ঢাকা, বুধবার 03 July 2019, ১৯ আষাঢ় ১৪২৬, ২৯ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

অপরাধ ও অপরাধ প্রবণতা

ইবনে নূরুল হুদা : আইনের পরিভাষায় অপরাধকে ‘সভ্যতার অবদান’ বলা হয়ে থাকে। কারণ, সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথেই অপরাধকে সংবিধিবদ্ধ করার মাধ্যমে জনজীবনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হয়। আর অপরাধ যখন সংজ্ঞায়িত হলো তখন অপরাধ প্রবণতাকে সীমিত পর্যায়ে রাখা বা প্রতিবিধানের আবশ্যকতাও দেখা দেয়। এই আবশ্যকতা থেকেই রাষ্ট্রচিন্তায় গতিশীলতা আসে। কালের বিবর্তনে ও সময়ের প্রয়োজনে রাষ্ট্রের ক্রমবিকাশ, পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন হয়ে এখন আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সূচনা হয়েছে। বর্তমান সময়ে তা অনেকটা সফলতাও পেয়েছে বলা যায়। যদিও তা কখনো পরিপূর্ণতা পায়নি। 
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণের জানমালের নিরাপত্তাসহ জনজীবনে শৃঙ্খলা নিশ্চিতের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব যেহেতু সরকারের হাতে তাই এই দায়িত্ব সরকারের বলাটাই অধিক যুক্তিযুক্ত। তাই রাষ্ট্র ও জননিরাপত্তা একে অপরের পরিপুরক। যৌক্তিক কারণেই রাষ্ট্র এই দায়-দায়িত্ব কোন ভাবেই এড়াতে পারে না। তাই এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা কোন ভাবেই কাম্য নয়।
বিশ্বের সকল ভূখন্ডই রাষ্ট্রের অধীন হলেও কোন রাষ্ট্রই অপরাধ মুক্ত নয়। সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যেই অপরাধ প্রবণতার অস্তিত্ব আছে বা থাকতেই পারে। তাই মানুষের কাজকে নেতিবাচক প্রভাব থেকে বের করে ইতিবাচক পথে পরিচালিত করার দায়িত্ব ও  ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতেই ন্যস্ত। একথা অনস্বীকার্য যে, উন্নত, উন্নয়নশীল, স্বল্পোন্নত ও অনুন্নত সকল দেশেই অপরাধ সংঘঠিত হয়। এসব রাষ্ট্রে অপরাধ ও অপরাধ প্রবণতা প্রতিবিধানে রাষ্ট্রকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। এজন্য বিশ্বের সকল রাষ্ট্রেই রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমকে গতিশীল রাখতে শাসনতন্ত্র বা সংবিধানের আবশ্যকতা দেখা দেয়। আর গৃহীত শাসনতন্ত্রের আলোকেই রাষ্ট্রের সবকিছুই পরিচালিত হয়।
অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য দন্ডবিধি, আইন-আদালত, প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল এবং অবকাঠামো শুধু রাষ্ট্রের অঙ্গই নয় বরং সম্পূরকও। কিন্তু রাষ্ট্র যে সকল ক্ষেত্রেই পুরোপুরি সফল হয় এমনও নয়। খুব প্রাসঙ্গিক কারণেই বিশ্বের কোন রাষ্ট্র থেকেই অপরাধ প্রবণতার নির্মূল করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে তা সীমিত ও সহনীয় পর্যায়ে রাখা অবশ্যই সম্ভব যদি রাষ্ট্র যথাযথভাবে ক্রিয়াশীল থাকে।
যেসব দেশে জনজীবনে শান্তি, শৃঙ্খলা রক্ষা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রে সহযোগি অঙ্গগুলো ক্রিয়াশীল থাকে সেসব দেশে অপরাধ প্রবণতা সীমিত ও সহনীয় পর্যায়ে রাখা খুবই সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশে অপরাধ প্রবণতা একেবারেই লাগামহীন। ক্ষেত্র বিশেষে অপ্রতিরোধ্যও বলা যায়। এতে প্রতীয়মান হয়, আমাদের দেশে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও রাষ্ট্রযন্ত্র যথাযথভাবে ক্রিয়াশীল ও কার্যকর নয়। আর রাষ্ট্রের এই নির্লিপ্ত ও উদাসীনতার সুযোগের দেশে অপরাধ প্রবণতা ফুলে-ফলে একেবারে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে বলা যায়। মূলত বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও অপরাধীর শান্তি না হওয়ায় আমাদের দেশের অপরাধ প্রবণতা ক্রমবর্ধমানই বলতে হবে। আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীদের শাস্তি হয় না বরং ক্ষেত্রে বিশেষে চিহ্নিত অপরাধীরা বিভিন্নভাবে আনুকুল্যও পেয়ে থাকে। যা একটি সভ্য ও স্বাধীন সমাজের নিঃসন্দেহের দুর্ভাগ্যজনক।
একটি দেশের রাজনীতি জনগণের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। তাই দেশ ও জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে জনগণের ভাগ্য উন্নয়ন করতে হলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুস্থ্যধারার রাজনীতি চর্চার কোন বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান বেশ হতশাব্যঞ্জকই বলতে হবে। মূলত আমাদের দেশের রাজনীতি এখনও জনবান্ধব হয়ে উঠেনি বরং তা শ্রেনিবিশেষ ও গোষ্ঠী বিশেষের উচ্চাভিলাষ চরিতার্থের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে। ফলে প্রচলিত রাজনীতি থেকে নাগরিকরা যেভাবে উপকৃত হওয়ার কথা সেভাবে উপকৃত না হয়ে রাজনৈতিক কারণেই অনেক ক্ষেত্রেই নিগ্রহের শিকার হচেছ। শুধু তাই নয়, প্রচলিত রাজনীতি শ্রেণি বিশেষের জন্য মনোরঞ্জিকা হলেও সাধারণ মানুষের স্বার্থ বরাবরই উপেক্ষিত হচ্ছে। উপকৃত হচ্ছে একশ্রেণির টাউট-বাটপার ও রাজনৈতিক ফরিয়ারা। যা আমাদের জাতিস্বত্তাকে ক্রমেই দুর্বল করে দিচ্ছে।
সঙ্গত কারণেই আমাদের দেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলো সাধারণ মানুষের অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। ক্ষমতাসীনরাও জনগণের স্বার্থে কাজ করার পরিবর্তে নিজেদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য তাদের সকল মেধা, মনন, মনোযোগ ও শক্তি কাজে লাগাচ্ছে বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। যারা ক্ষমতার বাইরে তাদেরও ধ্যান-জ্ঞান ক্ষমতাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। ফলে একদিকে সরকার জনগণের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছে অন্যদিকে অপরাপর রাজনৈতিক শক্তিগুলোও জনগণের কল্যাণে তেমন কিছুই করতে পারছে না। একটা সংকীর্ণ বৃত্তেই বিরোধী দলীয় রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু এ অবস্থা থেকে দেশ ও জাতিকে উদ্ধার করা যাদের দায়িত্ব তারা সঠিক কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। ফলে অপরাধ প্রবণতা হয়ে উঠেছে অপ্রতিরোধ্যই । এ বিষয়ে কোন পক্ষকে ত্রাতার ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে না বরং একটা অনাকাঙ্ঘিত উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতা আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে। বিষয়টি নিয়ে গণসচেতনতার অভাবের বিষয়টিও উপেক্ষার করার মত নয়। ফলে সমস্যাটা এখন বহুপাক্ষিকই হয়ে পড়েছে।
সঙ্গত কারণেই আমাদের দেশ এখন অপরাধ ও অপরাধীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে বলা যায়। দেশে হত্যা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, দুর্নীতি, খুন, ধর্ষণ, নারীনির্যাতন, রাজনৈতিক নিপীড়ন, গুপ্তহত্যা, গুম ও অপহরণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। রাষ্ট্র তার প্রতিকার বা প্রতিবিধান করতে পারছে না। এমনকি জনগণের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অধিক স্বেচ্ছাচারী, অনিয়ম প্রবণ ও ্দুর্নীতিগ্রস্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয় রাষ্ট্রের দুর্নীতি দমনে নিয়োজিত দুর্নীতি দমন কমিশন দুর্নীতিমুক্ত নয় বলেই অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তাই পৃথিবী জুড়ে শান্তি বাড়লেও বৈশ্বিক শান্তি সূচকে বাংলাদেশের বড় ধরনের অবনমন ঘটেছে। এজন্য দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ক্রমবর্ধমান অপরাধ ও অপরাধ প্রবণতাকে দায়ি করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইকনোমিকস অ্যান্ড পিস প্রকাশিত বৈশ্বিক শান্তি সূচক ২০১৯ অনুযায়ী এক্ষেত্রে বড় ধরনের অবনতি হয়েছে আমাদের। সিডনিভিত্তিক এ সংস্থাটি সম্প্রতি তাদের ২০১৯ সালের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে ১৬৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ এবার গতবারের তুলনায় নয় ধাপ পিছিয়ে ১০১তম অবস্থানে রয়েছে। গত বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৯৩তম।
দেশে যে অপরাধ ও অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণহীন পড়েছে তা চলতি বছরের ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের পরিসংখ্যান থেকে উপলব্ধি করা যায়। প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম সাড়ে তিন মাসে ৩৯৬ জন নারী-শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। খোদ পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনের মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৩৯টি এবং হত্যা মামলা হয়েছে ৩৫১টি। বেসরকারি সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনে সারা দেশে ৪৭ শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। ৪৭ শিশুর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৩৯ জন। শিশু ধর্ষণের ঘটনায় শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
উপরের আলোচনা থেকে দেশে অপরাধ প্রবণতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্রই ফুটে উঠেছে। যা একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সমাজে কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে দেশে যত অপরাধ সংঘঠিত হয়েছে এর নজীর বিশ্বের আর কোন দেশে আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিবিধানে রাষ্ট্র বা সরকারের কার্যকর কোন ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়নি। কোথাও কোথাও ছোটখাট তৎপরতা লক্ষ্য করা গেলেও সেসব ক্ষেত্রে সাফল্য একেবারে নেই বললেই চলে। মূলত রাষ্ট্র বা সরকার এ বিষয়ে সক্রিয় থাকলে অপরাধ প্রবণতা এই লাগামহীন জয়জয়কার কোন ভাবেই সম্ভব ছিল না।
আসলে জাতি হিসেবে আমরা কোন পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছি কি না তা কোন ভাবেই বোধগম্য হচেছ না। কারণ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সেন্ট অগাস্টিন মনে করে রাষ্ট্র হলো মানুষের আদি পাপের ফলশ্রুতি। রাষ্ট্রীয় জীবনের মাধ্যমে প্রায়শ্চিত্ত সম্পন্ন হলে মানুষ আবার স্বর্গরাজ্যের যোগ্য হয়ে ওঠে। তাই আমাদের এই প্রায়শ্চিত্তটা কবে নাগাদ শেষ হবে তা বলার খুব একটা সুযোগ থাকছে না। তাই আমাদের পক্ষে স্বর্গরাজ্যের আশা করাটা সঙ্গত হবে না বরং আমাদের অনাদিকাল পর্যন্ত নরকরাজ্যের যন্ত্রণায় ভোট করতে হবে-সার্বিক পরিস্থিতি সেদিকেই অঙ্গুলী নির্দেশ করছে।
অবশ্য সেন্ট টমাস এক্যুনাস অগাষ্টিনের এ মতবাদ পরিহার করে এরিষ্টটলের সাথে সুর মিলিয়ে বলেন, রাষ্ট্র একটি প্রাকৃতিক সংস্থা। তার মতে রাষ্ট্র কল্যাণ সাধনের একক বিশিষ্ট সংস্থা। প্রয়োজনীয় অথচ ক্ষতিকর প্রতিষ্ঠান নয়। কল্যাণকর সংস্থা হিসেবে রাষ্ট্রের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত এবং এর শিক্ষামূলক কার্যক্রম রয়েছে। এরিষ্টটলকে অনুসরণ করে তিনি বলেন, সুন্দর ও সৎ জীবনের জন্য সুষ্ঠু এক অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রয়োজনীয় এবং এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের এক উজ্জল ভূমিকা রয়েছে। রাষ্ট্র বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করবে। ন্যায়ানুগ মজুরীর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। দ্রব্যমূল্য সঠিক পর্যায়ে রাখবে এবং মুনাফা সীমিত করবে। রাষ্ট্র দরিদ্র ও দুস্থদের সহায়তা করবে।
তার মতে, সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক কল্যাণের জন্য রাষ্ট্র আইন প্রণয়ন করবে। তাছাড়া আত্মার মুক্তির জন্য ধর্মশালা যাতে তার যথার্থভাবে কাজ করে যেতে পারে তার উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলবে এবং নাগরিকদের জীবনে এক শৃঙ্খলাবোধ জাগ্রত করবে। রাজনৈতিক কর্তৃত্বের স্বরূপ ও প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে টমাস রাষ্ট্রকে ব্যাপক স্বর্গীয় ব্যবস্থার অংশ বিশেষ হিসেবে দেখেছেন। এরিষ্টটল ও সেন্ট টমাস অক্যুনাসের মতবাদের মধ্যে যে স্বাতন্ত্র্য তার মূল এখানে। কিন্তু আমাদের দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা সেন্ট টমাসের রাষ্ট্রচিন্তা থেকে যোজন যোজন দুরে অবস্থান করছি। সুন্দর ও সুকুমার বৃত্তির চর্চার পরিবর্তে আমরা একটা অশুভবৃত্তির মধ্যেই আটকা পড়েছি। আমরা আমাদের ধর্মশালাগুলোকে সক্রিয় করার পরিবর্তে ক্রমেই নিষ্ক্রিয় করে ফেলছি। শুধু তাই নয় অনেক ক্ষেত্রে এসব সম্পর্কে বিষোদগারও করা হচ্ছে। আর এর পরিসরটাও ক্রমেই বাড়ছে। তাই আমাদের এই অধঃপতনটাও অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
সেন্ট টমাস এক্যুনাসের ভাষায়, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে নৈতিক মানের ঔজ্জল্যে। তাই রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হবে সীমিত এবং তা আইনের সীমারেখায় হবে আবর্তিত। যে সরকার আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয় না তা অবৈধ ও পীড়নমূলক। অবশ্য সরকারের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আর তেমন কিছুই তিনি বলেন নি। তিনি রোমান আইনের সাথে পরিচিত ছিলেন কিন্তু আইনের উপরও সার্বভৌমের ক্ষমতা বিস্তৃত হতে পারে সে সম্পর্কে কিছুই বলেন নি। পোপ ও রাজকীয় শক্তির দ্বন্দ্ব সম্পর্কে তৎকালীন সাহিত্যে যা লেখা হয়েছিল, সে সম্পর্কেও তিনি অবহিত ছিলেন। তথাপি তিনি রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সঠিক ভিত্তি সম্পর্কে বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হননি।
মূলত শাসকগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক শক্তি দেশের মানুষকে বন্ধু মনে করতে পারছে না বরং তাদেরকে বরাবরই প্রতিপক্ষই ভাবা হচ্ছে। তাই আমাদের দেশের রাজনীতি এখনও গণমুখী হয়ে উঠেনি। উপর্যুপরি রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই জনগণ ক্রমেই রাজনীতিবিমূখ হয়ে উঠতে শুরু করেছে। আর দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে রাজনীতিবিমূখ রেখে কোন ভাবেই জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতি সম্ভব নয়। সম্ভবত আমাদের দেশের রাজনীতিকরা বহুল আলোচিত-সমালোচিত রাষ্ট্রচিন্তক মেকিয়াভেলির রাষ্ট্রচিন্তার প্রভাবেই প্রভাবিত হচ্ছেন। মেকিয়াভেলির ভাষায়, ‘If men were entirely good this precept would not hold, but because they are bad and will not keep faith you, you too are not bound to observe it with them’.
অর্থাৎ ‘জনগণ যদি সত্যিই উত্তম হতো তাহলে এই উপদেশের প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু তারা অসৎ এবং আপনার উপর তারা আস্থাহীন। সুতরাং তাদের ওপর আপনারও বিশ্বাস রাখার দরকার নেই’।
মূলত জনগণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের এমন ভ্রষ্ট ও অযৌক্তিক মূল্যায়ন আমাদের জাতিসত্ত্বাকে হীনবল করে ফেলেছে। তাই জনজীবনে সার্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে জনগণকে আস্থায় এনে গণমুখী রাজনীতির সূচনা করতে হবে। লাগাম টেনে ধরতে হবে অপরাধ ও অপরাধ সংশ্লিষ্টদের। আর এভাবেই রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। অন্যথায় আমাদের সকল অর্জনই ব্যর্থ হতে বাধ্য।
inhuda71@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ