ঢাকা, সোমবার 24 June 2019, ১০ আষাঢ় ১৪২৬, ২০ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

‘জয় শ্রীরাম বিতর্ক’ এবং পশ্চিমবঙ্গে মেরুকরণের ঝোঁক

নির্বাচনের মরশুমে হিন্দুত্বের স্লোগান ক্রমশ জোরালো হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। খোদ মুখ্যমন্ত্রীর দিকে উড়ে এসেছে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান। ভারতবাসীর দৃষ্টিতে পুরুষোত্তম রাম আরো একবার হয়ে উঠেছেন রাজনৈতিক প্রচারের মূলধন।
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা বদলের সঙ্গে রাজনীতির রং বদল হয়েছে। বাম ও ডানপন্থি মতবাদের যে তীব্র লড়াই দশকের পর দশক দেখা গিয়েছে, তার চরিত্র বদলে যাচ্ছে। মতাদর্শের বদলে জায়গা করে নিচ্ছে ধর্ম। পশ্চিমবঙ্গের আনাচে-কানাচে সাড়ম্বরে পালিত হচ্ছে রামনবমী, শোনা যাচ্ছে জয় শ্রীরাম ধ্বনি। এই প্রবণতা এতটাই প্রবল হয়ে উঠছে যে, পশ্চিমবঙ্গের দোর্দ-প্রতাপ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উত্ত্যক্ত করা হয়েছে এই স্লোগানে। নির্বাচনি প্রচারে পশ্চিম মেদিনীপুর সফর করার সময় চন্দ্রকোণার রাধাবল্লভপুর গ্রামের পাশ দিয়ে মমতার কনভয় যাচ্ছিল। এই পথে মুখ্যমন্ত্রী যাবেন বলে অপেক্ষা করছিল জনতা। একটি স্থানে মুখ্যমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে কয়েকজন যুবক ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দেন। ক্ষিপ্ত মমতা সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থামিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। তাঁকে গাড়ি থেকে নামতে দেখেই যুবকরা দৌড়ে পালায়, মুখ্যমন্ত্রী তাদের উদ্দেশ্যে বলে ওঠেন, “কী হলো, পালাচ্ছিস কেন? আয় আয়, পালাচ্ছিস কেন?”
এই ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়। পরে পুলিশ রাধাবল্লভপুরের তিন যুবক সীতারাম মিদ্যা, বুদ্ধদেব দোলুই, সায়ন মিদ্যাকে আটক করে। এই তিন বিজেপি কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়েও দেয়া হয়।
এই ছোট ঘটনায় বড় প্রতিক্রিয়া হয়েছে চলতি নির্বাচনে। খোদ প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী এ নিয়ে তরজায় জড়িয়ে পড়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, “পশ্চিমবঙ্গে জয় মা দুর্গা, জয় মা কালী বলা যাবে না? জয় শ্রীরাম বলা যাবে না? যে বলবে, তাকে জেলে ভরে দেবে রাজ্য সরকার?” বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহের মন্তব্য, “পশ্চিমবঙ্গ কি পাকিস্তানের অংশ যে, এখানে রামের নাম করা যাবে না?”
বাংলার রাজনীতিতে ধর্মীয় মেরুকরণের প্রবণতা বাড়ছে। রামকে নিয়ে বিতর্ক সেই প্রবণতা অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। মেরুকরণের তীব্রতা বেড়েছে মুখ্যমন্ত্রীর জবাবে। তিনি বলেছেন, “বিজেপির স্লোগান আমি দেবো না। জয়হিন্দ, বন্দেমাতরম বলব, কিন্তু ওদের স্লোগান দেবো না। প্রতিবার ভোটের সময় রাম ওদের নির্বাচনি এজেন্ট হয়ে আসেন।”
পুরাণের চরিত্র রাম ভারতীয়দের কাছে আরাধ্য, যদিও বাঙালিদের ক্ষেত্রে এই কথা পুরোপুরি খাটে না। কিন্তু, এবারের নির্বাচনে সেই রামের বিরাট ছায়া পড়েছে বাংলায়। তবে একে তৃণমূল সরকারের নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছে বিজেপি, যেটা ধর্মীয় স্লোগানের মোড়কে সামনে এসেছে। ঘাটালের বিজেপি সভাপতি অন্তরা ভট্টাচার্য ডয়চে ভেলেকে বলেন, “মানুষ তৃণমূলের বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ। বিভিন্নভাবে সেটা সামনে আসছে। এই ঘটনা তারই প্রমাণ। গ্রামবাসীরা প্রতিবাদ জানাচ্ছেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে।” তবে পশ্চিম মেদিনীপুরের তৃণমূল জেলা সভাপতি অজিত মাইতি একে স্বতঃস্ফূর্ত আচরণ বলে মানতে রাজি নন। তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, “এটা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, বিজেপির চক্রান্ত। ওই এলাকা আরামবাগ লোকসভার মধ্যে পড়ে। যদি ক্ষোভ থাকত, তাহলে বিজেপি ওখানে ভোটের দিন বুথে এজেন্ট দিতে পারেনি কেন?”
প্রসঙ্গত, আরামবাগ ভোটকেন্দ্রের ভোট নিয়ে বেশ কিছু অভিযোগ উঠেছে। তৃণমূল সমর্থকদের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের এজেন্টদের পিটিয়ে বের করে দেয়ার একাধিক অভিযোগ উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমের খবরে।
এবার তৃণমূলের ঘাঁটি বলে পরিচিত এলাকাগুলোতেও মুখ্যমন্ত্রীকে কার্যত চ্যালেঞ্জ জানানোর যে দুঃসাহস যুবকরা দেখিয়েছে, তার নেপথ্যে ক্ষোভ রয়েইছে। যেমন, সীতারাম মিদ্যা ইমামদের ভাতা দেয়ার রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আবার তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, “আমি বিজেপি কর্মী বলে কোথাও আমাকে কাজে টিকতে দেয়নি তৃণমূল। এর আগে দু’রকমের কাজ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। এখন শ্রমিকের কাজ করে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছি। তাই মুখ্যমন্ত্রীকে ভালোবেসে প্রতিবাদ জানিয়েছি। কেবল জয় শ্রীরাম ধ্বনি দিয়েছি।” রাধাবল্লভপুরের তিন কর্মীকে গত মঙ্গলবার সংবর্ধনা দিয়েছে বিজেপি। বিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্য, ওঁদের সাহসিকতায় দলের কর্মীদের মনোবল বেড়েছে। সবাই এই সাহস নিয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়বেন।
চন্দ্রকোণার ঘটনার রেশ কাটার আগেই উত্তর ২৪ পরগনায় রাম ধ্বনির পুনরাবৃত্তি দেখা গিয়েছে। বিধানসভা উপনির্বাচনের তৃণমূল প্রার্থী মদন মিত্রের রোড শো চলাকালীন কাঁকিনাড়ায় বিজেপি কর্মীরা ফের একবার জয় শ্রীরাম ধ্বনি দিয়েছেন। এই বিতর্কে পুরোনো প্রশ্নটি ঘুরেফিরে আসছে, ধর্মনিরপেক্ষ দেশে ধর্মকে হাতিয়ার করা কি উচিত? কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক অনিন্দ্য বটব্যাল বলেন, “ভারতীয় রাজনীতিতে ধর্ম সম্পৃক্ত হয়ে আছে। ব্যাপারটা খুবই জটিল। এই ঘটনার শেকড় অনেক গভীরে। রামের ধ্বনিকে ধর্মের গন্ডী পার করে রাজনীতির আঙিনায় নিয়ে আসা হয়েছে নিখাদ রাজনৈতিক কারণে। সেটা এখন রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে উঠেছে।” তবে এবার সংখ্যাগুরুদের মধ্যে ধর্মের ভিত্তিতে একজোট হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ