ঢাকা, মঙ্গলবার 18 June 2019, ৪ আষাঢ় ১৪২৬, ১৪ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বিবাহে অলীমার দায়িত্ব শুধুমাত্র বরের ॥ কনের পিতার নয়

 বিয়ে আমাদের সমাজে একটি দায়বদ্ধতা বা সামাজিক প্রথা হিসেবে বিবেচিত। মুসলিম সমাজে বিয়ে হচ্ছে রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ। আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর কোনো সুন্নাহ অবজ্ঞা বা অবহেলা করা যাবে না। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ তায়ালা ও শেষ দিবসের (হাশরের) প্রতি আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্য আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। (সূরা- আহযাব-২১ )।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসুদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা যুবক বয়সে রাসূল (সা.)-এর সাথে ছিলাম। আমাদের কোনো ধন-সম্পদ ছিল না। রাসূল (সা.) বললেন, হে যুবক দল ! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে সে যেন বিয়ে করে নেয়। কেননা বিয়ে (পরস্ত্রী দর্শন হতে) দৃষ্টিকে অবনত রাখে এবং তার যৌন প্রবৃত্তিকে সংযমশীল করে। আর যে বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে না সে যেন সিয়াম পালন করে। কেননা, সিয়াম তার যৌন কামনাকে নিবৃত্ত করবে, (বুখারী-২৯১১)।

মুসলমানদের জন্যে বিয়ে আল্লাহ তায়ালার বিরাট নিয়ামত ও বরকতের ব্যাপার। বিয়ে থেকে নিয়ামত ও বরকত পেতে হলে অবশ্যই রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসরণ করতে হবে। প্রথমত: বিয়েতে ‘কুফু’ মিলতে হবে। যে মেয়েকে বিয়ে করবে তার আর্থিকসঙ্গতি বিবেচনায় আনতে হবে। 

দ্বিতীয়ত: পারিবারিক ও বংশীয় মর্যাদা দেখতে হবে। 

তৃতীয়ত: রূপ-সৌন্দর্যের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। 

চতুর্থ: দ্বীনদার ছেলে একজন দ্বীনদার সতী-সাধ্বী বিশেষ করে কুরআন সুন্নাহর জ্ঞান ও আমল আছে এমন মেয়েকে বিয়ে করবে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, একজন মহিলাকে বিয়ে করার সময় চারটি বিষয় লক্ষ্য করবে। তার ধন-সম্পদ, তার বংশ মর্যাদা, তার সৌন্দর্য এবং তার দ্বীনদারিত্ব। সুতরাং তোমাদের দ্বীনদার মহিলাকেই বিয়ে করা উচিত (বুখারী-২৯২৫)।

বিয়ের পূর্বে দেনমোহর ঠিক করে নিতে হবে। আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ করছেন, ‘তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে নারীদেরকে তাদের মোহরানার অঙ্ক একান্ত খুশি মনে তাদের মালিকানায় দিয়ে দাও।’ (সূরা আন নিসা-৪/৪)।

দেনমোহরের ব্যাপারে আমাদের সমাজে প্রচলিত নিয়ম বা পদ্ধতি শরীয়াহ সম্মত নয়। কারণ প্রথমত: বরের ওপর দেনমোহরের নামে বিরাট একটা বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়। ক্ষেত্র বিশেষ দেনমোহর পরিশোধ না করে উল্টো কনের পিতার কাছ থেকে চাকরির শর্তে বা বিদেশ যাওয়ার কথা বলে অথবা ব্যবসায়ের পুঁজির কথা বলে বিরাট অঙ্কের টাকা নিয়ে নেয়। এটাকে যৌতুক বলতে লজ্জা পায়। আবার দেনমোহর অনেক ক্ষেত্রে দাম্পত্য জীবনের নিরাপত্তা হিসেবে দেখা হয়। অনেকেই ভাবে দাম্পত্য জীবনে ভাঙ্গন সৃষ্টি হলে বিশাল অঙ্কের দেনমোহরের ভয়ে সংসার ভাঙ্গবে না আর ভাঙ্গলেও মামলা করে দেনমোহর আদায় করা যাবে। আসল বিষয় এটা নয়, আসল বিষয় হচ্ছে দেনমোহর হলো বিবাহের প্রথম শর্ত। দেনমোহর হলো স্বামীর নিকট স্ত্রীর সর্ব প্রথম হক বা অধিকার। হজরত ওকবাহ (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, সব শর্তের তুলনায় বিয়ের শর্ত (দেনমোহরের শর্ত) পালন করা তোমাদের জন্যে অধিক কর্তব্য, কেননা দেনমোহরের শর্তে তোমাদেরকে স্ত্রীদের বিশেষ অঙ্গ উপভোগ করার অধিকার দেয়া হয়েছে (বুখারি-২৯৬১)।

দেনমোহর হবে বরের সামর্থ্য বা সঙ্গতি অনুযায়ী। দেনমোহর বিয়ের পূর্বে না হলেও স্ত্রীর সাথে মিলিত হওয়ার পূর্বেই পরিশোধযোগ্য। যেমনটি করেছিলেন রাসূল (সা.) নিজের বিয়েতে। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) হজরত ছাফিয়াহ (রা.)কে দাস মুক্ত করলেন এবং মুক্তিপণকে তাঁর মোহর হিসেবে গণ্য করলেন বা মুক্তিপণকে মোহরের শর্তে বিয়ে করলেন, (বুখারী-২৯২৩)। হজরত আলী (রা.) হজরত ফাতেমা (রা.)কে বিয়ের পূর্বে তার সামর্থ্য অনুযায়ী দেনমোহর রাসূল (সা.)-এর নিকট পরিশোধ করে ছিলেন। 

দ্বিতীয়ত: দেনমোহরের কিছু বাকি কিছু মিছামিছি উসুল দেখানো হয়। যা পরবর্তীতে আর কখনওই পরিশোধ করা হয় না। দেনমোহর পরিশোধের ব্যাপারে পরবর্তীতে বিভিন্ন ছল-চাতুরির আশ্রয় নেয়া হয়, এটা অনৈতিক ও অবৈধ। 

তৃতীয়ত: স্বর্ণ গহনা দেনমোহর হিসেবে গণ্য হলেও তা ক্রয় মূল্যে নয়, বিক্রয় মূল্যে দেনমোহর হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে স্বর্ণ গহনা বা শাড়ী-ব্লাউজ ও প্রসাধনী সামগ্রী এগুলো উপঢৌকন হিসেবে দেয়াই শ্রেয়, দেনমোহর হিসেবে নয়। আমাদের সমাজে উল্টো ব্যবস্থা চালু আছে। যেমন কনের পিতা যে কোনোভাবেই বাধ্য হয়ে মেয়ের সুখ-শান্তির কথা বিবেচনা করে বা মেয়েকে খোটা দেবে মনে করে মেয়ের জামাই এর ঘর সাজানোর জন্যে যা কিছু প্রয়োজন তা দিয়ে দেন বা দিতে বাধ্য হন। এটা পরিহার করা উচিৎ কারণ রাসূল (সা.) ও তাঁর সাহাবাগণ কেহই কনের পিতার কাছ থেকে বিয়ে উপলক্ষে কোনো প্রকার উপঢৌকন গ্রহণ করেছেন বলে জানা যায়নি। এটা কনের পিতার ওপর সামাজিক ভাবে চাপানো একটা বোঝা, আর এটা জুলুম।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায় অলীমা বা বিবাহ উত্তোর স্বামী-স্ত্রীর মিলন বা সাক্ষাৎ বা বিবাহ ভোজ একটি প্রচলিত নিয়ম ও অধিকার বা হক। এ অধিকার হচ্ছে আত্মীয়তার ও প্রতিবেশীর। হজরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ছাফিয়া (রা.)কে (যিনি ক্রীতদাসি ছিলেন) মুক্ত করে তাঁকে বিবাহ করলেন এবং তাঁকে মুক্ত করাই ছিল ধার্যকৃত তাঁর দেনমোহর। তাঁর বিবাহে হাইস বা খেজুর, ঘি, ও ছাতু দ্বারা এক প্রকার উন্নত মানের সুস্বাদু খাদ্য দ্বারা অলীমার ব্যবস্থা করেছিলেন। (বুখারি-২৯৭০)। অপর এক হাদীস থেকে জানা যায়, হজরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.)-এর এক স্ত্রী যয়নব (রা.)-এর সাথে বিবাহের মিলনে ব্যবস্থা করলেন এবং লোকদেরকে অলীমার বা বিবাহ ভোজের দাওয়াত করার জন্যে আমাকে প্রেরণ করলেন। (বুখারি-২৯৭১)।

যৎসামান্য বা ছোট আকারে হলেও বরের পক্ষে অলীমার ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই কনের বা কনের পিতার পক্ষে বরের আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীকে আপ্যায়নের কোনো ব্যবস্থা ইসলাম সমর্থন করে না। কারণ রাসূল (সা.) নিজেই তাঁর বিয়েতে অলীমার ব্যবস্থা করেছিলেন।

অলীমা এটা বরের পক্ষে থেকে অনুষ্ঠিত হবে, অর্থাৎ বর কনের ও নিজের আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীসহ লোকদেরকে তার সাধ্য মতো আপ্যায়ন করানো এটা বরের দায়িত্ব আত্মীয়তার হক বা অধিকার। কিন্তু আমাদের সমাজে উল্টো ব্যবস্থা চলমান। অলীমার দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রে কনের পিতার ওপর চাপানো হয় অথবা বলা হয় বরের পক্ষে একদিন আর কনের পক্ষে আর একদিন অনুষ্ঠান করতে হবে। যা ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় বৈধ নয়। মনে রাখতে হবে অলীমার দায়িত্ব শুধু মাত্র বরের, কনের বা কনের পিতার নয়। হজরত ছাফিয়াহ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) তাঁর কোনো একজন স্ত্রীর বিয়েতে অন্তত চার সের পরিমাণ যব বা বার্লির দ্বারাই অলীমার ব্যবস্থা করেছিলেন। (বুখারি-২৯৭৩)।

আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীকে অলীমার দাওয়াত দিতে হবে এবং দাওয়াত গ্রহণ করতে হবে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, তোমাদের কাউকে যদি অলীমার দাওয়াত দেয়া হয়, তবে তা যেন অবশ্যই গ্রহণ করা হয়। (বুখারি-২৯৭৪)।

অলীমায় ধনী-গরিব সকল আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীকে দাওয়াত দিতে হবে এবং সে দাওয়াতে সকলকে যেতে হবে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, যে অলীমায় শুধুমাত্র ধনী-আমীরদেরকে দাওয়াত দেয়া হয় এবং গরিব মিসকীনদের দাওয়াত দেয়া না হয়, সে খাদ্য সর্বাধিক নিকৃষ্ট। আর যে ব্যক্তি অলীমার দাওয়াত কবুল করে না বা দাওয়াতে যায় না, সে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসূল (সা.) এর নাফরমানি করল। (বুখারি-২৯৭৭)।

উপরোক্ত হাদীস থেকে আমরা অলীমার দায়িত্ব ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে পারলাম। আমাদের মুসলিম সমাজে বিশেষ করে যারা ইসলামের ধারক-বাহক তারাসহ অন্য সকল মুসলমাদের মধ্যে অলীমার যে প্রচলন আছে তা ইসলামী সংস্কৃতি বা সুন্নাহ সম্মত নয়। আমরা অনেকেই সামাজিকতার অজুহাতে বা মান-ইজ্জতের ভয়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) এর অনেক সুন্নাহকে অবহেলা বা অবজ্ঞা করি, এটা কোনো অবস্থাতেই শরীয়া সম্মত নয়। আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে ও রাসূল (সা.) এর সুন্নাহ মেনে চলার মধ্যেই মান-ইজ্জত নিহিত। একজন মুসলমান হিসেবে বা ঈমানের দাবিদার হিসেবে আমাদেরকে সর্বদা খেয়াল রাখতে হবে বিবাহ-শাদীর এই পবিত্র অনুষ্ঠান যেন অশ্লীলতা পূর্ণ ও কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী না হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ