ঢাকা, বুধবার 03 July 2019, ১৯ আষাঢ় ১৪২৬, ২৯ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সোস্যাল ক্রাইসিস

হাবিবা বিনতে নুরুন্নবী : প্রায় ভাবি বাংলাদেশের মানুষের চিন্তাভাবনা, ধ্যান ধারনার জায়গাটা বরাবরই অতি ক্ষুদ্র গন্ডীর মধ্যে কেন ঘুরপাক খায়? যৌক্তিক, বাস্তবসম্মত, সময়োপযোগী, সৌজন্যবোধ, আন্তরিকতা আর অফ কোর্স একতরফা নয় বরং সচেতনতার সাথে সার্বিক দিক বিবেচনা করে যে কোন সিদ্ধান্ত কিংবা অভিমত, পদক্ষেপের এখানে যেন আকাল পড়েছে। আগে ভাবতাম সোস্যাল মিডিয়ায় কে কি বললো, কি ইফেক্ট পড়লো এগুলো নিয়ে চিন্তা করলেই সময় নষ্ট, বাস্তব জগতে মিডিয়ার ভূমিকাতেই বেশি গুরুত্ব দিতাম। কিন্তু সময় এখন অনেক গড়িয়েছে। আজকাল মানুষ সোস্যাল মিডিয়াকেই যেকোন আন্দোলন ও দাওয়াহর কাজে, মতামত, পরামর্শদানে, অফিসিয়াল, আনঅফিসিয়াল সমস্ত ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। যার ফলে এ অঙ্গন হতে গা বাঁচিয়ে সমাজ পরিবর্তনের চিন্তা করা যাচ্ছেনা। কিন্তু এই মিডিয়ার ব্যবহারে অধিকাংশই সচেতন নয় বরং বিনোদনকামী। অথচ এটি এখন শুধু বিনোদনের ক্ষেত্র নয়, রাজনৈতিক অরাজনৈতিক সকল সম্পর্ক এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
কদিন আগে সাফা কবির নামক একজন মডেল তার পরকালে অবিশ্বাসের ভিডিও কে কেন্দ্র করে যে ট্রল এর ঝড় বয়ে গেল বিষয়টা কতটুকু যৌক্তিক? তার নিজস্ব বিশ্বাস নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে হেনস্তা করাটা যেমন আমার কাছে মূর্খামী মনে হয়েছে তেমনি মুসলমানদের বিশ্বাস, দ্বীনের সৌন্দর্যবোধ ও দ্বীন প্রচারের যে চারিত্রিক ও বাস্তবিক দিক কতটা নীচে নেমে গেছে সেটাও লক্ষণীয়। হুম... আমাদের ঈমানী বিশ্বাসের ওপর আঘাত হানুক এমনটি আমরা চাইব না কিন্তু বিশ্বাসের চারিত্রিক প্রতিফলনতো হওয়া উচিত আমাদের কর্মক্ষেত্র, কথাবার্তা, মোয়ামালাত ইত্যাদির মধ্য দিয়ে। হোক না তা সামাজিক মাধ্যম, হোক না তা বাসে, চা দোকানে, চাকরিক্ষেত্রে। কেউ আমাকে চিনেনা, জানেনা বলেইকি আমার অসুন্দর, লাগামহীন কথা ও কাজ ফেইসবুকে প্রকাশ করতে হবে, নিজের রাগ ঝাড়তে হবে? আমার দু কাঁধে সওয়ার কিরামান কাতিবিন কি আমার কৃতকর্ম লিখছেননা, আল্লাহ কি দেখছেননা আমি রাতের আঁধারে আর দিনের আলোতে কি করছি??
সামাজিক মাধ্যমসমূহকে যথেচ্ছ ব্যবহার করার দিকে সচেতন হওয়া দরকার। কারণ এটি এখন মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা দেখতে পাই সোস্যাল মিডিয়ার তীব্র প্রতিক্রিয়ায় ও জনগণের সমর্থনে নুসরাত হত্যার সঠিক ইতিহাস, যে সরকারের ছত্রছায়ায় কুলাঙ্গার সিরাজের নানা ঘৃণ্যনীয় কর্মকা- ক্রমে শিকড় গজাচ্ছিল, সে সরকার এখন বাধ্য হচ্ছে তার সঠিক বিচার করার। এমনি অনেক ঘটনা ছড়িয়ে আছে চারদিক। তাই সঠিক মতামত, চিন্তাশীলতা, সচেতনতাকে পুঁজি করে ইসলামের আদর্শকে হাতিয়ার করে এর ব্যবহার করা উচিত। বাস্তব ক্ষেত্রে কোন মানুষের সামনে বা সমাজের সামনে আমি নিজেকে প্রেজেন্ট করি সেভাবেই সোস্যাল অঙ্গনে প্রেজেন্ট করা চাই।
মানুষের মধ্য সমালোচনা করা আর হাস্যরস করার ফ্রিকোয়েন্সী দেখে মনে হচ্ছে এ প্রজন্ম দ্বীনের প্রায়োগিক দিকটি সম্পর্কে অচেতন ও সাথে সাথে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ও অবদান সম্পর্কে অজ্ঞ, তার জীবনের চলার পথে কোন আদর্শ নেই, নেই কোন কালা কানুন। চলছে তো চলছেই, কোন কিছুকেই সিরিয়াসলি নিচ্ছেনা বা নিলেও তার থেকে নির্যাস নিয়ে কর্তব্য স্থির করতে পারছেনা। যে যেদিকে টানছে সেদিকেই গলার রশি ধরিয়ে দিচ্ছে যেন। কয়েকদিন মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারীর সিক্সপ্যাক নিয়ে মানুষজন এই দল সেই দলের কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়ির দর্শক হিসেবে ভূমিকারত ছিল আবার কয়েকদিন বনানীর নাইমকে নিয়ে রাজনৈতিক স্ক্যান্ডাল...।
এত তামাসার ভিতর দিয়ে এক তামাসার জাতিতে বিবর্তিত হয়ে গেছি আমরা, ইভেন তামাসার সরকারও আমাদের নিয়ে তামাসা করে যেমন বিমান হাইজ্যাকের ঘটনা। এই তামাসাপ্রিয় বাঙালীর নাকে মুলা ঝুলানোর সব রকম ষড়যন্ত্রের সুযোগ যেকোন দল বা গোষ্ঠী এখানে লুফে নেয় রাতদিন। এগুলা দাবানোর একমাত্র উপায় :
০ আমাদেরকে ঈমান, আখলাক, দ্বীন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সচেতন হতে হবে,
০ পরস্পর পরস্পরকে নিয়ে দোষারোপ করার পরিবর্তে ভালবাসা ও আন্তরিকতার হাত বাড়িয়ে সংশোধন করতে হবে,
০ দ্বীনের দাওয়াতী চরিত্র হাসিল করা আর দ্বীন পালনে কৃপণতা বা সংকোচ না করা,
০ মানুষের ভালো কাজসমূহের তারিফ করা, খারাপ কাজসমূহ সংশোধনের ব্যক্তি পর্যায়ে চেষ্টা করা তাতে সংশোধন না হলে সামাজিকভাবে সবাই মিলে তাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া। তার দ্বারা সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে বিদ্রুপ, বিদ্বেষ, ঘৃণা ছড়ানোর পরিবর্তে গঠনমূলক পদক্ষেপ নেয়া ও মৌখিক প্রতিবাদ করার পাশাপাশি তা দমন করার চেষ্টা করা,
০ নাস্তিকদের ও বিধর্মীদের প্রশ্ন ও বিদ্বেষের যৌক্তিক ও সৌজন্যপূর্ণ উত্তর প্রদান করা, তাদেরকে তাদেরই মত আক্রমণ করে দাওয়াতের ক্ষেত্রকে কলুষিত না করা,
০ অযথা গালাগাল, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, বিদ্বেষ না ছড়ানো, অহেতুক তুচ্ছ বিষয়ে মানুষের পিছনে না লাগা,
০ ক্ষতিকর বিষয়সমূহের প্রতিবাদ জানানো, ভাল বিষয়সমূহের প্রচার ও প্রসার,
০ কেউ কেউ ইচ্ছে করেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বিতর্কিত মন্তব্য ও পোস্ট প্রদান ও ছবি আপলোড করে। এসকলকে ছড়ানোর পরিবর্তে তার থেকে ভালো, রুচিশীল ও উদাহরণযোগ্য কিছু উদ্যোগ ও অবদান রাখা ও শেয়ার করা,
০ নানা উস্কানিমূলক কথা ও কাজে উসকে না উঠে বাস্তবে মানুষের কাছে সঠিক আদর্শ পৌঁছে দেয়ার কাজ করা,
০ সমাজের মন্দ কাজগুলো উত্তম কাজ দিয়ে ঢেকে দেয়া,
০ দলাদলি, বিভক্তি থেকে দূরে থাকা,
০ নিজেদের ঈমান নিজেরাই রক্ষা করতে বেশি বেশি জ্ঞান অর্জন ও আলেম ওলামাদের দ্বারস্থ হওয়া যেন কেউ সহজেই বিভ্রান্ত না করে,
০ আলেমদের মতানৈক্য ও দলাদলির দিকে কর্ণপাত বা গ্রাহ্য না করে যে বিধানটি অধিক কোরআন ও হাদীসমূখী তা পালন করা,
০ দুষ্টচক্রের নাস্তিক বা বিধর্মী বা ভন্ড বা নামধারী আলেমদের কার্যকলাপ সম্পর্কে সচেতন থাকার জন্য ইসলাম ও জাহেলিয়াতের সকল দিক সম্পর্কে ধারণা অর্জন ও দূরে থাকার পন্থা অবলম্বন করা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ