ঢাকা, শনিবার 22 June 2019, ৮ আষাঢ় ১৪২৬, ১৮ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

প্রসঙ্গ : কর্মমুখী শিক্ষা

জীবন বিচিত্র অভিজ্ঞতার সমিষ্টি। মানুষের জীবনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে আমরা সেখান থেকে অনেকগুলো ধারণা পেতে পারি,যা আমাদের  সিদ্ধান্ত গ্রহণে এবং নিজেদের  বিকাশের ক্ষেত্রে প্রভাব রাখতে পারে। অনেক সময় বুঝে উঠতে পারি না আমাদের  কোন সিদ্ধান্ত নিতে হবে কিংবা আমাদের নিজেদের বিকাশের জন্য কোন বিষয়গুলো গ্রহণ করতে হবে।এর কারণ হল ভুল সিদ্ধান্ত ও নেতিবাচক বিষয় গ্রহণ আমাদের জীবনের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিয়ে একটি নিদিষ্ট গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে রাখতে পারে। জ্যাকমার কথা আমরা সবাই জানি তিনি একজন চীনা উদ্যোক্তা এবং জনপ্রিয় ই-কমার্স সাইট আলি বাবা ডটকমের ফাউন্ডার। তরুণ উদ্যোক্তাদের অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে সারা পৃথিবীতে তিনি সমাদৃত হয়েছেন। ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী বর্তমান বিশ্বের ২৬তম ধনী তিনি। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ ২৭ বিলিয়ন ডলারের ওপর। খুব চমৎকার একটা কথা তিনি বলেছেন,যার একটি গভীর অর্থ আছে। কথাটা এমন:আপনি যদি বানরের সামনে একটি ১০০ ডলারের নোট এবং একটি কলা ফেলে দিন, তাহলে বানরটি কলাটিকে বেছে নেবে, কারণ বানর জানে না যে ডলার দিয়ে আরও অনেক বেশী কলা কেনা যায়। ঠিক তেমনিভাবে আমাদের যুব সমাজের সামনে চাকরি আর ব্যবসাকে বেছে নিতে বলা হলে, তারা চাকরিকে বেছে নেয়। কারণ তারা বুঝতে পারে না যে,ব্যবসার মাধ্যমে আরও অনেক চাকরি দেয়া যায়। এমনটি কি আমাদের তরুণরা ভাবছে ? কিংবা তাদের এমন করে ভাবার  মতো পরিবেশ কি আমরা তৈরি করতে পারছি ?
তরুণরা চাকরির পিছে হন্যে হয়ে ছুটছে। বেসরকারি চাকরির চেয়ে সরকারি চাকরিতেই তরুণদের বেশী ঝোঁক। কারণ সরকারি চাকরিতে জব সিকিউরিটি বেশী। পেনশনসহ নানা সুযোগ সুবিধা রয়েছে বলে এই দৃষ্টিতে গ্রহণ করে। সরকারি চাকুরিতে দুর্নীতি করার সুযোগ আছে। কাজে ফাঁকি দেয়ার সুযোগ আছে। গতানুগতিকভাবে কাজ করার প্রবনতা আছে। সরকারি জব যারা করছেন,তাদের মধ্যে এ ধরণের নেতিবাচক  প্রবনতাগুলো ব্যক্তি স্বার্থ প্রাধান্য পেলেও দেশের স্বার্থপ্রাধান্য পাচ্ছে না। তাছাড়া একই ধরণের কাজ বছরের পর বছর করার পর চিন্তাশক্তি মেধা শক্তির অপচয় ঘটছে। এর ফলে সরকারি চাকুরিজীবীদের মধ্যে নতুন ও পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ নেয়ার ক্ষেত্রে নেতিবাচক মনোভাব গড়ে উঠেছে। জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে না উঠায় সরকারি চাকুরিজীবীদের মধ্যে বিভিন্ন অনিয়ম জায়গা করে নিচ্ছে। তবে বেতন কাঠামোতে গুণগত পরিবর্তন সরকারি চাকুরিজীবীদের  ওপর গুণগত পরিবর্তন সরকারি চাকুরিজীবীদের  ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক যাই হোক না কেন, তরুণদের মধ্যে সরকারি চাকরির আর্কষণ দিন দিন বাড়ছে।
কিন্তু সমস্যা হল ২০১৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী,সরকারি চাকুরিজীবীদের সংখ্যা ২১ লাখ। এ সময়ে এসে এ সংখ্যা বাড়লেও যে পরিমাণ তরুণরা সরকারি চাকরি  চাইলেও তা পাচ্ছে না। সরকারি চাকরির বিকল্প হিসেবে তরুণরা বেসরকারি চাকুরি বেছে নিচ্ছে। বেসরকারিভাবে চ্যালেঞ্জ  নেওয়ার বিভিন্ন বিকল্প সুযোগ রয়েছে। সরকারি চাকরিতে যে কর্মঘন্টা বেঁধে দেয়া হয়েছে,বেসরকারি চাকরিতে অনেক ক্ষেত্রেই তা অনুসরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।ফলে একজন চাকুরিজীবী তার সন্তানদেরকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে পান। এতে করে সামাজিক পারিবারিক বন্ধনের যে প্রাণ শক্তি ও প্রণোদনা, তা একজন বেসরকারি চাকরিজীবীর মধ্যে থাকে না। সন্তানদের সঙ্গে চাকরিজীবীর বাবা মায়ের দুরত্ব সৃষ্টি হয়, যা দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের সামাজিক ও মানবিক কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
 পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে তরুণদের কাছে বেসরকারি চাকরি সরকারি চাকরির চেয়ে বেশী মর্যাদা পূর্ণ হলে ও আমাদের  দেশে এ ধরণের সংস্কৃতি এখন ও গড়ে উঠেনি। এর প্রধান একটি কারণ হল বেসরকারি চাকুরির ক্ষেত্রে জব সিকিউরিটি না থাকা। বেসরকারি চাকরির কাজের পরিমাণ অনেক বেশী হলেও সরকারি চাকরিজীবীদের মতো এখানে কোন বেতন স্কেল গড়ে উঠেনি বা অনুসরণ করা হয় না। আমার দেশের তরুণরা অনেক ঝুঁকি নিয়ে বেসরকারি চাকরি করলে ও বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে সরকারি চাকুরিজীবীদের  মতো পেনশনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা তাদের সরকারি বেতন স্কেলের সামঞ্জস্য রেখে বেসরকারি চাকুরিজীবীদের বেতন স্কেল ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা আইনগতভাবে নির্ধারণ করে দিলে সরকারি জবের উপর চাপ কমবে। সরকারি চাকুরিজীবীদের যখন বেতন বাড়ানো হবে তখন বেসরকারি চাকুরিজীবীদের বেতন বাড়াতে হবে।  তা না হলে অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হবে। যা এক ধরণের মানবিক বৈষম্যেরও প্রতীক বেসরকারি চাকরির অভিজ্ঞতাকে সরকারিভাবে বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে কাজের গুনগত মানের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে । গবেষণায় উঠে এসেছে, বেসরকারি জব একটি দেশের অর্থনীতিতে সরকারি চাকরির চেয়ে বেশী ভূমিকা রাখতে পারে। বেসরকারি জব আরো জব সৃষ্টি করে এবং অর্থনীতির বাজারকে সম্প্রসারিত করে। এখন সময় এসেছে বেসরকারি জবের সংখ্যা কম বা বেশী হতে পারে। কেবল সরকারি বেসরকারি জবের ওপর তরুণদের নির্ভর হলে চলবে না, নিজেদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ চালাতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় তরুণরা উদ্যোক্তা হলে যেভাবে তাদের লক্ষ্যকে অর্জন করার চিন্তা  করছে  সেটি সেভাবে অর্জিত হবে কিনা আশঙ্কা থেকে যাবে। এর ফলে তরুণরা উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও এক সময় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে আমাদের তরুণরা তা জানে না কিভাবে নিজেদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হয়। একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য কি কি পদক্ষেপ ও কৌশল গ্রহণ করতে হবে এ বিষয়ে আমাদের তরুণদের ধারণা নেই। এ জন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠার জন্য যে বিষয়গুলো তরুণদের আগামী দিনে  সহায়ক হতে পারে,তা পাঠ্যক্রমে সহজ ও ধারাবাহিকভাবে শেখানোর উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের জাতীয় বাজেটের বড় অংশ তরুণ উদ্যোক্তা তৈরীর কাজে বিনিয়োগ করতে হবে। এই বিনিয়োগকে ভর্তুকি হিসেবে বিবেচনা করে বিনাশর্তে ও সুদে তরুণদের ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। এই ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে তরুণরা যাতে জটিলতার সম্মুখীন না হয় সেটিও নিশ্চিত করা দরকার। স্বল্প বিনিয়োগে বিভিন্ন ধরণের বাণিজ্যিক পণ্য তৈরী করে সেগুলো কিভাবে দেশীয় বাজারে ও বিদেশে রপ্তানি করা যায় সে বিষয় তরুণদের ট্রেনিং ও ডেভেলপমেন্টের ব্যবস্থা গ্রহণ  করা যেতে পারে।আমাদের দেশে বিভিন্ন ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্ক গড়ে উঠেছে। তরুণরা যাতে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে নিজেরাই উদ্যোক্তা হিসেবে বিনিয়োগ করতে পারে। সে বিষয়ে সরকারকে এখন থেকে ভাবতে হবে। বিশাল সমুদ্র সীমা জয় করার পর আমরা ব্লু ইকোনমির মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা ভাবছি।  ব্লু ইকোনমির সঙ্গে তরুণদের কিভাবে সম্পৃক্ত করে তাদের অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভরশীল করা যায় সে বিষয়ে পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। গ্রামীণ অর্থনীতিকে বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে তরুণদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করার কৌশল গ্রহণ করতে হবে।তরুণদের গবেষণা ও সৃজনশীল কাজে অনুপ্রাণিত করার মাধ্যমে  তাদের নিজেদের কাজের ক্ষেত্র যাতে তারা নিজেরাই তৈরী করতে পারে সে বিষয় জাতীয় নীতিমালা গ্রহণ করা যেতে পারে। আমাদের দেশ মাত্র কয়েকটি শিল্পপণ্য উৎপাদন করছে। কিন্তু এগুলো যথেষ্ট নয়। এর বাইরে পৃথিবীর বিভিন্ন অর্থনৈতিক শক্তিধর রাষ্ট্র অঞ্চলে যে শিল্পপণ্যগুলো বিশ্ববাজারে চাহিদা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে সে ধরণের শিল্পপণ্য আমাদের দেশে ও তরুণ উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে তৈরীর উদ্যোগ নিতে হবে। যাতে করে এ পণ্যগুলো রফতানিযোগ্য পণ্য হিসেবে দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারে ।
 সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশ চীন, জাপান, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া যেভাবে তাদের অর্থনেতিক উন্নয়নের সঙ্গে তরুণদে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনাও কৌশল গ্রহণ করেছে,তার ইতিবাচক কৌশলগুলো আমাদের দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে প্রয়োগ করা যেতে পারে।আমাদের তরুন উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রধান বাধা গতানুগতিক জটিল প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বিরূপ পরিবেশ ও অভিজ্ঞতা এবং র্দুনীতি। এসব প্রতিবন্ধকতা আমরা কিভাবে দূর করে আমরা তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে পারি সে বিষয়ে ভাবতে হবে। কারণ তরুণ উদ্যোক্তা তৈরী হলে তাদের মাধ্যমে অনেক  তরুণের কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হবে। দেশের বেকারত্ব দূর হবে, অলস শক্তি শ্রমশক্তিতে রূপান্তরিত হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কারিগরি শিক্ষাকে  প্রাধান্য দিয়ে আমরা তরুণদের আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। আমাদের তরুণরাই আমাদের আগামী দিনের স্বপ্ন ও বিশ্বাস। তারাই আগামী দিনের সম্ভাবনা। এখন দরকার পরিকল্পিত কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা তৈরি করে তরুণদের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেয়া। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বেকারত্বের হার বাংলাদেশে বেশী। ২০১০ সালের পর  থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বেকারত্বের হার শ্রীলঙ্কা ও ভুটান এ হার কমিয়ে এনেছে। ভারতে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে বেড়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তানও নেপাল।
এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১৪ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ছিল ৪দশমিক ৪ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে বেকারের সর্বোচ্চ হারের দিক থেকে বাংলাদেশ তৃতীয় অবস্থানে। বিশ্বব্যাপি বেকার মানুষের সংখ্যা ১৯ কোটি ২০ লাখ। আইএলওর হিসাবে ২০১০ সালে বাংলাদেশে ২০ লাখ লোক বেকার ছিল। ২০১২ সালে ছিল ২৪ লাখ। ২০১৬ সালে ২৮ লাখ উঠে এসেছে। ২০১৯ সালে এ সংখ্যা ৩০ লাখে ছাড়িয়ে গেছে।
-এইচ এম আব্দুর রহিম

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ