক্রবার 14 June 2019, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১০ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

হতাশাজনক বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন 

স্টাফ রিপোর্টার: জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করার পর তা নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। অপরদিকে বাজেটকে স্বাগত জানিয়ে আনন্দ মিছিল বের করছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও তাদের কয়েকটি অংঙ্গসংগঠন। 

বাজেটে বড় অঙ্কের ঘাটতির সমালোচনা করেছেন বিএনপির নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, এই ঘাটতি সরকার জনগণের কাছ থেকেই পূরণ করবে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এই বাজেট নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বাজেট পেশের পর রাজধানীর একটি হোটেলে সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। 

২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘এই ঘাটতির প্রভাব মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পড়বে।’

সাবেক বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের এই বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বাজেট তো জনগণের। জনগণকে কোনো না কোনোভাবে এই ঘাটতি মেটাতে হবে। সেটা অতিরিক্ত গ্যাস বিল দিয়ে হোক বা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের মাধ্যমে হোক। ফলে এর প্রভাব সরাসরি জনগণের ওপরই পড়বে।’

এবার সবচেয়ে বড় বাজেট প্রসঙ্গে বিএনপির এই নেতা বলেন, বাজেটের আকৃতি সব সময় বাড়ে। বাংলাদেশের ইতিহাসে বাজেটের আকার কোনো বছর কখনোই কমেনি।

জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটকে ‘হতাশাজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, কী বলবো, বাজেটে বলার মতো কিছুই নেই। এটা হতাশাজনক একটা বাজেট। গরিব মানুষের জন্য এই বাজেটে কোনো সুসংবাদ নেই। 

মান্না বলেন, অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে বললেন এটা জনকল্যাণমুখী বাজেট হবে। কিন্তু জনকল্যাণমুখী কোনো প্রজেক্টইতো নেই। শিক্ষা-স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ কম, সামাজিক নিরাপত্তা নেই, বয়স্কদের জন্য কিছু নেই। বড় ধরনের ঘাটতির বাজেট। সবচেয়ে বড় কথা রাজস্ব আয় করা নিয়ে বড় ধরনের হুমকি রয়েছে।

‘তারা লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন এক কোটি লোককে করের আওতায় আনবেন। এটা এতো সোজা কথা নয়। এক বছর পরে রাজস্ব আদায় হবে। এই এক বছর কিভাবে চলবে? ব্যাংক থেকে নিয়ে চলবে, তাও ব্যাংকে লিকুইড মানি (তরল মুদ্রা) নেই। ব্যাংকের রিফর্মের ওপরেও কোনো কথা বলেননি। পুঁজিবাজার নিয়ে অনেক কথা বললেন, পুঁজিবাজারের এই এই এগুলো ঠিক করবেন। কিন্তু পুঁজিবাজার যে মারা যাচ্ছে তা নিয়ে কিছু বলেননি।’

মান্না বলেন, উন্নয়নের ব্যাপারে এ বছরের বাজেটে উল্লেখযোগ্য কিছু নেই। এককথায় এটা গতানুগতিক সাধারণ মাত্রার একটা বাজেট। আকারের দিক থেকেই শুধু বড়।

 

এক প্রশ্নের জবাবে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক বলেন, গরিব মানুষের জন্য এই বাজেটে কিছুই নেই। এতো বেকারের দেশ, এতো কর্মসংস্থানের অভাব, কিন্তু সেই কর্মসংস্থান নিয়ে কিছু বলা হয়নি। ১০০ কোটি না কতো টাকার একটা বরাদ্দ রেখে দেওয়া হয়েছে। সেটা কিভাবে কী হবে তার কোনো ঠিক নেই। গতবার বরাদ্দ রেখেছিল, তা খরচই করেনি। এবারও খরচ করার মতো কোনো কিছু নেই। সেদিক থেকে আমি বলবো যে এটা হতাশাজনক একটা বাজেট।

আরেকটি প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারাতো বলছে শতকরা ৫ ভাগ মূল্যস্ফীতি গ্রহণযোগ্য। ট্যাক্স কোথায় বাড়ালো কমালো তার কোনো খবরই নেই। শুধু টেলিফোন কলরেটের কথা পত্রিকায় এসেছে, সেটাতো বক্তৃতায় দেখলাম না। তাছাড়া আমি পুরো বক্তৃতা এখনো পাইনি। অর্থমন্ত্রী একটা কথা বলেছেন যে, ট্যাক্স এমনভাবে করবেন যেন দ্রব্যমূল্য না বাড়ে। এটা এখন দেখার বিষয়। আর মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের বেশি হবে বলে আমার মনে হয়।

 তাৎক্ষণিক বাজেট প্রতিক্রিয়ায় অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলিকুজ্জামান বলেছেন, ‘বাজেটে আমার গ্রাম আমার শহর বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। দারিদ্র্য দূরীকরণ, দুর্নীতি রোধের কথা বলা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের সমস্যা সমাধানের কথা বলা হয়েছে। এটি একটি বড় বাজেট আর বাজেট বাস্তবায়নে তো প্রতিবছরই ঘাটতি থাকে।’

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ-একাংশ) সভাপতি ও সংসদ সদস্য মঈনুদ্দীন খান বাদল বলেন, ‘এ বাজেট বাস্তবায়নই বড় কথা।’

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেট গণমুখী বাজেট। এ বাজেটে গ্রামকে শহর করার কথা বলা আছে।’

সাবেক মন্ত্রী ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘বাজেটে ধনী-গরিবের বৈষম্য কমানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। ঋণখেলাপি বিষয়ে কোনো দিক নির্দেশনা নেই। বিপুল অংকের এই বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে বলে মনে করেন তিনি।

জাসদ সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, ‘এ বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য। গত ১০ বছরে সরকার যে বাজেট দিয়েছে তা বাস্তবায়ন হয়েছে। দারিদ্র্য দূরীকরণ ও রাজস্ব আয় বাড়াতে এই বাজেট সক্ষম।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি প্রধানমন্ত্রীর বড় অর্জন। এ বাজেট অর্জনযোগ্য। তবে স্বাস্থ্য-শিক্ষাখাতে বরাদ্দের টাকা সুষ্ঠুভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কড়া নজর রাখতে হবে।’

সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘এ বাজেট গণমুখী বাজেট। করের বোঝা নেই। ব্যবসায়ীরা এতে খুশি হবেন।’

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব। ট্যাক্স আদায় বাড়াতে হবে। আমার সময় শতকরা ঘাটতি ৫ শতাংশের ওপরে ওঠেনি। এবারের বাজেট উপস্থাপন খুব সুন্দরভাবে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী খুব চমৎকারভাবে বাজেট এর সারসংক্ষেপ তুলে ধরেছেন। এটি একটা নতুনত্ব।’

বিএনপির সংসদ সদস্য হারুন অর রশিদ বলেন, ‘এই বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব তা আগে বলা যাবে না। এশিয়ার মধ্যে একমাত্র রাষ্ট্র বাংলাদেশ, যে রাষ্ট্রে নির্বাচিত সরকার নেই। কৃষি বিপর্যস্ত। কৃষকরা সর্বস্বান্ত। বিদ্যুৎ লুটপাট-চুরি হচ্ছে।’

বাজেট প্রত্যাখ্যান করে বিএনপির এ সংসদ সদস্য বলেন, ‘এই বাজেট বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ। বাজেট বক্তৃতায় অনেক ভালো ভালো কথা বলা হয়েছে। তবে জনগণের ভঅলো হয় এমন কথা বলা নেই। এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে ঋণখেলাপি, পুঁজিবাজার লুটপাটের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।’

প্রস্তাবিত বাজেটের উন্নয়ন বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডি। সংগঠনটির সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন ধারণা করছেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ৫ লাখ ২০ হাজার ১৯০ কোটি টাকার মধ্যে যে ২১১ লাখ কোটি টাকার অধিক উন্নয়ন বরাদ্দ রাখা হয়েছে তার বিরাট অংশই লুট হবে।

 আ স ম আবদুর রব ও আবদুল মালেক রতন বলেন, ‘বাজেট সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে বাজেট ও প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি, ভোটাধিকার পর্যন্ত কেড়ে নেওয়া হয়েছে।’

 জেএসডির দুই শীর্ষনেতা অভিযোগ করেন, ‘বাজেটে দেশের আয়-উপার্জনহীন নিম্নবিত্ত মানুষ, এতিম, বিধবা, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও দুস্থ নারীদের জন্য নামমাত্র মূল্যে রেশন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা আজ একান্ত প্রয়োজন, অথচ তা রাখা হয়নি। রাষ্ট্র-প্রশাসনিক ব্যবস্থার গণতান্ত্রিক সংস্কার করে নতুনভাবে বাজেট প্রণয়ন করে উপস্থাপনের দাবি জানান তারা।

২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট সম্পর্কে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া বলেছেন, 'এটা জনগণের বাজেট না, এটা কয়েকটা গ্রুপের, কয়েকটা গোষ্ঠীর, তাদের সুবিধার জন্য এই বাজেট করা হয়েছে।

 রেজা কিবরিয়া বলেন, 'দেশের অর্থনীতির উপরে বিরাট একটা হুমকি আছে। ব্যাংকিং খাতের অবস্থা খুবই খারাপ। সরকার যে সেটা বুঝেছে, এই বাজেটে সেটার কোনো লক্ষণ নেই।'

একই বিষয়ে গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, 'এটা উচ্চাভিলাসী, ঋণখেলাপিবান্ধব বাজেট। দেশে কিছু ধনী পরিবার আছে, তাদেরকে সব রকমের সুযোগ সুবিধা দেওয়ার জন্য এই বাজেট করা হয়েছে। ক্ষমতায় থাকার জন্য বাজেট প্রণয়নের নামে জনগণের সঙ্গে এটা একটা প্রতারণা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ