ঢাকা, শুক্রবার 21 June 2019, ৭ আষাঢ় ১৪২৬, ১৭ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

রংপুর মেডিকেল কলেজের উপকরণ ক্রয়ে ব্যাপক দুর্নীতি

মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, রংপুর অফিস : রংপুর মেডিকেল কলেজের উপকরণ ক্রয়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি তদন্ত কমিটি রমেকের তৎকালীন টেন্ডার কমিটির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে।

পারস্পরিক যোগসাজশের মাধ্যমে দরপত্রে উপকরণের মূল্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডাক্তার কান্তা রায় রিমিকে কন্ডাক্টিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাকে দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন) বরাবর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। সচেতন নাগরিক সমাজের সভাপতি অধ্যাপক একেএম হাবিবুল্লাহর অভিযোগের ভিত্তিতে এ তদন্ত শুরু হয়েছে বলে রমেক সূত্রে জানা গেছে। 

প্রাপ্ত অভিযোগে জানা গেছে, রংপুর মেডিকেল কলেজ রমেক এর ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের ইকুইপমেন্ট অ্যান্ড আদারস ইন্সট্রুমেন্টসহ প্রায় ৫ কোটি টাকার উপকরণ দরপত্রের মাধ্যমে ক্রয় করা হয়। পারস্পারিক যোগসাজসের মাধ্যমে এই দরপত্রে প্রতিটি পণ্যের মূল্য ৪/৫ গুণ বাড়িয়ে প্রায় ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল উত্তোলন করা হয়। টেন্ডারে অংশ গ্রহনকারী ৩টি কোম্পানীর মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বেঙ্গল সায়েন্টিফিক এন্ড সার্জিকেল কোম্পানীকে এই কার্যাদেশ দেয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়, অতি গোপনীয়তার সাথে ঐ দরপত্রে কাটাকাটি করে বেঙ্গল সায়েন্টিফিক এন্ড সার্জিকেল কোম্পানীকে সর্বনিম্ন দরদাতা বানানো হয়েছে। সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই টেন্ডারে জেনারেল কোম্পানীর ২ টন ক্ষমতা সম্পন্ন ৩২টি এসি কেনা হয়েছে যার প্রতিটির মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে ২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা করে। অথচ এর প্রতিটির প্রকৃত বাজার মূল্য হচ্ছে ৯০ হাজার টাকা। এছাড়া, ইমুন্যাসেসারী এ্যনালাইজার মেশীন টেন্ডারে ক্রয়মূল্য ধরা হয়েছে এক কোটি টাকা । যার প্রকৃত বাজার মূল্য ২০ লাখ টাকা। বায়োকেমিষ্ট্রি এ্যনালাইজার মেশীন টেন্ডারে ক্রয়মূল্য ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকা । অথচ এর প্রকৃত বাজার মূল্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। ডায়াথারমি মেশিন টেন্ডারে ক্রয়মূল্য ধরা হয়েছে ২৫ লাখ টাকা । অথচ এর প্রকৃত বাজার মূল্য হচ্ছে ১০ লাখ টাকা। ভিডিও এ্যনডোসকপি মেশিন টেন্ডারে ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে এক কোটি ৩৭ লাখ টাকা। যার প্রকৃত বাজার মূল্য মাত্র ৩৫ লাখ টাকা। আলট্রাসাউন্ড মেশিন ফর ফিজিওথেরাপির টেন্ডারে ক্রয়মূল্য ধরা হয়েছে ১৪ লাখ ৬৬ হাজার ৫০০ টাকা। যার প্রকৃত বাজার মূল্য ৪ লাখ টাকা। শর্ট ওয়েভ মেশিন ফর ফিজিওথেরাপি এর টেন্ডারে ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে ৬১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। যার প্রকৃত বাজার মূল্য ১২ লাখ টাকা। বায়োলজিক্যাল মাইক্রোস্কপ এর টেন্ডারে ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে এক লাখ ৫৫ হাজার টাকা। এর প্রকৃত বাজার মূল্য ৫৫ হাজার টাকা। ইলেক্ট্রোরাইট এ্যনালাইজার মেশিনের টেন্ডারের ক্রয়মূল্য ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। এর প্রকৃত বাজার মূল্য হচ্ছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এই টেন্ডারে সীমাহীন জালিয়াতীর মাধ্যমে মোট ৩ কোটি ২৪ লাখ ৮৯ হাজার ৫শ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আল আরাফাহ ইন্টারন্যাশনালসহ মেডিকেলের যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে রংপুর মেডিকেল কলেজে সরবরাহকৃত যন্ত্রপাতিগুলোর কোম্পানী ও মডেল নম্বর অনুযায়ী প্রকৃত মূল্য জানা গেছে। রংপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডাক্তার মুহাম্মদ নূর ইসলাম তদন্তের বিষয়টি স্বীকার করে জানান, তদন্ত কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়োগকৃত কন্ডাক্টিং অফিসার অধ্যাপক ডাক্তার কান্তা রায় রিমি প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত সরবরাহ করতে তাকে লিখিতভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, রমেক ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের ইকুইপমেন্ট অ্যান্ড আদারস ইন্সট্রুমেন্ট, কেমিকেল অ্যান্ড রিএজেন্ট (এমএসআর) ও ইন্সট্রুমেন্ট ক্রয়ের লক্ষ্যে একটি দরপত্র কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে সচেতন নাগরিক সমাজের সভাপতি অধ্যাপক এ.কে.এম হাবিবুল্লাহ স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ করেন। এরই প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদফতর গত ২৬ মে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডাক্তার কান্তা রায় রিমিকে কন্ডাক্টিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে। অধ্যাপক ডাক্তার কান্তা রায় রিমি জানান, রংপুর মেডিকেল কলেজের তৎকালীন দরপত্র কমিটির বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করার জন্য কন্ডাক্টিং অফিসার হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের র্নিদেশে দরপত্র কমিটির কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে। রমেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডাক্তার নূর ইসলাম জানান, নিয়ম মেনে টেন্ডারের মাধ্যমে উপকরণ কেনা হয়েছে। টেন্ডার কমিটির পক্ষ থেকে কোনো দুর্নীতি করা হয়নি। একটি ২ টন এসির মূল্য কিভাবে ২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা হয় এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গিয়ে অধ্যক্ষ বলেন, টেন্ডারের আগে মূল্য যাচাই কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তারা বাজার দেখে মূল্য নির্ধারণ করেছে। তিনি বলেন, বিগত দিনের চেয়ে তার সময়ে মেডিকেল কলেজে সবচেয়ে বেশি উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য নানা তৎপরতা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, দরপত্র কমিটির কাছে যেসব কাগজ চাওয়া হয়েছে তা দ্রুত কন্ডাক্টিং অফিসারকে সরবরাহ করা হবে। মূল্য যাচাই কমিটির আহবায়ক ডাক্তার হৃদয় রঞ্জন রায় জানান, রংপুর এবং ঢাকার বাজার যাচাই করে তারা যন্ত্রপাতিগুলোর প্রকৃত সম্ভাব্য মূল্য নির্ধারণ করে টেন্ডার কমিটির কাছে জমা দিয়েছেন। কিন্তু, তাঁদের প্রদত্ত ক্রয় মূল্য আর টেন্ডারের ক্রয় মূল্য এক কি-না সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তবে, তিনি স্বীকার করেন, ২ টন ক্ষমতা সম্পন্ন এসির মূল্য ২ লাখ ৬৪ হাজার হওয়ার কথা নয়। টেন্ডার কমিটির সদস্য রংপুরের সিভিল সার্জন ডাক্তার জাকিরুল ইসলাম লেলিন জানান, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবের কারণে তিনি সেখানে যাননি। টেন্ডার কমিটির অপর একজন সদস্য জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি সহকারী কমিশনার অতীশ দশী চাকমাকে টেন্ডার সম্পর্কে কোন কিছু না জানানোর কারণে তিনি কোন কাগজ-পত্রে স্বাক্ষর করেন নি। তিনি জানান, বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবগত করলে জেলা প্রশাসক টেন্ডার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়ে রমেক অধ্যক্ষকে চিঠি দেন। কিন্তু, অধ্যক্ষ তার চিঠির কোন জবাব দেন নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রমেক এর একজন শিক্ষক জানান, এ টেন্ডারে এমন কিছু যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে যা মেডিকেল কলেজে প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ওসব যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। তাছাড়া, যে ডিপার্টমেন্টের যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে সেই ডিপার্টমেন্টের কোন শিক্ষককে কমিটিতে রাখা হয়নি। আবার, ভিন্ন ডিপার্টমেন্টের একজন শিক্ষককে ৩ টি কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে রাখা হয়েছে। রমেক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ইকুইপমেন্ট অ্যান্ড আদারস ইন্সট্রুমেন্ট ক্রয়ের লক্ষ্যে গঠিত সাত সদস্য বিশিষ্ট দরপত্র কমিটির সভাপতি ছিলেন রমেক অধ্যক্ষ। ২০১৮ সালের ৮ই এপ্রিল ঐ টেন্ডার কমিটি গঠন করে দরপত্র আহবান করা হয়। এর পর ৫ই মে টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং ৭ই জুন টেন্ডার খোলা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ