ঢাকা, বুধবার 03 July 2019, ১৯ আষাঢ় ১৪২৬, ২৯ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

দিনাজপুরে গুদামের ইউরিয়া গলে মাটি ও পানি দূষিত

মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, দিনাজপুর : দিনাজপুরে বাফা গুদামের পাশ্ববর্তী এলাকার পানি-মাটি সব ইউরিয়াচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে বিভিন্নভাবে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ছে মানুষ। রোগের মধ্যে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেকের মাথার চুল উঠে যাচ্ছে অথবা অনেকেই নানান চর্মরোগে ভুগছে। ইউরিয়াযুক্ত পানির ফলে মরে যাচ্ছে গাছপালা, কষ্টকর হয়ে পড়েছে পশুপালন। এ নিয়ে এলাকায় তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে ওই এলাকায়। দিনাজপুর পুলহাট বাফার গুদামে স্তুপকৃত ইউরিয়া সার বৃষ্টির পানিতে গলে মাটিতে ও পানিতে মিশে যাওয়ায় পুকুরের পানি, এমনকি টিউবওয়েলের পানিতেও ইউরিয়া সারের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। বিশুদ্ধ পানির অভাবে রোগাক্রান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। পর্যাপ্ত জায়গার অভাব ও কর্তৃপক্ষের অবহেলার বাফার গুদামের আশপাশের দুই এলাকার প্রায় ৪ শতাধিক পরিবার এক বছর ধরে বিশুদ্ধ পানি থেকে বঞ্চিত।
সরেজমিনে দেখা যায়, পুলহাট বাফার গুদামে খোলা আকাশের নিচে রাখা রয়েছে বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া সার। সামান্য বৃষ্টি হলেই সারগুলো ধুয়ে গুদামের পার্শ্ববর্তী পুলহাট ও কবসা এলাকার পুকুরের পানিতে গিয়ে যুক্ত হচ্ছে। ওই দুই এলাকার টিউবওয়েলগুলোতে বিশুদ্ধ পানির বদলে শুধু বের হচ্ছে লাল রঙের শরবতের মতো পানি। গুদামে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকলেও গুদাম কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত ইউরিয়া সার মজুদ করছেন। মজুদ এ সারের জন্য নেই কোনো ছাউনি বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই সার ধুয়ে পানি চলে যাচ্ছে পুকুর, জলাশয় ও টিউবওয়েলে। অথচ বাফার গুদাম কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ইউরিয়ার সার মিশ্রিত পানি ব্যবহারের ফলে ওই এলাকাগুলোর মানুষের শরীরে বাসা বাঁধছে নানা জটিল রোগ। ওই পানি নিয়ে ভাত রান্না করতে পারেন না ওই এলাকার নারীরা। গুদাম সংলগ্ন পুলহাট (ফকিরপাড়া) এলাকার বাসিন্দা আলেয়া খাতুন, সাবিনা বেগম, আরুজা বেগম, ইমানুল ইসলাম জানান, এই পানি পান করলে চোখ জ্বালা-পোড়া করে। গোসল করলে চুল পড়া শুরু হয়। ইউরিয়া মিশ্রিত পানির ফলে ওই এলাকার ছোট ছোট গাছগুলো মরে গেছে। ভয়ে কেউ বাড়িতে পশুপালন করতে পারছে না। ওই পানি দিয়ে ভাত রান্না করলে হলুদ রঙের ভাত হয়। এখানকার পানি দেখলে মানুষ মনে করবে যেন কেউ শরবত বানিয়েছেন। আমরা দীর্ঘ এক বছর ধরে বিশুদ্ধ পানি থেকে বঞ্চিত। দূর থেকে বিশুদ্ধ পানি নিয়ে এসে খাবারসহ বাড়ির অন্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে দিনাজপুর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. পারভেজ সোহেল রানা বলেন, ইউরিয়া মিশ্রিত পানি ব্যবহারের ফলে মানুষের শরীরে বিভিন্ন রোগ দেখা দিতে পারে। এছাড়াও ওই পানি ব্যবহারের ফলে মাথার চুল পড়ে যায় এবং শরীরে ছোট ছোট ফোঁড়ার মতো ঘা সৃষ্টি হতে পারে। যদি বেশিদিন ধরে ইউরিয়া মিশ্রিত পানি ব্যবহার করা হয় তাহলে মানুষের শরীরে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেবে। তাই ইউরিয়া মিশ্রিত পানি পরিহার করে চলাই ভালো। দিনাজপুর সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা ও প্রাণিতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, মূলত ইউরিয়া সার কৃষি জমিতে ফসল বেশি উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হয়। কিন্তু জমিতে ইউরিয়া সারের পরিমাণ বেশি হলে মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়ে ফসলের উৎপাদন কমে যায়। তেমন ওই এলাকায় ইউরিয়া মিশ্রিত সার বিভিন্ন গাছপালায় বেশি পরিমাণে পানির সঙ্গে চলে যাওয়ায় গাছপালার অনেক ক্ষতি হচ্ছে। গাছপালার গোড়ায় যদি বেশি পরিমাণ ইউরিয়া মিশ্রিত পানি থাকে তাহলে তা মরে যাবে।
এ বিষয়ে ওই এলাকার পৌর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আশরাফুল আলম রমজান বলেন, এই সমস্যা দূরীকরণে গুদামে খোলা আকাশের নিচে রাখা ইউরিয়া সার বৃষ্টিতে গলা রোধ করতে টিনশেড তৈরি জরুরি। একইসঙ্গে গুদামে পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেনেজ ব্যবস্থা রাখতে হবে। সীমানা প্রাচীর তৈরিও জরুরি। এই ৩ টি ব্যবস্থা থাকলে গুদাম সংলগ্ন এলাকার ওই পরিবারগুলো এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাবে। দিনাজপুর পুলহাট বাফার গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দ্বিজেন্দ্র নাথ রায় বলেন, পুলহাট বাফার গুদামে প্রতিবছর ৬ হাজার মে. টন সার ধারণ ক্ষমতা থাকলেও চাহিদা মোতাবেক ২০ হাজার মে. টন সার সংরক্ষণ করতে হয়। অবশিষ্ট ১৪ হাজার মে. টন গুদামের মাঠে খোলা আকাশের নিচে রাখার ব্যবস্থা করতে হয়। দীর্ঘদিন বাইরে থাকায় বৃষ্টির পানিতে সার গলে পুকুরে গিয়ে পড়ে আর টিউবওয়েলের পানির সঙ্গে মিশে যায়। এর সমাধানে বিসিআইসির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ