ঢাকা, বৃহস্পতিবার 04 July 2019, ২০ আষাঢ় ১৪২৬, ৩০ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

জড় সভ্যতার বিকার চারদিকে

দার্শনিক এবং কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে নিজের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির কথা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন। শুধু তখন নয়, এখনও গোটা বিশ্বে পাশ্চাত্য সভ্যতা প্রবল। বলা যায়, পাশ্চাত্য সভ্যতাই যেন শাসন করছে পৃথিবীকে। অন্য কোনো সভ্যতা কি নেই ? চীন ও রাশিয়া অন্য ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করছে। তবে তার আলাদা স্বরূপ এখনও বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট নয়। হান্টিংটন অবশ্য ‘ক্ল্যাশ অফ সিভিলাইজেশন’ গ্রন্থে পাশ্চাত্য সভ্যতার বিপক্ষে চ্যালেঞ্জ হিসেবে অন্য একটি সভ্যতার কথা উল্লেখ করেছেন, যার নাম ‘ইসলাম’। ইসলামী সভ্যতার উজ্জ্বল ইতিহাস আছে, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও আছে; তবে এর বর্তমান প্রশ্নবোধক। মুসলমানরা যেন এই সভ্যতাকে ধারণ করার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। এখন তাদের প্রয়োজন আত্মবিশ্লেষণ ও জাগৃতি।
রবীন্দ্রনাথ যখন ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধটি রচনা করেন তখন সময়টা ছিল ১৯৪১ সাল। তখন ইংরেজদের রমরমা অবস্থা। তার ভাষায়, ‘দিনরাত মুখরিত ছিল বার্কের বাগ্মিতায়, মেকলের ভাষা-প্রবাহের তরঙ্গভঙ্গে; নিয়তই আলোচনা চলতো শেক্সপিয়ারের নাটক নিয়ে, বায়রনের কাব্য নিয়ে এবং তখনকার পলিটিক্সে সর্বমানবের বিজয় ঘোষণায়।’ রবীন্দ্রনাথ তখন অন্য অনেক গুণীজনের মতো ইংরেজ তথা পাশ্চাত্য সভ্যতায় বৈদগ্ধ্যে মুগ্ধ ছিলেন। তিনি আরও লিখেন, ‘তখন আমরা স্বজাতির স্বাধীনতার সাধনা আরম্ভ করেছিলুম, কিন্তু অন্তরে অন্তরে ছিল ইংরেজি জাতির ঔদার্যের প্রতি বিশ্বাস।’ ঘটনা প্রবাহে ও বাস্তব অভিজ্ঞতায় পরে অবশ্য পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রতি কবির মোহভঙ্গ হয়। ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধেই তিনি লেখেন, ‘যখন সভ্য জগতের মহিমাধ্যানে একান্ত মনে নিবিষ্ট ছিলেম, তখন কোন দিন সভ্য নামধারী মানব আদর্শের এতো বড় নিষ্ঠুর বিকৃত রূপ কল্পনা করতেই পারিনি; অবশেষে দেখেছি একদিন এই বিকারের ভিতর দিয়ে বহু কোটি জনসাধারণের প্রতি সভ্য জাতির অপরিসীম অবজ্ঞাপূর্ণ ঔদাসীন্য।’
‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধটি রচনার পরপরই শান্তিনিকেতনে ১৩৪৮ সনের ১ বৈশাখে (১৯৪১) রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় শেষ জন্মোৎসব উপলক্ষে তা পুস্তিকাকারে বিতরণ করা হয়। উত্তরায়ণ প্রাঙ্গণে সমবেত আশ্রমবাসী ও অতিথি-অভ্যাগতের সামনে কবির উপস্থিতিতে প্রবন্ধটি পাঠ করে শোনান শিতিমোহন সেন। তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স ৮০ বছর।
১৯৪১ সালে রচিত প্রবন্ধটি নিয়ে আজ ২০১৯ সালে আমরা কথা বলছি। ইতোমধ্যে প্রায় ৭৮টি বছর গত হয়ে গেছে। কিন্তু এতো বছর পরও সভ্যতা মননে ও গতরে কোন পরিবর্তন ঘটেছে কী? এক সময় তো পাশ্চাত্য সভ্যতার বৈদগ্ধ্যে, পলিটিক্সে, সর্বমানবের বিজয় ঘোষণায় মুগ্ধ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনিই আবার এই সভ্যতায় লক্ষ্য করলেন মানব আদর্শের নিষ্ঠুর বিকৃত রূপ। শুধু তাই নয়, ওই সভ্যতার বিকারের মধ্যে তিনি আরও উপলব্ধি করলেন বহু কোটি জনসাধারণের প্রতি সভ্য জাতির অপরিসীম অবজ্ঞাপূর্ণ ঔদাসীন্য। তেমন বাস্তবতা আমরা এখনও লক্ষ্য করছি বর্তমান বিশ্ব সভ্যতায়। ফলে বিশ্বের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের মনে আশাবাদের বীজ অঙ্কুরিত হতে পারছে না। এমন অবস্থায় আমাদের এই উপমহাদেশের রাজনীতিবিদ, চিন্তাবিদ ও গুণীজনরা কি অনাকাক্সিক্ষত বর্তমান বিশ্বসভ্যতা, সর্বমানবের জন্য নতুন কোন বার্তা দিতে পারেন না ? এই প্রসঙ্গে আমরা ভারতের কথা উল্লেখ করতে পারি। ভারত একটি বড় দেশ, শত কোটির বেশি মানুষ দেশটিতে বসবাস করে থাকেন। কত ধর্ম, কত বর্ণ, কত ভাষা দেশটিতে! দেশটির নেতৃবৃন্দ ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ঘোষণা করেন ভারতকে আর বহু ধর্ম ও বর্ণের দেশটিতে সর্বমানবের দর্শন হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল ‘বৈচিত্র্যে ঐক্যকে’। ভারতে সর্বমানবের সমাজ গড়ার ব্যাপারে অনেকেই কথা বলে থাকেন; অরুদ্ধতী রায় ও নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন এ ক্ষেত্রে বেশ সোচ্চার। তবে ভারতের ক্ষমতার আসনে যারা আসা-যাওয়া করেন তাদের অনেকের আচরণই বেশ প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষ করে ভারতের মোদি সরকারের আমলে সর্বমানবের ভারতের বদলে সরকারি ঘরানার লোকজন যেন হিন্দুভারত গড়ার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী। গো-রক্ষা আন্দোলনের নামে মুসলিম নিধন ও নির্যাতন, ‘নাগরিক পঞ্জি’ তৈরির নামে সংখ্যালঘুদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি ও  বন্দী শিবিরে আটক; অন্য ধর্মাবলম্বীদের ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করাÑ এসব উদাহরণ কিন্তু বিশ্বসভ্যতা কিংবা আমাদের উপমহাদেশের জন্য কোন শুভবার্তা বহন করে না। তাহলে সর্বমানবের জন্য নতুন সভ্যতা গড়ে তুলবে কারা? রবীন্দ্রনাথের আকাক্সক্ষা পূরণে ভারত কি সফল হবে না! তাহলে তো সর্বমানবের সভ্যতার জন্য আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।
বিশ্বসভ্যতার অভিঘাত ক্ষুদ্র দেশেও প্রভাব ফেলে। এ কারণে চিন্তাশীল মানুষ বিশ্ব সভ্যতা নিয়ে ভাবেন, মন্তব্য করেন, প্রতিবাদও করেন। আর সমাজ-সভ্যতা? আমরা তো সমাজেরই মানুষ। আমাদের আচরণেই তো গড়ে উঠেছে সমাজ। সমাজের নাগরিকরাই তো সমাজ-সভ্যতার কারিগর। তবে এখানে সবার দায়িত্ব এক রকম নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব তো আলাদা-আলাদা। রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও সরকারের দায়িত্বকে এক কাতারে ফেলা যায় না। তবে এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, সমাজ-সভ্যতা বিনির্মাণে নিজ নিজ জায়গায় সবারই দায়দায়িত্ব রয়েছে; আর দায়িত্বে মাত্রা ও পরিমাণগত পার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের সমাজ-সভ্যতার রূপটা এখন কেমন? কেমন সমাজে আমরা বসবাস করছি।
৩০ জুনের (২০১৯) একটি জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিকের প্রধান শিরোনাম ছিল ‘বীভৎসরূপে সামাজিক অপরাধ’। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, পারিবারিক ও সামাজিক অপরাধের মাত্রা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বীভৎস ও নিষ্ঠুরভাবে খুন হচ্ছে মানুষ। ধর্ষণ করা হচ্ছে শিশু থেকে ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধাকে। সন্তানের হাতে বাবা-মা, বাবা-মার হাতে খুন হচ্ছে সন্তান। শিক্ষকের ধর্ষণের শিকার হচ্ছে ছাত্রী। সমাজের সর্বস্তরে যেন ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে অপরাধ। তুচ্ছ ঘটনায় মানুষ মানুষকে হত্যা করছে। কখনও প্রকাশ্য কুপিয়ে, কখনও পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে। যতই দিন যাচ্ছে ততই সমাজে অপরাধের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। মাদকের প্রভাব, সম্পদের লোভ, রাতারাতি ধনী হওয়ার বাসনা, সুস্থ ধারার বিনোদনের অভাব, নানা ধরনের বৈষম্য ও অসঙ্গতিকে ওইসব অপরাধের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন অপরাধ বিজ্ঞানীরা। এছাড়া তরুণদের মধ্যে সৃষ্ট হতাশা, আইন প্রয়োগে ব্যর্থতা, পারিবারিক শিক্ষাদীক্ষার অভাব এবং ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন বিশ্লেষকরা।
কোন সমাজে অপরাধের মাত্রা যখন বীভৎস রূপ ধারণ করে তখন তো অপরাধ বিজ্ঞানীরা-বিশ্লেষকরা তার কারণ খোঁজার চেষ্টা করবেনই। এখানেও আমরা সেটা লক্ষ্য করেছি। যৌক্তিকভাবেই তারা কিছু কারণ তুলে ধরেছেন এবং সেখান থেকে অপরাধ দূরীকরণের কিছু ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। বীভৎস অপরাধের বিশ্লেষণে ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। যেন আর দশটা কারণের মধ্যে এটাও একটা কারণ। আমাদের বিবেচনায়, এ ধারার বিশ্লেষণে সংকটের গভীরে পৌঁছা যাবে না এবং ধর্ম-দর্শনের কার্যকর উপকারিতাও লাভ করা যাবে না। এ প্রসঙ্গে আরবের আইয়ামে জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগের কথা উল্লেখ করা যায়। বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে অপরাধের যে বীভৎস রূপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তার সবই ছিল আরবের ওই সমাজে। এমনকি ওই সমাজে কন্যাশিশুদের জীবন্ত কবর দেয়া হতো। কিন্তু ওই অন্ধকার সমাজ আলোকিত সমাজে পরিবর্তিত হলো কেমন করে? সংক্ষিপ্ত এই পরিসরে দু’টি কথাই শুধু উল্লেখ করতে চাই। নবী মোহাম্মদ (স.) ধর্মকে পরিপূর্ণ জীবনবিধান হিসেবে মেনে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন আরবের পথভ্রষ্ট সমাজের মানুষদের। ওই আহ্বানে সাড়া দিয়ে মানুষ যখন নিজেকে প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহর বান্দায় পরিণত করলো, তখনই সমাজ হয়ে উঠল আলোকিত শান্তির সমাজ। বর্তমান ঝলমলে এই জাহেলিয়াতের যুগেও আরবের ওই মডেলই মানুষের জন্য উপকারী ও কার্যকর হতে পারে। বিষয়টি আমরা উপলব্ধি করবো কী?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ