ঢাকা, সোমবার 24 June 2019, ১০ আষাঢ় ১৪২৬, ২০ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

যেভাবে স্বর্ণ মন্দিরে ঢুকেছিল ভারতীয় সেনা ট্যাঙ্ক

রেহান ফজল : (গতসংখ্যার পর)
আমি ভেতরে ঢুকব তো বটেই, সবার সামনে যেতে চাই আমি। আকাল তখতে সবার আগে ঢুকে ভিন্দ্রানওয়ালেকে গ্রেপ্তার করতে চাই আমি। মি. বরাড়ের কথায়, “আমি ওই ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসারকে নির্দেশ দিয়েছিলাম যে ওই শিখ অফিসারের প্ল্যাটুনটাই সবার আগে মন্দিরে ঢুকবে। তারা ভেতরে যেতেই মেশিন গান থেকে অজস্র গুলি ছুটে আসতে থাকে। ওই অফিসারের দুই পায়েই গুলী লেগেছিল। কমান্ডিং অফিসার আমাকে জানান যে তাকে কিছুতেই ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না। গুলীবিদ্ধ অবস্থাতেই সেই অফিসার আকাল তখতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন! আমি আদেশ দিয়েছিলাম, তাকে জবরদস্তি উঠিয়ে নিয়ে এসে অ্যাম্বুলেন্সে চড়িয়ে দিতে। পরে তার দুটো পাই কেটে বাদ দিতে হয়েছিল। তার সাহসের জন্য অশোক চক্র পেয়েছিলেন ওই শিখ অফিসার,” জানাচ্ছিলেন মেজর জেনারেল বরাড়। অপারেশন শুরু হয়েছিল রাত দশটায়। অপারেশন ব্লু স্টারের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন জেনারেল সুন্দরজী, জেনারেল দয়াল আর জেনারেল বরাড়। তারা ঠিক করেছিলেন যে গোটা অপারেশনটা রাতের অন্ধকারে চলবে। তাই রাত দশটার সময়ে মন্দিরের সামনের দিক থেকে আক্রমণ করা হয়।
কালো পোশাক পরা প্রথম ব্যাটালিয়নের সৈন্যদের সঙ্গেই প্যারাশুট রেজিমেন্টের কমান্ডোরাও ছিল। ভেতরে গিয়েই খুব দ্রুত আকাল তখতের দিকে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল তাদের। কিন্তু কমান্ডোরা এগোতেই তাদের ওপরে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল থেকে গুলীবর্ষণ শুরু হয়। মাত্র কয়েকজন কমান্ডোই প্রাণে বেঁচেছিলেন। তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন লেফটেনান্ট কর্ণেল ইসরার রহিম খাঁ। দশ নম্বর ব্যাটালিয়নের সদস্যরা সিঁড়ির দুদিকে ভিন্দ্রানওয়ালের সঙ্গীদের মেশিনগানগুলো অকেজো করতে পেরেছিলেন, কিন্তু সরোবরের উল্টোদিক থেকে প্রচন্ড গুলীবর্ষণ শুরু হয়। সেনাবাহিনী আন্দাজও করতে পারে নি যে তাদের এরকম প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হবে। প্রথম পয়তাল্লিশ মিনিটেই আমরা বুঝে গিয়েছিলাম যে ওদের পরিকল্পনা, অস্ত্র ভান্ডার নিয়ে তারা বেশ শক্তপোক্ত দূর্গই গড়ে তুলেছে। ওদের এত সহজে বাগে আনা যাবে না! আমরা ঠিক করেছিলাম আকাল তখতের ভেতরে স্টান গ্রেনেড ছুঁড়ব। ওই গ্রেনেডে মানুষ মরে না। গ্রেনেডটা ফাটলে গ্যাস বেরোয়, যাতে চোখ দিয়ে জল বেরয়, মাথা ঝিম ঝিম করে। কিন্তু গ্রেনেড ছোঁড়ার কোনও জায়গাই পায় নি সেনারা। প্রত্যেকটা জানলা, দরজায় বালির বস্তা রাখা ছিল। তার মধ্যে দিয়ে গ্রেনেড ছুঁড়লে সেগুলো সেনাবাহিনীর জওয়ানদের দিকেই উড়ে আসছিল,” বলছিলেন মি. বরাড়। মন্দির চত্বরের উত্তর আর পশ্চিম দিক থেকেই যে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা গুলী চালাচ্ছিল তা নয়।
ভূগর্ভস্থ নালাতে যে ম্যানহোল থাকে সেগুলোর ঢাকনা খুলে গুলী চালিয়ে আবারও তারা ভেতরেই লুকিয়ে পড়ছিল। এক প্রাক্তণ সেনা জেনারেল, শাহবেগ সিং ভিন্দ্রানওয়ালের দলকে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন।
তাদের শেখানো হয়েছিল সেনাসদস্যদের হাঁটুর কাছে গুলী করতে। তাদের ধারণা ছিল সেনাবাহিনী গুলী চালাতে চালাতে এগোবে। সেজন্যই বেশিরভাগ সেনাসদস্যের পায়ে গুলী লেগেছিল। আর যখন এগোতে পারছিল না সেনাবাহিনী, তখন জেনারেল বরাড় নির্দেশ দেন আর্মড পার্সোনেল ক্যারিয়ার ব্যবহার করতে।
ওই গাড়ি গুলী নিরোধক। কিন্তু গাড়িটা আকাল তখতের দিকে এগোতেই চীনে তৈরি রকেট লঞ্চার দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয় সেটা। আমরা আন্দাজ করতে পারিনি যে ওদের কাছে রকেট লঞ্চার আছে। গাড়িটা এগোতেই রকেট দিয়ে সেটাকে উড়িয়ে দেয় ওরা। ওই পরিস্থিতিতে ট্যাঙ্ক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন জেনারেল বরাড়।
আগে থেকে ট্যাঙ্ক পাঠানোর কথা ভাবাই হয় নি। কিন্তু আকাল তখতের কাছাকাছিও যখন পৌঁছন যাচ্ছে না দেখেই ট্যাঙ্ক আনার কথা ভাবা হয়। আমাদের আশঙ্কা ছিল ভোর হলেই চারদিক থেকে হাজার হাজার লোক চলে এসে সেনাবাহিনীকে ঘিরে ফেলবে। ভোর হয়ে আসছিল, কিন্তু কিছুতেই এগোন যাচ্ছিল না। তখন ঠিক করি যে ট্যাঙ্ক থেকে আকাল তখতের ওপরের তলাগুলোকে লক্ষ্য করে গোলা ছোঁড়া হবে। ইঁট পাথর ওপর থেকে পড়তে থাকলে ভেতরে অবস্থান করা লোকেরা ভয়ে বেরিয়ে আসবে,” বলছিলেন জেনারেল বরাড়।
পরে, অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জগজিৎ সিং আরোরা যখন স্বর্ণ মন্দির পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন, তখন গোনা হয়েছিল অকাল তখতকে লক্ষ্য করে ভারতীয় সেনাবাহিনী অন্তত চল্লিশটা গোলা নিক্ষেপ করেছিল।
জেনারেল বরাড় বলছিলেন, “হঠাৎই দেখা যায় যে ৩০-৪০ জন বাইরে বেরনোর জন্য দৌড়ে আসছে। ওদিক থেকে গুলি চালানোও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমার মনে হল কিছু একটা ঘটেছে ভেতরে। আমি সেনাসদস্যদের আদেশ দিয়েছিলাম ভেতরে প্রবেশ করে তল্লাশি চালাতে। তখনই জানা যায় যে জার্নাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালে আর জেনারেল শাহবেগ সিং নিহত হয়েছেন। তবে পরের দিন গুজব ছড়ায় যে ভিন্দ্রানওয়ালে রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানে পালিয়ে গেছে। পাকিস্তান টিভিও ঘোষণা করে যে ভিন্দ্রানওয়ালে তাদের কাছে আছে। ৩০ জুন তারা নাকি ভিন্দ্রানওয়ালেকে টিভিতে দেখাবে।”
“আমার কাছে তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রী এইচ. কে. এল. ভগত আর বিদেশ সচিব রসগোত্রার ফোন এসেছিল। তারা জানতে চান, পাকিস্তান টিভি বলছে যে ভিন্দ্রানওয়ালে বেঁচে আছেন আর আমি কীভাবে বলছি যে তারা নিহত! আমি দুজনকেই বলেছিলাম শব শনাক্ত করা হয়ে গেছে। মৃতদেহ তাদের পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তাদের অনুগামীরা শবের পা ছুঁয়ে প্রণামও করেছে। আমি নিশ্চিত যে তারা দুজনেই নিহত। পাকিস্তান যা খুশি বলুক,” বিবিসিকে বলছিলেন জেনারেল বরাড়।
এই গোটা অপারেশনে ৮৩ জন ভারতীয় সৈনিক নিহত হয়েছিলেন। ২৪৮ জনের গুলী লেগেছিল।
বিচ্ছিন্নতাবাদী মারা গিয়েছিলেন ৪৯২ জন আর দেড় হাজারেরও বেশি লোক গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
অপারেশন ব্লু স্টারের ফলে শুধু ভারতের নয়, সারা বিশ্বের শিখ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছিল।
ভারতীয় সেনাবাহিনী নিশ্চিতভাবেই জয়ী হয়েছিল, কিন্তু রাজনৈতিক পরাজয় হয়েছিল ভারত সরকারের।
অবশেষে ইন্দিরা গান্ধীকে নিজের প্রাণ দিয়ে এর মূল্য চোকাতে হয়েছিল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ