ঢাকা, বৃহস্পতিবার 04 July 2019, ২০ আষাঢ় ১৪২৬, ৩০ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

‘জিরো জিারো সেভেন’ এর গডফাদারদের দৌড়ঝাপ

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : বরগুনায় প্রকাশ্য দিবালোকে স্ত্রীর সামনে স্বামীকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় হালের আলোচিত ০০৭ গ্রুপের টীম লিডার ‘নয়ন বন্ড’ কথিত বন্দুক যুদ্ধে নিহত হওয়ায় ওই গ্রুপের গডফাদাররা সাময়িক স্বস্তি পেলেও থলের বিড়াল যাতে বের না হয় সে জন্য ব্যপক দৌড়ঝাপ শুরু করেছেন। যাদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহযোগিতায় একজন কিশোর কি ভাবে ‘০০৭’ গ্রুপ গড়ে তুলেছেন-তাদের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে শুরু করেছে আইনশৃংখলাবাহিনীর সদস্যসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। ওই গ্রপের কর্মকান্ড নিয়েও শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষন। নয়ন বন্ড ও তার গ্রপের সদস্যদের অপরাধের তালিকা ধরেই চলছে গডফাদারদের খোঁজ। খবর স্থানীয় একাধিক সুত্রের ।
জানা গেছে , রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় ইতিমধ্যে বেশকজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এছাড়া প্রধান অভিযুক্ত নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। পাশাপাশি কিশোর গ্যাং গ্রুপ জিরো জিরো সেভেন এর পেছনে কারা ইন্ধন দিয়েছে এবং কজন গডফাদার রয়েছে তা জানার চেষ্টা করছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। আটককৃতদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে ওই গডফাদারদের খোঁজে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দারা।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘাতকরা একাধিক বৈঠক করে বর্বর এ হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা করে ছক আঁকে। ‘রিফাত’ কিলিং মিশনের আগে তার স্ত্রী মিন্নিকে তার স্বজনদের কোপানোর হুমকি দিয়েছিল দুর্বৃত্তরা। পথ আটকে নাজেহাল, ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি দিয়েও আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে স্বামী রিফাত শরীফ থেকে আলাদা করতে না পেরে ‘ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে’ পৈচাশিক হত্যাকান্ডের চূড়ান্ত পরিকল্পনা করে নয়ন। বিখ্যাত গোয়েন্দা জেমস বন্ডের অনুকরণে নিজের নামের শেষে বন্ড যুক্ত করে নয়ন বন্ড নামে পরিচিতি পাওয়া এই বখাটে (জিরো জিরো সেভেন) নামে একটি ম্যাসেঞ্জার গ্রুপ খোলে। অপকর্মের সঙ্গীদের করা হয় গ্রুপের সদস্য। ২০১৭/১৮ সালে স্থানীয় ক্রোক এলাকায় ২ কিশোরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হাত পাকায় এ গ্রুপের সদস্যরা। স্থানীয় মুদি দোকানি নয়া মিয়াকে মারধরসহ একের পর এক অপকর্মের কারণে পুলিশের খাতায় তাদের নাম ওঠে। এলাকায় আতঙ্ক হিসেবে পরিচিতি পায় এই গ্রুপ। ৮ মামলার আসামী হয় গ্যাং লিডার নয়ন।
এদিকে কিলিং মিশনে অংশ নেয়া ১৩ জনকে শনাক্তের পর পাঁচ জনকে আটক করে পুলিশ।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, আমরা কেউ চাই না, বরগুনার রিফাত হত্যার মতো কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটুক। এই ঘটনায় যত প্রভাবশালী লোকই জড়িত থাকুক না কেন, তাদেরকেও আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। কারণ সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন।
বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন বলেছেন, সিসি ক্যামেরার ফুটেজে ঘাতকদের চিহ্নিত করা হয়েছে। হত্যাকান্ডে জড়িত আসামীদের মধ্যে ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পলাতক আসামীরা পুলিশের নজরদারিতে আছে। শিগগিরিই তারাও ধরা পড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করনে তিনি।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, আসামীরা যেন দেশ ত্যাগ করতে না পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট সব বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও নৌ-বন্দরগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আসামীদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে জেলা পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, পিবিআই, সিআইডি ও ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট কাজ করছে।

রিফাত ফরাজী ৭ দিনের রিমান্ডে
রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার আসামী রিফাত ফরাজীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত। পুলিশের রিমান্ড আবেদনের শুনানি করে বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতের বিচারক গাজী মো. সিরাজুল ইসলাম গতকাল বুধবার এ আদেশ দেন।
বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে রিফাত ফরাজী ওই হত্যাকান্ডের প্রধান সন্দেহভাজন সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ডের প্রধান সহযোগী। তার ভাই রিশান ফরাজীকেও পুলিশ খুঁজছে। মামলার ১ নম্বর আসামী নয়ন মঙ্গলবার ভোরে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। আর ২ নম্বর আসামী রিফাত ফরাজীকে মঙ্গলবার রাত আড়াইটার দিকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন জানান।
বরগুনা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হুমায়ুন কবির জানান, গতকাল বুধবার দুপুরে রিফাত ফরাজীকে আদালতে হাজির করে দশ দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চাওয়া হয়। শুনানি শেষে বিচারক সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
গত ২৫ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জেলা শহরের কলেজ রোডে রিফাত শরীফকে (২৩) স্ত্রীর সামনেই কুপিয়ে জখম করে একদল যুবক। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে রিফাতের মৃত্যু হয়। হামলার ঘটনার একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে শুরু হয় আলোচনা। সেখানে দেখা যায়, দুই যুবক রামদা হাতে রিফাতকে একের পর এক আঘাত করে চলেছে। আর তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি স্বামীকে বাঁচানোর জন্য হামলাকারীদের ঠেকানোর চেষ্টা করছেন।
বরগুনার সরকারি কলেজের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ছাত্রী মিন্নি হামলাকারী সবাইকে চিনতে না পারার কথা জানালেও নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজী ও তার ভাই রিশান ফরাজীর নাম বলেন।
ওই ভিডিওতে কালো শার্ট ও জিন্সের সঙ্গে চোখে কালো সানগ্লাস পরিহিত যে যুবককে রামদা হাতে রিফাত শরীফকে কোপাতে দেখা যায়, তিনিই রিফাত ফারজী বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। রিফাত ফরাজী বরগুনা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ধানসিঁড়ি রোডের মো. দুলাল ফরাজীর বড় ছেলে। তার বিরুদ্ধে বরগুনা থানায় হামলা, ভাংচুর, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগে কয়েকটি মামলা রয়েছে। এছাড়া দলবল নিয়ে পুলিশের একজন এসআইয়ের বাসায় হামলা চালিয়ে ভাংচুর এবং তার স্ত্রীকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগেও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন রিফাত।
রিফাত শরীফ খুন হওয়ার পরদিন তার বাবা দুলাল শরীফ ১২ জনকে আসামী করে বরগুনা থানায় যে মামলা করেন, সেখানে সেখানে ১ নম্বরে নয়ন ও ২ নম্বরে রিফাত ফরাজীর নাম ছিল।
পরিদর্শক হুমায়ুন কবির জানান, রিফাত শরীফ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত পাঁচজন এবং সন্দেহভাজন হিসেবে পাঁচজনকে এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অলি ও তানভীর ১ জুলাই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

যেই জড়িত থাকুক আইনের আওতায় আনা হবে -ডিআইজি
রিফাত শরীফ হত্যাকান্ডের সঙ্গে যেই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে হুঁশিয়ার করেছেন বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘মামলাটি মাত্র প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। অপরাধকে আমরা অপরাধ হিসেবেই দেখবো। এর সঙ্গে যেই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসবো।’ রিফাত শরীফ হত্যা মামলার দুই নম্বর আসামী রিফাত ফরাজীকে গ্রেফতারের পর গতকাল বুধবার সকাল ১০টায় বরগুনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে গ্রেফতার রিফাত ফরাজীকেও হাজির করা হয়। এ সময় বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
ডিআইজি বলেন, ‘মামলার দুই নম্বর আসামী রিফাত ফরাজীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২ জুলাই) এ মামলার এক নম্বর আসামী নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। এ পর্যন্ত এজাহারভুক্ত পাঁচ আসামী গ্রেফতার হয়েছে। এজাহারের বাইরেও পাঁচ জনকে গ্রেফতার করেছি। তদন্তে যথেষ্ট অগ্রগতি আছে। ফলে মামলায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। এজাহারভুক্ত আসামীদের উল্লেখযোগ্য অংশই গ্রেফতার হয়েছে।’
শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রিফাত ফরাজীকে মঙ্গলবার (২ জুলাই) রাত ২টার দিকে বরগুনা সদর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে কীভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে তদন্তের স্বার্থে তা বলা যাচ্ছে না।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রিফাত ফরাজী কিছু বলেছে কিনা সাংবাদিকরা জানতে চাইলে ডিআইজি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত তেমন একটা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। পরে জিজ্ঞাসাবাদে যে তথ্য পাওয়া যাবে, তা আপনাদের (সাংবাদিকদের) জানানো হবে।’
২৬ জুন (বুধবার) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রিফাত শরীফকে প্রকাশ্যে রামদা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজীসহ দুর্বৃত্তরা। রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়শা আক্তার মিন্নি হামলাকারীদের বাধা দিয়েও স্বামীকে রক্ষা করতে পারেননি। রিফাতকে কুপিয়ে অস্ত্র উঁচিয়ে এলাকা ত্যাগ করে হামলাকারীরা। গুরুতর আহত রিফাতকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ওই দিন বিকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ