ঢাকা, বৃহস্পতিবার 27 June 2019, ১৩ আষাঢ় ১৪২৬, ২৩ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সরকার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে -সংসদে প্রধানমন্ত্রী

সংসদ রিপোর্টার: জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সরকার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মিয়ানমারে মৌলিক অধিকার বঞ্চিত এই বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা অধিবাসীরা অসন্তুষ্টিতে ভুগছে। তাদের রয়েছে অনেক অভাব-অভিযোগ। এদের অতিদ্রুত ফেরত পাঠাতে না পারলে আমাদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরে কিশোরগঞ্জ-২ আসনের নূর মোহাম্মদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হয়।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মিয়ানমারের এসব নাগরিক এখানে স্বেচ্ছায় আসেননি। সেদেশের সেনাবাহিনী তাদের জোর করে বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ করেছে। নির্মম নির্যাতনের শিকার এসব মানুষের খাদ্য, বাসস্থান ও স্বাস্থ্যসেবাসহ মৌলিক মানবিক সহায়তা অত্যন্ত জরুরি ছিল। এজন্য আমরা তাদের সাময়িকভাবে আশ্রয় দিয়েছি। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও স্থানীয় এনজিও’র সঙ্গে সমন্বয় করে এই বিপুল সংখ্যক নাগরিককে আমরা আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা প্রদান করছি।
 রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার অপপ্রচার চালাচ্ছে উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যে যথাযথ সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক মহল মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে। আমরা বারবার বিভিন্ন ফোরামে বলেছি, এসব বাস্তুচ্যুত জনগণকে ফেরত নেওয়ার বিষয়টি মিয়ানমার সরকারের ওপর বর্তায় এবং তাদেরকেই উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মিয়ানমার সরকারের অনড় অবস্থানের কারণে দৃশ্যমান কোনও অগ্রগতি হয়নি। উপরন্তু, মিয়ানমার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে এবং বলছে, বাংলাদেশের অসহযোগিতার কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিলম্ব হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব জনমত ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অব্যাহতভাবে আমাদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘ এ বিষয়ে মানবাধিকার কমিশনে একটি রিপোর্ট পাঠিয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার তাদের এ বিষয়ে কাজ করতে দিচ্ছে না। মিয়ানমারের অসহযোগিতা সত্ত্বেও আমরা দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় দুটি পথই খোলা রেখেছি।
আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে দেশের অগ্রগতিকে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ২১ বছর চলে সামরিক ও স্বৈরাশাসকের লুটপাট। এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা আসার পর দেশের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে সেই অগ্রযাত্রা থমকে দাঁড়ায়। ২০০১ সালে বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসে। আবার দুর্নীতির চক্রে নিপাতিত হয় দেশ। হাওয়া ভবনের নামে তারেক জিয়া চালাতে থাকে লুটপাট।
শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদে দুই তৃতীয়াংশের অধিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। আবার দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করার জন্য মনোনিবেশ করি। ২০০৯ সাল থেকে আমাদের অগ্রযাত্রা শুরু হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচনি ইশতেহার দিন বদলের সনদের অঙ্গীকার অনুযায়ী অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এ পরিকল্পনার আওতায় দেশের জনগণের অর্থনৈতিক উন্নতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে রূপকল্প ২০২১ ঘোষণা করেছি।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বর্তমানে এক হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা গত বছর ছিল এক হাজার ৭৫১ ডলার। ২০০৬ সালে মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৫৪৩ ডলার অর্থাৎ এ সময়ে মাথাপিছু আয় বেড়েছে সাড়ে তিন গুণ।
গণফোরামের দলীয় সংসদ সদস্য মোকাব্বির খানের অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বেশকিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী কওমি মাদরাসায় লেখাপড়া করছে। কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় রেখেই পর্যায়ক্রমে কওমি মাদরাসা শিক্ষাকে মূল স্রোতধারায় আনার জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দাওরায়ে হাদিসের (তকমীল) সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রির (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান প্রদান করে আইন করা হয়েছে। আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন ও বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের পলে কওমি মাদরাসার শিক্ষা ব্যবস্থা মূল ধারার শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সমানতালে এগিয়ে যেতে পারবে।
নেত্রকোনা-৩ আসনের অসীম কুমার উকিলের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বয়স্ক ভাতাভোগীর সংখ্যা ৪০ লাখ। আগামী অর্থবছরে বয়স্ক ভাতা বৃদ্ধি করে ৪৪ লাখে উন্নীত করা হবে। বয়স্ক ভাতা সহায়তার আওতা সম্প্রসারণ ও ভাতার পরিমাণ পর্যায়ক্রমে আরও বৃদ্ধি করা হবে।
তিনি বলেন, বয়স্ক জনগোষ্ঠী বিশেষ করে বয়স্ক নারীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা বিধান, পরিবার ও সমাজে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সরকার সর্বপ্রথম ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে বয়স্ক ভাতা চালু করে। তখন বয়স্কভাতার পরিমাণ ছিল জনপ্রতি মাসিক ১০০ টাকা এবং ভাতাভোগীর সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৩ হাজার। আমরা জনপ্রতি মাসিক ভাতার হার ৫০০ টাকায় বৃদ্ধি করেছি।
তিনি বলেন, ‘বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা দুস্থ নারীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও সুরক্ষা বিধানের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, দুস্থ নারীদের জন্য ভাতা চালু করে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৪ লাখ বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, দুস্থ নারীকে জনপ্রতি মাসে ৫০০ টাকা হারে মোট ৮৪০ কোটি টাকা ভাতা দেয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ছাড়া আমরা ২০ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত নারীদের দুস্থ উন্নয়ন (ভিজিডি) কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করেছি। এ কর্মসূচির মূল কার্যক্রম হলো- মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়াধীন দুস্থ মহিলা উন্নয়ন (ভিজিডি) কর্মসূচি বাংলাদেশের গ্রামীণ দুস্থ নারীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে বাস্তবায়িত একটি অন্যতম সামাজিক নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম, যা সম্পূণরূপে দুস্থ পরিবার বিশেষত নারীদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে।
এ কর্মসূচির সেবাসমূহের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ভিজিডি উপকারভোগী নারীদের মাসিক ৩০ কেজি প্যাকেটজাত খাদ্য (চাল) সহায়তা দেয়া এবং চুক্তিবদ্ধ এনজিও’র মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
কর্ম এলাকা ও উপকারভোগীর সংখ্যা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলমান ভিজিডি চক্রে দেশের ৪৯২টি উপজেলার ৪ হাজার ৫৬৩টি ইউনিয়নে ১০ লাখ ৪০ হাজার উপকারভোগী নারীকে খাদ্য (চাল) দেয়া হচ্ছে। খাদ্যসহায়তা দেয়ার পাশাপাশি উপকারভোগীদের মধ্যে প্রশিক্ষণ (আয়বর্ধক ও সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক) দেয়ার জন্য এনজিও নির্বাচনের কার্যক্রম চলমান। চলতি অর্থবছর এ কর্মসূচির মোট বাজেট বরাদ্দ ১ হাজার ৬২০ কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম-১১ আসনের এম আবদুল লতিফের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সরকার আগামী ৫ বছরে দেড় কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ-তরুণী কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং কাজ। এজন্য ব্যাপক শিল্পায়নের মাধ্যমে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সরকার নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন জেলায় ৮৮টির স্থান নির্বাচন শেষ হয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইতোমধ্যে ৩০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১ কোটি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ