ঢাকা, শনিবার 22 June 2019, ৮ আষাঢ় ১৪২৬, ১৮ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ছয় বছরের শিশুর বই হার্ভাডে

মতিন খান, নিউ ইয়র্ক : সুবর্ণ আইজ্যাক বারী ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট ওবামার কাছ থেকে স্বীকৃতি পেয়েছেন। গত বছর স্বীকৃতি পেয়েছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট থেকে। ৬ বছর বয়সে লিখেছেন বিশ্ব জাগানো বই, “দ্য লাভ”। এরই মধ্যে, তার বই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্রি হচ্ছে বিশ্বের ৮০টির বেশি দেশে। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বইটি এখন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্রি হচ্ছে! “দ্য লাভ” পড়ে আপ্লুত হয়ে অনেকে তাকে চিঠি লেখেছেন। এমনকি বিশ্বের সেরা লেখক খালেদ হোসাইনি নিজ হাতে চিঠি লেখেছেন সুবর্ণের কাছে।
প্রিয় সুবর্ণ,
তোমার জন্য আমি খুবই গর্বিত। তোমার বই, দ্য লাভ, পড়ে আমি আপ্লুত। আমি আশা করছি যে, এই বই টেররিজম মুক্ত বিশ্ব গড়তে সকলকে উদ্যমী করবে। চিঠির সাথে তোমার অসাধারণ বই, দ্য লাভের জন্য ছোট্ট একটি গিফট, সি প্রেয়ার, পাঠালাম। এই বইটি দ্য কাইট রানার, অ্যা থাউজেন্ড স্পেনডিড সান এবং দ্য মাউন্টেন ইকোড থেকে আলাদা। আশা করি উপভোগ করবে। আমি তোমার সাথে দেখা করার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকলাম।
শুভ কামনায়, খালেদ
গত মাসে ওয়াশিংটন ডিসিতে শত শত বাঙালি উঠে দাঁড়ালেন যখন “দ্য লাভ” বুক ট্যুরে ৬ বছর বয়সী সুবর্ণ বললেন, “আল্লাহু আকবর শব্দটিকে টেররিস্টরা হাইজ্যাক করেছে” সুবর্ণ এগারটি ঘটনার ওপর ভিত্তি করে দ্য লাভ বইটি লেখেছেন! যার থেকে দুটি ঘটনা তাকে “দ্য লাভ” আন্দোলন শুরু করতে অনুপ্রাণিত করেছিল! (১) তিনি ২০১৬ সালে ফোর্থ অব জুলাইয়ের প্রাক্কালে আমেরিকার জন্য প্রার্থনা করার জন্য ইমামকে জিজ্ঞেস করে প্রত্যাখ্যিত হন! এই ঘটনার ওপর ভিত্তি করে, হাফিংটন পোস্টের সহযোগিতায় “I’m Muslim & I Love America” ফিল্মটি তৈরি করা হয়েছিল! (২) ২০১৬ সালে ক্রিসমাসের আগের দিন তিনি একটি মানুষকে বার বার বড়দিনকে অসম্মান করতে দেখেন! এই ঘটনার ওপর ভিত্তি করে হাফিংটন পোস্টের সহযোগিতায় “I’m Muslim & I Love Christmas/” ফিল্মটি তৈরি করেন উদয় বাঙালি!
এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলো তাকে “দ্য লাভ” নামে একটি সন্ত্রাস বিরোধী আন্দোলন শুরু করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার মানুষ তার বিপ্লবে যোগ দেয়। এমনকি বাংলাদেশের বেশিরভাগ ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা তার বিপ্লবের সাথে যোগ দেয়। বিপ্লব গতি অর্জন করে যখন দুইজন মুসলিম ছাত্রী, ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাদিয়ান লিমা এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারজানা মার্জিয়া, ঢাকার রাস্তায় সুবর্ণের জন্য পোস্টার হাতে দাড়িয়ে থাকেন। পোস্টারের মধ্যে সুবর্ণের দর্শন লেখাছিল :
“একজন মুসলমান হিসেবে আমি ইসলামকে ভালবাসি। কিন্তু আমি হিন্দু, বৌদ্ধ, ইহুদী, এবং খ্রিস্টান ধর্মকেও ভালোবাসি। আমি ঈদ উদযাপন করি। কিন্তু আমি দুর্গাপূজা, মধুপূর্ণিমা, রোশ হাসানা, ক্রিসমাস উদযাপন করতে ভালোবাসি। চলুন ভালোবাসা দিয়ে সন্ত্রাসবাদকে পরাস্ত করি।”
ব্রঙ্কস কলেজ প্রেসিডেন্ট ড. টমাস সেকেনেগি দ্যা লাভ বইয়ের ইন্ট্রোডাকশন লেখার কারণ তিনি আশা করেন বইটি সন্ত্রাসবিরোধী একটি বিশ্ব তৈরি করবে। আমাদের সমাজে প্রায়ই সুবর্ণের মতো শিশুদের ধারণাগুলো উপেক্ষা করা হয়। তবে, প্রেসিডেন্ট টমাস সেকেনেগি সুবর্ণের ইন্টারভিউ নেয়ার পর সুবর্ণের প্রতিভা উপেক্ষা করতে অস্বীকার করেন:
“আমি সুবর্ণ আইজ্যাকের বই “দ্য লাভ, এর জন্য এই ফরওয়ার্ডটি লিখতে পেরে আনন্দিত। সুবর্ণের সাক্ষাৎকারগ্রহণ করার সময় তিনি বললেন কিভাবে ভালোবাসার মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদসহ সমস্ত সমস্যা সমাধান করা সম্ভব! সুবর্ণ একটি শিশু! আমি ছয় বছর বয়সী শিশুর মনের শক্তি দেখে আনন্দিত হয়েছি! আশায় ভরেছে মন!  যেখানে আমরা প্রাপ্তবয়স্করা নিজেদের ধর্ম এবং জাতির ওপর ভিত্তি করে আলাদা করার চেষ্টা করি, সেখানে শিশুটি বলছে মানবতা ‘ধর্ম এবং জাতীয়তা’ থেকে অনেক বড়! সে বলছে ধর্ম এবং জাতীয়তা থেকে ভালোবাসা বড়!
২৮ এপ্রিল, ২০১৯ রাত ৯ টায় নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস-এর খাবার বারি রেস্টুরেন্টের সামনে “দ্য লাভ” প্রমোট করার সময় একদল চরমপন্থী তাকে আক্রমণ করেছিল। আক্রমণের সময় এরা বলছিল সুবর্ণ মুসলিম হতে পারে না কারণ তার নাম আইজ্যাক! তারা আরও বলল “এই নাম থেকে ইহুদি ও খ্রিস্টানের গন্ধ আসে”। এসময় একজন চরমপন্থী তার সিগারেট থেকে সুবর্ণের দিকে ধোঁয়া ছেড়ে সুবর্ণকে সেকেন্ডারি ধোঁয়া নিতে বাধ্য করেছিল। জ্যাকসন হাইটসে তার ওপর টেররিস্ট হামলার পরদিন তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইয়র্ক কলেজ গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. লিন্ডা গনজালেজ! যখন ড. গনজালেজ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কেন ৬ বছর বয়সী একজন শিশু সন্ত্রাসবাদের ওপর একটি বই লেখল?” সুবর্ণ বলেন, এটি ছিল ৭ জানুয়ারি, ২০১৫। আমি সাক্ষাৎকার দিতে ভয়েস অব আমেরিকা থেকে আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম (তখন আমার বয়স ছিল ২ বছর )।
যাই হোক, যখন নিরাপত্তা রক্ষী স্মিথসানিয়ান বিল্ডিং এ আমার দেহ পরীক্ষা শুরু করে, তখন আমি বুঝতে পারলাম খারাপ কিছু ঘটেছে। আমি টেলিভিশনে দেখলাম যে দুইজন মুসলিম ফ্রান্সের চার্লি হেবডো সংবাদপত্র অফিসে যান এবং আল্লাহ আকবর চিৎকার করে সব সাংবাদিককে হত্যা করে। সেদিন দুপুরে আমি যখন সাবরিনাকে  সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলাম, তখন তাকে বলেছিলাম যে, সন্ত্রাসবাদ দূর করার জন্য কিছু করবো। ড. লিন্ডা গনজালেজকে সুবর্ণ আরও বললেন চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে তিনি পুলিশের মামলা দায়ের করবেন না কারণ তিনি যদি মামলা দায়ের করেন হতে পারে পুলিশ আমেরিকা থেকে হামলাকারিদের ডিপোর্ট করতে পারে।
উল্লেখ্য, টেররিস্ট হামলার সময় সুবর্ণ থরথরে আঙ্গুল দিয়ে হৃদয় চিহ্ন তৈরি করে ধরে রেখেছিলো চরমপন্থীদের উদ্দেশে!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ