ঢাকা, মঙ্গলবার 25 June 2019, ১১ আষাঢ় ১৪২৬, ২১ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশের দাপুটে জয় ॥ সেমির পথ উজ্জ্বল

বাংলাদেশ- ২৬২/৭ (৫০ ওভার)

আফগানিস্তান- ২০০/১০ (৪৭ ওভার)

বাংলাদেশ ৬২ রানে জয়ী

রফিকুল ইসলাম মিঞা : বাংলাদেশের বড় জয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি আফগানিস্তান। নিজেদের গুরুত্বপূর্ন ম্যাচে আধিপত্য বজায় রেখেই আফগানিস্তানকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। সাকিব আল হাসানের অলরাউন্ডার পারফরমেন্সে বাংলাদেশ জয় পেয়েছে ৬২ রানের বড় ব্যবধানে। আগে ব্যাট করে সাকিব-মুশফিকের ফিফটিতে ৭ উইকেটে বাংলাদেশ করে ২৬২ রান। ফলে জয়ের জন্য আফিগানিস্তান টার্গেট পায় ২৬৩ রানের। জয়ের জন্য এই টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশের বোলারদের সামনে মাত্র ৪৭ ওভারে ২০০ রানে গুটিয়ে যায় আফগানিস্তান। ফলে ৬২ রানের সহজ জয় পায় বাংলাদেশ। এই জয়ের ফলে সেমিতে উঠার পথে আরো একধাপ এগিয়ে গেল টাইগাররা। কারণ ৭ ম্যাচে তিন জয়ে আর এক ম্যাচে পয়েন্ট ভাগ করে ৭ পয়েন্ট  পেল বাংলাদেশ।  আর শ্রীলংকাকে পিছনে ফেলে পয়েন্ট টেবিলের ৫ম স্থানে উঠে এল টাগাররা। আফগানিস্তানের বিপক্ষে নিজেদের টিকে থাকার ম্যাচে আগে ব্যাট করে খুব বড় টার্গেট দিতে পারেনি বাংলাদেশ। ফলে আফগানিস্তানকে হারাতে হলে বোলাদের বাড়তি দায়িত্ব পালন করা ছাড়া উপায় ছিলনা। তবে সে কাজটি ঠিকঠাক মতোই করেছে টাইগার বোলাররা। ফলে ২৬৩ রানের টার্গেট দিয়েও বড় জয় পেতে কস্ট করতে হয়নি বাংলাদেশকে। আর বাংলাদেশের কাছে হেরে বিশ্বকাপে জয় শুন্যই থাকতে হল আফগানিস্তানকে। সাকিব ব্যাট হাতে ৫১ রান আর বল হাতে ৫ উইকেট নিয়ে দলকে জয়ী করার পাশাপাশি ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হন।  

জয়ের জন্য ২৬৩ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে শুরুটা কিন্তু ভালোই করেছিল আফগানিস্তান। ওপেনিং জুটি ভাংগার আগেই দলটি পৌছে গিয়েছিল ৪৯ রানে। ওপেনার রহমত শাহের বিদায়ে ভাংগে এই জুটি। বল করতে এসে নিজের প্রথম ওভারেই দলকে উইকেট এনে দেস সাকিব। সাকিবের বলে তামিমের হাতে ক্যাচ হওয়ার আগে রহমত শাহ করেন ২৪ রান। ৩৫ বলে ৩ চারে ইনিংসটি সাজান তিনি। তবে দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে গুলবাদিন নাইব ও হাশমতউল্লাহ শহিদী বাংলাদেশ বোলারদের হতাশা বাড়াচ্ছিলেন। কিন্তু দলীয় ৭৯ রানে এই জুটির পতন ঘটান মোসাদ্দেক। এই জুটির সংগ্রহ ৩০ রান। মোসাদ্দেকের বলে মুশফিকুর রহিমের দুর্দন্ত স্টাম্পিংয়ে আউট হওয়ার আগে ৩১ বলে ১১ রান করেন শহিদী। দলীয় ৭৯ রানে দুই উইকেট পড়লেও আজগর আফগানকে নিয়ে দলকে শতরানে নিয়ে যান ওপেনার গুলবাদিন নাইব। তবে দলকে শতরানের নিয়ে বেশি সময় টিকটে পারেননি তিনি। দলীয় ১০৪ রানে তাকে ফিরতে হয় সাকিবের বলে লিটনকে ক্যাচ দিয়ে। আউট হওয়ার আগে এই অধিনায়ক করেন ৪৭ রান। নাইব ৭৫ বলে ৩ চারে সাজান তার ইনিংস। ব্যাট করতে নেমে রানের খাতা খোলার আগে মোহাম্মদ নবীকে বোল্ড করেন সাকিব। ফলে আফগানিস্তানের জয়ের পথটা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। এখানেই শেষ নয়, দলীয় ১১৭ রানে সাকিব তুলে নেন আজগর আফগানের উইকেট। ফলে ১১৭ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে অনেকটাই দিশেহারা হয়ে পরে আফগানরা। কারণ সাকিবের বোলিংয়ের সামনে দাড়াতেই পারছিলেননা ব্যাটসম্যানরা। সাকিব নিজের প্রথম সাত ওভারে মাত্র ১০ রানে নেন ৪ উইকেট। আর এই ম্যাচেই বিশ্বকাপে ১০০০ রানের মাইলফলক গড়ার পর এবার অবিশ্বাস্য এক রেকর্ড গড়েন সাকিব আল হাসান। একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে বিশ্বকাপে ১০০০ রান আর ৩০ উইকেটের মালিক এখন এই বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। আফগানিস্তানের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে এই রেকর্ড গড়তে ২ উইকেট দরকার ছিল সাকিবের। ব্যাট হাতে ফিফটি হাঁকানোর পর বল হাতে নিজের প্রথম ওভারেই আফগান ওপেনার রহমত শাহ’কে ফিরিয়ে রেকর্ডের কাছে পৌঁছে যান সাকিব। এরপর নিজের পঞ্চম ওভারের প্রথম বলেই আফগান অধিনায়ক গুলবাদিন নাইবকে লিটন দাসের ক্যাচে পরিণত করে বিশ্বরেকর্ড গড়েন তিনি। ব্যাট করতে নেমে ইকরাম আলী খিলও ভালো করকে পারেননি।  ১১ রান করে হন রান আউট। তবে দলের নিশ্চিত পরাজয়  জেনেও ব্যবধান কমাতে ব্যাট চালিয়েছেন সামিউল্লাহ শিনওয়ারী-নাজিবুল্লা জাদরান জুটি। এই জুটি দলকে ১৮৮ রানে নিয়ে যান। তবে এই জুটি ভাংগে সাকিবকেই দায়িত্ব নিতে হয়। সাকিবের বলেই আউট হয়ে মাঠ ছাড়েন জাদরান। আউট হওয়ার আগে তিনি করেন ২৩ বলে ২৩ রান। ব্যাট করতে নেমে রশিদ খান মাত্র ২ রানে হন মোস্তাফিজের প্রথম শিকার । আর দাওলাত জাদরানকে শুন্য রানে ফিরিয়ে মোস্তাফিজ নেন দ্বিতীয় উইকেট। সামিউল্লাহ টিকে থেকে দলকে দুইশত রানের কোটায় নেয়ার প্রানপন চেস্টা করেছেন। তবে দলকে পরাজয়ের হাত থেকে বাচাতে না পারলে দলকে নিয়ে গেছেন ২০০ রানে। ব্যাট করতে নেমে মুজিব শুন্য রানে সাইফউদ্দিনের বলে বোল্ড হলে আফগানিস্তান তিন ওভার বাকি থাকতে অলআউট হয় ২০০ রানে। ফলে বাংলাদেশ জয় পায় ৬২ রানে। সামিউল্লাহ ৪৯ রানে অপরাজিত ছিলেন। ৫১ বলে তিন চার আর এক ছক্কায় সাজানো ছিল তার অপরাজিত ৪৯ রানের ইনিংসটি। বাংলাদেশের পক্ষে সাকিব একাই নিয়েছেন ৫ উইকেট। দুটি উইকেট নিয়েছেন মোস্তাফিজ। আর মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন আর মোসাদ্দেক নেন একটি করে উইকেট। এর আগে, গতকাণ টস হেরে আগে ব্যাট করতে নেমে মুশফিক-সাকিবের হাফসেঞ্চুরিতে বাংলাদেশ ৭ উইকেটে করেছে ২৬২ রান। ব্যাট করতে নেমে শুরুটা ভালো করতে চেয়েছিল বাংলাদেশ। সৌম্য সরকারকে সরিয়ে তাই তামিমের সাথে ওপেন করতে পাঠানো হয় লিটন দাসকে। শুরুটা ঠিকই ভালো করেছিল তামিম-লিটন। রানের গতিটাও ছিল ভালো। কিন্তু দলীয় ২৩ রানে এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তে আউট হতে হয় টাইগার ওপেনার লিটন দাসকে। ব্যক্তিগত ১৩ রানে মুজিব উর রহমানের বলে হাশমতুল্লাহ শহীদির হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন লিটন। কিন্তু টিভি রিপ্লেতে দেখা যায় বলটি ঘাসে ছুঁয়ে ফিল্ডারের হাতে উঠে। তবে থার্ড আম্পায়ার আলিম দার লিটনকে আউট ঘোষণা করেন। লিটন ১৭ বলে ২ চারে সাজান তার ইনিংসটি। লিটন দলীয় ২৩ রানে আউট হলেও দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে তামিম-সাকিব জুটি করে দলকে ঠিকই এগিয়ে নেন। এই জুটিতে দুজনে মিলে যোগ করেন ৫৯ রান। দলীয় ৮২ রানে তামিমের বিদায়ে ভাংগে এই জুটি। আফগান স্পিনার মোহাম্মদ নবীর বলে বোল্ড হয়ে মাঠ ছাড়েন তামিম। বিদায়ের আগে ৫৩ বল খেলে তামিম করেন ৩৬ রান। তামিম আউট হলেও মুশফিককে নিয়ে সাকিব ঠিকই দলকে বড় স্কোরের দিকে নেয়ার চেস্টা করেছেন। সেই সাথে নিজের রের্কডটাও গড়তে চেয়েছেন। তবে আউট হওয়ার আগে সাকিব নিজের রের্কড ঠিকই করেছেন। এই ম্যাচেও ফিফটি করেছেন সাকিব। এটা চলতি বিশ্বকাপে নিজের তৃতীয় ও সবমিলিয়ে ৪৫তম ওয়ানডে ফিফটি। আর দলীয় ১৪৩ রানে মুজিব উর রহমানের বলে এলবি আউট হওয়ার আগে ৬৯ বলে একটি বাউন্ডারি মেরে করেছেন ৫১ রান। এই ম্যাচ দিয়েই প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বকাপে ১ হাজার রানের মাইলফলক গড়েছেন সাকিব। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার ডেভিড ওয়ার্নারকে (৪৭৬ রান) পেছেনে ফেলে শীর্ষ রান করার তালিকায় আবার এক নম্বরে উঠে এসেছেন বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার। সাকিবের বিদায়ে মোটেও ভালো করতে পারেননি সৌম্য সরকার। ব্যাট করতে নেমে মাত্র তিন করার পরই মুজিব উর রহমানের বলে তৃতীয় শিকার হয়ে মাঠ ছাড়েন তিনি। ওপেনিং থেকে পাঁচে নামিয়ে আনা সৌম্যকে এলবি আউট করেন মুজিব। সাকিবের পর দলের দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে ফিফটি করেন মুশফিকও। দাওলাত জাদরানের করা ইনিংসের ৩৭তম ওভারের দ্বিতীয় বলে লং অনে বিশাল এক ছক্কা হাঁকিয়ে ফিফটি পূর্ণ করেন মুশফিক। এটি চলতি বিশ্বকাপে তার দ্বিতীয় ও সবমিলিয়ে ৩৫তম ওয়ানডে ফিফটি। দলীয় ১৫১ রানে সৌম্য বিদায় নিলেও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকে নিয়ে দলকে দুইশত রানের কোটা পার করেন মুশফিক। দলীয় ২০৭ রানে আউট হন রিয়াদ। গুলবাদিন নাইবের বলে  মোহাম্মদ নবীকে ক্যাচ দিয়ে ফেরার আগে ৩৮ বলে ২৭ রান করেন রিয়াদ। দলীয় ২০৭ রানে ৫ উইকেট হারালেও দলকে এগিয়ে নেয়ার প্রানপন চেস্টা করেছেন মুশফিক-মোসাদ্দেক জুটি। এই জুটি ভাংগার আগে দলের স্কোর পৌছে যায আড়াইশ রানের উপরে। কিন্তু দলীয় ২৫১ রানে ফিরতে হয় টিকে থেকে দলকে এগিয়ে নেয়া মুশফিককে। দাওলাদ জারদানের বলে তুলে মারতে গিয়ে নবীকে ক্যাচ দেয়ার আগে দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৮৩ রান করেন মুশফিক। ৮৭ বলে চার বাউন্ডারি আর এক ছক্কায় সাজানো ছিল মুশফিকের ইনিংসটি। অল্পের জন্য টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরি করতে পারেননি তিনি। মুশফিক বিদায় নিলেও দলকে শেষ বল পর্যন্ত নিয়ে গেছেন মোসাদ্দেক। গুলবাদিন নাইবের বলে আউট হওয়ার আগে ২৪ বলে ৩৫ রানের ইনিংস উপহার দেন মোসাদ্দেক। ৪টি বাউন্ডারিতে সাজানো এই ইনিংস। ফলে ৭ উইকেটে বাংলাদেশ করে ২৬২ রান। আফগানিস্তানের পক্ষে স্পিনার মুজিব ৩টি, নাইব ২টি এবং জাদরান ও নবী ১টি করে উইকেট নেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ