ঢাকা, মঙ্গলবার 25 June 2019, ১১ আষাঢ় ১৪২৬, ২১ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশে উন্নয়ন সমীক্ষা

নুসরাত জাহান সুরভী : সকালের ঘুম ভাঙে বাইরে থেকে মেশিনের ধুমধাম আওয়াজ শুনে। জানালা দিয়ে রাস্তারদিকে তাকালেই দেখি মেট্রোরেলের কাজ হচ্ছে। ঠিক এভাবেই সকাল শুরু হয় ঢাকাবাসীদের। তবে মাননীয় এম পি মশাই বলেছেন, “আপনারা এখন কষ্ট করছেন, যখন দেখবেন মেট্রোরেল হয়ে গেছে তখন দেখবেন শুধু শান্তি আর শান্তি।” চারদিকে কেবলই উন্নয়ন। যেন উন্নয়নের জোয়ার বইছে গোটাবাংলাদেশ জুড়ে। যেমন রাস্তায়  বের হলেই ফ্লাইওভার, ওভার ব্রীজ যেখানে ১টা হলেই চলে সেখানে ৩টা আর যেখানে কমপক্ষে ২টা দরকার সেখানে ১ টাও নেই। সেসব জায়গায় মানুষ রাস্তা পার হয় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। যাই হোক, তবুও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, ড. মাকসুদুল আলমের আবিষ্কৃত জিনোমসিকয়েন্সিং, ই-পেমেন্ট, মোবাইল ব্যাংকিং, জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ৬ হাজার ৩২৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সংযোজন বাংলাদেশের জন্য বিরাট অর্জন। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের (ইকোসক) মানদন্ড অনুযায়ী একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হবে কমপক্ষে ১২৩০ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশের মাথা পিছু আয় ১৬১০ মার্কিন ডলার। মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ অর্জন করেছে ৭২ দশমিক ৯। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক হতে হবে ৩২ ভাগ বা এর কম যেখানে বাংলাদেশের ২৪ দশমিক ৮ ভাগ।
অপরদিকে আই.এম.এফ. অনুযায়ী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশের অবস্থান ২য়। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নীতি সংক্রান্ত কমিটি (সিডিপি) ২০১৮ সালের ১৫ই মার্চ এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়।ফলে  বাংলাদেশ পায় উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা। আরও রয়েছে পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা মেট্রোরেলসহ দেশের মেগা প্রকল্পসমূহ। আবার শিক্ষাক্ষেত্রে বিনা বেতনে শিক্ষার্থীদের কাছে বই বিতরণ বাড়িয়ে দিয়েছে শিক্ষার হার। সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষার কিছু সংস্থার পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, গত ১০ বছরে বাংলাদেশে সার্বিক সাক্ষরতার হার ২৬ দশমিক ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭২ দশমিক ৯০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। শিক্ষার এই হার বৃদ্ধি অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু শিক্ষার্থীদের আমরা দিতে পারি নি কোন উন্নত নৈতিক শিক্ষা। ফলাফল, নকল করতে না দয়ায় শিক্ষককে লাথি দেয়া, আইটির কল্যাণে পরিক্ষার আগেই প্রশ্ন ফাস। শিক্ষাঙ্গনগুলো পরিণত হয়েছে এক একটি রাজনৈতিক ঘাঁটিতে। বাংলাদেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ও নেই বিশ্বের সেরা ৪০০ ভার্সিটির কাতারে। ওয়েভমেট্রিক্স এর সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ওয়ার্ল্ড র‌্যাঙ্কিং এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ১৮৫৫ অথচ নব্বই এর দশকে যা ছিল ১০০ এর মধ্যে। আর বাকীদের কথা তো বাদই দিলাম। দাঙ্গা হাঙ্গামা, ছাত্র রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার সংঘর্ষ, মেধার পরিবর্তে লবিং এর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঠেলে দিয়েছে হুমকির মুখে।
দেশে নারী ক্ষমতায়ন হয়েছে ঠিকই অথচ নারী পায়নি তার প্রাপ্য মর্যাদা। তাই বাসে, রিকশায়, হাটে বাজারে, ঘরে বাইরে নারী হচ্ছে ক্রমাগত ধর্ষণের শিকার। আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে এখনো হয়নি শিশু হত্যার বিচার।
অন্যদিকে সড়ক দুর্ঘটনা হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের মানুষের জন্য নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসেবে, ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনার মধ্যে নিহতের সংখ্যা ৭ হাজার ২২১ জন। আহত ১৫ হাজার ৪৬৬ জন। কিন্তু এর সমাধান?
এটা খুবই আশার বিষয় যে, ধনী বৃদ্ধির হারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ৩য়। সেই সাথে এটাও সত্য মানুষের আয় যত বেশি, তার করও তত বেশি। অথচ  ধনবান মানুষেরাই কর ফাঁকি দিচ্ছে সবচেয়ে বেশি। আর দুর্নীতিবাজদের তো কর দেয়ার প্রশ্নই আসে না। একই সঙ্গে, রাজস্ব আইন এমনভাবে প্রণয়ন করা হয়, যাতে তাদের পক্ষে কর ফাঁকি দেয়া সহজ হয়। অর্থাৎ একদিকে করপোরেশনের হাতে বিপুল টাকা জড়ো হওয়ার সুযোগ দেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে তার মালিক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কর ফাঁকি দেয়ারও সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এতে তাঁরা দুদিক থেকেই লাভবান হচ্ছেন। এর মাধ্যমে এক অতি ধনবান শ্রেণি সৃষ্টি হয়েছে। ভ্যাট নামক পরোক্ষ করের মাধ্যমে ঠিকই তাদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করা হচ্ছে। আবার মধ্যবিত্তের বেতন থেকেই কর কেটে  নেয়া হয়। এখানে ফাঁকির সুযোগ নেই। বাংলাদেশ সরকারের সংগৃহীত মোট রাজস্বের ৭০ শতাংশই আসে পরোক্ষ কর থেকে, অর্থাৎ ভ্যাট থেকে, আর বাকি মাত্র ৩০ শতাংশ আসে প্রত্যক্ষ কর বা আয়কর থেকে। অথচ এ অনুপাতটা সমান সমান হওয়া বাঞ্ছনীয় বলে মনে করে খোদ রাজস্ব বিভাগ। এতে বৈষম্য আরও বাড়ছে।
মূলত এভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে দেশ ও তার জাতি। অবকাঠামোগত কিছু উন্নয়ন দেশকে অর্থনৈতিক থেকে ৪৩তম উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিত করলেও দুর্নীতিতে বিশ্বে ১৩তম এ দেশের মানুষের নৈতিক উন্নয়ন কতোটুকু হয়েছে তা এখন দেখার বিষয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ