ঢাকা, সোমবার 24 June 2019, ১০ আষাঢ় ১৪২৬, ২০ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মার্কিন-ইরান যুদ্ধ কি অনিবার্য?

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা : ওমান উপসাগরে দু’টি তেলের ট্যাংকারে হামলার ঘটনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধের মহড়া শুরু হয়েছে। এই হামলায় ইরান জড়িত থাকার প্রাথমিক গোয়েন্দা তথ্য দেয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে সঙ্কট আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ওই তথ্য প্রমাণ করে যে, গত ১৩ জুনের হামলায় জড়িত ছিল ইরান। ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, এতেই বেশ পরিষ্কার প্রমাণ রয়েছে। যা চিরবিবদমান দেশ দু’টির মধ্যে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কেমন হতে যাচ্ছে পরবর্তী পরিস্থিতি? যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে ? কিংবা কতটা মারাত্মক হতে পারে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের পূর্ণ-মাত্রার বিমান ও নৌ সংঘর্ষ? এ বিষয়গুলো বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করেছেন কুটনৈতিক মহল।  পেন্টাগনের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, ২০ জুন হামলার শিকার তেল ট্যাংকার দু’টির একটি থেকে অবিস্ফোরিত একটি লিমপেট মাইন সরিয়ে নিচ্ছে ইরানি একটি ছোট রণতরীর ক্রুরা। যাকে এই যুদ্ধে প্রকৃত ঘটনা প্রতিষ্ঠার প্রথম শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। অবশ্য গত মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে জাহাজে চারটি লিমপেট মাইন হামলার মতোই শুরু থেকেই এ ঘটনার সাথেও সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে ইরান। তবে দুটো ঘটনার জন্যই তেহরানকে দোষারোপ করছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে শঙ্কা দেখা দিয়েছে যে, এই বাকযুদ্ধ শেষ মেষ সংঘাতে রূপও নিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও দ্রুত ও স্পষ্টভাবেই ইরানের দিকে আঙুল তুলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এই মূল্যায়ন’ গোয়েন্দা তথ্য, ব্যবহৃত অস্ত্র, অভিযান পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সক্ষমতা, সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজে ইরানের হামলা এবং যেহেতু ওই এলাকায় থাকা কোন প্রক্সি গ্রুপের এ ধরণের সূক্ষ্ম অভিযান পরিচালনার মতো সক্ষমতা না থাকার ভিত্তিতে করা হয়েছে। এ অভিযোগ দ্রুতই নাকচ করেছে ইরান। উল্টো এই ঘটনা সাজানো উল্লেখ করে পাল্টা দোষারোপ করেছে দেশটি। ইরানের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘কেউ’ ইরানের সাথে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পর্ক খারাপ করতে চাইছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘অনেক বড় ভুল করলো ইরান।’ এক টুইটার পোস্টে এমন মন্তব্য করেছেন তিনি। কোন বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এ কথা বলেছেন, সেটি টুইটার পোস্টে উল্লেখ করা না হলেও বোঝা যায় যে, ইরান কর্তৃক মার্কিন ড্রোন গুলি করে নামানোর ঘটনাকেই তিনি বোঝাতে চেয়েছেন এর মধ্যেমে।
গত ২০ জুন বাংলাদেশ সময় রাত ৮টার কিছু পরে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার অফিশিয়াল টুইটার অ্যাকউন্ট থেকে ছোট একটি টুইট করেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘অনেক বড় ভুল করলো ইরান।’ আগে পরে আর কিছুই লেখা হয়নি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিয়মিতই টুইটার ব্যবহার করেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি টুইটারে নিজের মতামত তুলে ধরেন।
ট্রাম্পের এই টুইটার পোস্টের কয়েক ঘণ্টা আগে খবর আসে যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা ড্রোন ভূপাতিত করেছে ইরান। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের আকাশ সীমায় প্রবেশ করার পর ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ড্রোনটিকে ভূপাতিত করা হয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ড্রোনটি আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় ছিলো।
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগর উপকূলের হরমুজগান প্রদেশে ড্রোনটি ভূপাতিত করা হয় বলে জানায় ইরান। খবরে বলা হয়, ইরানের ভূখন্ডে অনুপ্রবেশের সময় আমেরিকান গুপ্তচর ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। হরমুজগান প্রদেশের কুহ মুবারক এলাকা দিয়ে ওড়ার সময় এটি ভূপাতিত করা হয়।
তেলে ট্যাংকারে হামলা ও ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনায় মার্কিন-ইরান যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা শুরু হলেও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছেন, ইরানের যুদ্ধে জড়াতে চায় না তার দেশ। তিনি বলেছেন, ইরানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে যুক্তরাষ্ট্র এবং আরব অঞ্চলে কোনও ধরনের আগ্রাসন ঠেকাতে কাজ করে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ম্যাকডিল এয়ারফোর্স ঘাঁটিতে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন পম্পেও। এসময় তিনি ইরানকে ‘আগ্রাসন’ চালানোর জন্য অভিযুক্ত করেন। পম্পেও বলেন, মার্কিন স্বার্থ রক্ষার জন্য  মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা সেনা মোতায়েন করেছে। তিনি দাবি করেন, আমরা অনেক বার্তা আদান-প্রদান করেছি, এমনকি এই মুহূর্তেও আমরা ইরানকে বলেছি যে, আমরা আগ্রাসন মোকাবেলার জন্য মধ্যপ্রাচ্য রয়েছি। সিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধ চান না-আমরা সে বার্তা দেয়া অব্যাহত রাখবো। তবে ওই এলাকায় মার্কিন স্বার্থ রক্ষার জন্য আমরা সবকিছু করবো। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্টও বলেছেন, তিনি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চান না।
এদিকে ইরানের ইসলামিক রিপাবলিকান গার্ড (আইআরজিসি) গোয়েন্দা কাজে ব্যবহৃত একটি মার্কিন ড্রোন গত ১৯ জুন গুলি করে ভূপাতিত করেছে জানা গেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমুজগান প্রদেশ ইরানের সেনাবাহিনী আরকিউ-৪ লেখা একটি মার্কিন ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে। আইআরজিসি’র জনসংযোগ বিভাগের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানের আকাশসীমায় অনুপ্রবেশকারী যেকোনো শত্রু বিমান বা ড্রোন গুলি করে নামানোর যে নির্দেশ রয়েছে তা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। মূলত মার্কিন সেনারা এমন সময় ইরানে গোয়েন্দা ড্রোন পাঠাল যখন তাদের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ইরানকে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিচ্ছেন। ট্রাম্পের আলোচনার প্রস্তাব পত্রপাঠ নাকচ করে দিয়েছে ইরান। সম্প্রতি ইরানের পার্লামেন্ট মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন বাহিনী ‘সেন্টকম’কে ‘সন্ত্রাসী বাহিনী’অভিহিত করে প্রস্তাব পাস করেছে এবং ওই প্রস্তাবের জের ধরে তেহরান এই অঞ্চলে মোতায়েন সব মার্কিন সেনাকে সন্ত্রাসী সেনা বলে মনে করে।
ওমান উপসাগরে গত সপ্তাহে দুটো তেলের ট্যাংকারে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে যেভাবে উত্তেজনা বাড়ছে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এই দু’টো ঘটনার ওপর নতুন কিছু ছবি প্রকাশ করে বলছে, ইরান যে ঐ দুটো হামলার পেছনে ছিল এসব ছবি তার অকাট্য প্রমাণ। ইরান অবশ্য বলছে, এসব হামলার কিছুই তারা জানেনা। দুই বৈরি দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরে বাড়তি সৈন্য পাঠিয়েছে।
আর বিপজ্জনক এই উত্তেজনা প্রশসনে এই দুই দেশের প্রতি সারা বিশ্ব থেকে আহ্বান জানানো হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তেলের ট্যাংকার দুটোতে হামলার হোতা যে ইরান, তার প্রমাণ সর্বত্র।
সম্প্রতি পেন্টাগন থেকে নতুন কিছু রঙ্গিন ছবি প্রকাশ করা হয়েছে যাতে দেখা যাচ্ছে জাপানী-পতাকাবাহী ট্যাংকারের খোলে বিরাট একটি ফুটো, যারা পাশে অবিস্ফোরিত একটি মাইনের কিছু অংশ। আরেকটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ইরানের রেভল্যুশনারী গার্ড বাহিনীর সদস্যরা অবিস্ফোরিত একটি মাইন সরিয়ে নিচ্ছে।
ইরান মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার কথা স্বীকার করলেও ট্যাংকারে হামলায় তাদের ভূমিকার অভিযোগ পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলেছে, আমেরিকার এসব দাবি বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত্। এ বিষয়ে ইরানী প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন, ইরানকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করতে ব্যর্থ হয়েছে আমেরিকা। ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভিতে এক ভাষণে তিনি বলেন, আমেরিকার মূল লক্ষ্য ইরানকে একঘরে করা।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গলা মিলিয়ে ট্যাংকারে হামলার জন্য ইরানকে দায়ি করেছে ব্রিটেন। তবে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট দুপক্ষকে উত্তেজনা প্রশমনে অনুরোধ করেছেন। হান্ট বলেছেন, আমরা আমাদের নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করেছি। কী ঘটেছে তার ভিডিও আমরা দেখেছি। প্রমাণ দেখেছি। আমরা বিশ্বাস করিনা (ইরান ছাড়া) অন্য আর কেউ এ কাজ করতে পারে। এই বিরোধের দুটো পক্ষই মনে করে অন্যপক্ষ যুদ্ধ চায়না। আমরা দু পক্ষকেই উত্তেজনা প্রশমনের জন্য অনুরোধ করছি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ট্যাংকারে হামলা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য জাতিসংঘকে অনুরোধ করেছেন। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেইকো মাস বলেন, আমরা মার্কিন এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের বক্তব্য জানি। তারা যা বলছেন তাতে আপনি প্রায় নিশ্চিত হতে পারেন যে এটা ইরানের কাজ। ফিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেক্কা হাভিসো বলেছেন, অকাট্য প্রমাণ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবেনা।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করে যুদ্ধের উস্কানি না দেওয়ার জন্য আমেরিকাকে আহ্বান জানিয়েছে রাশিয়া। রুশ ডেপুটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিবকভ বলেন, আমরা বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, মনস্তাত্বিক এবং সেই সাথে সামরিক চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছে। অস্থিতিশীল এই অঞ্চলে এ ধরনের অবিবেচনা-প্রসূত কাজ থেকে বিরত থাকতে আমরা তাদের (যুক্তরাষ্ট্র) এবং ঐ অঞ্চলে তাদের মিত্রদের বারবার সাবধান করেছি। চীনও উপসাগরে সংযত আচরণের জন্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টির যে কৌশল, যুক্তরাষ্ট্রের উচিৎ তা পরিহার করা। একতরফা আচরণ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। এতে কোনো সমস্যার সমাধান তো হয়ইনা, বরঞ্চ আরো বড় সমস্যা তৈরি করে। অপরপক্ষে ট্যাংকারে হামলা বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। অবশ্য তিনি বলেন, সৌদি আরব কোনো যুদ্ধ চায়না। সৌদি এক পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমরা যুদ্ধ চাইনা কিন্তু আমাদের জনগণ, দেশ ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়লে, আমরা জবাব দিতে কুণ্ঠাবোধ করবো না।
ওমান উপসাগরে দু’টি তেলের ট্যাংকারে ১৩ জুন যে হামলা চালানো হয়েছিল, তার পেছনে কি আসলে ইরানেরই হাত ছিল ? বিষয়টি নিয়ে দেশ দু’টির বিতর্ক এখন বেশ তুঙ্গে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, তাদের কাছে এমন এক ভিডিও ফুটেজ আছে, যা প্রমাণ করে এটা ইরানের কাজ। তারা আরও দাবি করছে, এই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে ইরানের রেভ্যুলশনারি গার্ড ক্ষতিগ্রস্ত একটি তেলের ট্যাংকারের একপাশ থেকে একটি অবিস্ফোরিত মাইন বা বোমা সরিয়ে নিচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযোগ একেবারে উড়িয়ে দিয়েছে ইরান। মাত্র এক মাস আগে একই রকমের এক বিস্ফোরণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে উপসাগরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল আরও চারটি তেলের ট্যাংকার। সেবারও হামলার জন্য ইরানকে দায়ি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে এর পক্ষে কোন প্রমাণ তারা দেখাতে পারেনি।
যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে। তিনি ইরানের সঙ্গে করা পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেছেন। নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন ইরানের বিরুদ্ধে। কোন দেশ যেন ইরান থেকে তেল কিনতে না পারে, সেজন্যেও নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় গত ১৩ জুন দুটি তেলের ট্যাংকারে হামলার পর তেলের দাম চার শতাংশ বেড়ে গেছে।
মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আরলিংটনের মধ্যপ্রাচ্যের দিকেই যাওয়ার কথা ছিল পূর্বনির্ধারিত সময়সূচী অনুসারেই। কিন্তু ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক উত্তেজনার পটভূমিতে এখন এই জাহাজটি সেখানে অনেক আগেই পাঠানো হচ্ছে। এই জাহাজে উভচর সামরিক যান এবং যুদ্ধবিমান পরিবহন করা যায়। ঐ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র এর আগে আরও একটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন মাত্রই সুয়েজ খাল অতিক্রম করে উপসাগরীয় অঞ্চলের পথে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন সেখানে পেট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করতে চলেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্র আন্ত-মহাদেশীয়, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াও বিমান হামলা রুখতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর বলছে, তারা ইরানের সাথে সংঘাত চায়না, কিন্তু মার্কিন সৈন্যদের বিরুদ্ধে হুমকি মোকাবেলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ঠিক কী ধরণের হুমকির মুখোমুখি মার্কিন সৈন্যরা হয়েছে-তা খোলাসা করে বলা হচ্ছেনা। ইরাকে প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি মার্কিন সৈন্য মোতায়েন রয়েছে।
মূলত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে করা পরমাণু চুক্তি থেকে একতরফা-ভাবে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকেই দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলেও, চীন, রাশিয়া, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স এখনও ইরানের সাথে করা চুক্তি বজায় রেখেছে। বিবিসির প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিশ্লেষক জনাথন মার্কাস বলছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন চান ইরানের সাথে করা এই পরমাণু চুক্তি পুরোপুরি ভেস্তে যাক। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তার ফলে ইরানের অর্থনীতি দিনে দিনে সঙ্কটে নিমজ্জিত হচ্ছে। এই নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য যেন ইরান তাদের তেল অন্যদেশের কাছে বিক্রি করতে না পারে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের এই সমর প্রস্তুতিকে মোটেই ভালোভাবে নিচ্ছে না ইরান। তারা বলছে আমেরিকা ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ শুরু করেছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের এসব পদক্ষেপের পাল্টা হিসাবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবে বলে হুমকি দিয়েছে। বিশ্বে প্রতি বছর যত জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হয়, তার এক পঞ্চমাংশ সরবরাহ যায় এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে।
মূলত ওমানে তেলের টাংকারে হামলা ও ইরান কর্তৃক মার্কিন গোয়েন্দা  ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দৃশ্য যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রকাশ করলেও বাস্তবতা ভিন্নতর বলে জানা গেছে। এসব ঘটনার পর গত  ২০ জুন ইরানে পাল্টা আক্রমণের অনুমোদন দিলেও তারপর আবার পিছিয়ে গেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০ জুন মধ্যরাতের দিকে এই বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা। এরপর আরও বেশক’টি গণমাধ্যমও একই বিষয়ে খবর প্রকাশ করে।
হোয়াইট হাউজের কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তার বরাত দিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে ‘অল্প কয়েকটি’ টার্গেটের উপর এই হামলা করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। যার মধ্যে ইরানের রাডার ও মিসাইলের অবস্থানের কথা বলা হয়েছিল। এমনকি হামলার প্রাথমিক প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছিল বলে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়। তবে হামলার অনুমোদন দেয়ার পরপরই ট্রাম্প সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। গত ২০ জুন হরমুজ প্রণালীর ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় ইরান একটি মার্কিন ড্রোন গুলি করে ফেলে দিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। এর জবাব দিতেই এই হামলার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি নিজে এই হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছু বলেননি, তবে ড্রোনটি ভূপাতিত করা সম্পর্কে তিনি বেশ কিছু মন্তব্য করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন, ‘ইরান অনেক বড় ভুল করেছে’।
ড্রোনটি যে আন্তর্জাতিক আকাশ সীমাতেই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তার প্রমাণ রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। ড্রোন ভূপাতিত করার জবাবে তিনি কি করবেন এমন প্রশ্ন করা হলে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘অপেক্ষা করলেই দেখতে পারবেন।’ ২০ জুন ইরানের সবচেয়ে সুসজ্জিত সশস্ত্র বাহিনী ‘রেভ্যুলিশনারী গার্ড’ দাবি করেছিলো যে, মার্কিন ড্রোনটি ইরানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছিল। এই ড্রোনটিকে গোয়েন্দা নজরদারির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল বলে দাবি করে তারা।
সার্বিক দিক বিবেচনায় মার্কিন-ইরান যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা কোন দিকে মোড় নিচ্ছে তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কেউ কেউ দেশ দু’টির মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য মনে করলে অতীত পরিসংখ্যানে ভিন্নতর চিত্রই লক্ষ্য করা যায়। বাকিটা সময়ই বলে দেবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ