ঢাকা, শুক্রবার 5 July 2019, ২১ আষাঢ় ১৪২৬, ১ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মানুষরূপী পশুদের দিন শেষ হবে কবে?

এহসান বিন মুজাহির : বর্বরতা, অমানবিকতা এবং হত্যার মিছিল বেড়েই চলছে। প্রতিনিয়তই দেশের বিভিন্ন স্থানে কোপানোর ঘটনা ঘটছে। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক এবং অনলাইন মিডিয়ার দিকে দৃষ্টিপাত করলেই চোখে ভেসে ওঠে মানুষরূপী হিংস্র পশুদের বর্বরতার দৃশ্য! ফিল্মি স্টাইলে জীবন্ত মানুষ কোপানোর ঘটনা সামাজিক অবক্ষয়ের ভয়াবহ চিত্র দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। কোন সমাজে বাস করছি আমরা? মানবতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং আমাদের সমাজ আজ কোথায় দাঁড়িয়েছে? গত ২৬ জুন বরগুনায় কাল ১০টায় বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত মানুষের সামনে রিফাত শরীফ নামের এক যুবককে নৃশংভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হলো। গত ৬ এপ্রিল  ফেনীর সোনাগাজীতে সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। রিফাত, বিশ্বজ্যিত দাশ এবং নুসরাত জাহান রাফিকে বর্বরভাবে হত্যার ঘটনার মধ্যদিয়ে তা প্রমাণ হচ্ছে আমাদের সমাজের মানুষরুপী অমানুষরা হিং¯্র, পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট! আমরা হিং¯্র, আমরা হায়েনা তা বারবারই প্রমাণ করছি আমাদের কর্মকা-ে। আমরা কিন্তু ভুলে যাইনি বিশ্বজিৎকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা! ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একটি মিছিল থেকে জামায়াত-শিবির সন্দেহে দর্জি বিশ্বজিৎকে প্রকাশ্যে রিফাতের মতোই কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। 

গত ২৬ দিনে ২২ জনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। দেশের কয়েকটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে এ তথ্য জানা গেছে। বিভিন্ন দৈনিক এবং অনলাইন মিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্যমতে বিগত ২৬ দিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় ২২ জনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। চলিত মাসের ২৬ জুন বুধবার রাতে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় মা-ছেলেকে কুপিয়ে ও গলাকেটে হত্যা করেছে দুর্বত্তরা। ২৬ জুন নারায়ণগঞ্জে রূপগঞ্জ উপজেলায় ইউপি সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেত্রী বিউটি আক্তার কুট্টিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ২২ জুন শরীয়তপুরের নড়িয়ায় ইমরান হোসেন সরদার (৩৫) নামে এক যুবলীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। ইমরান হোসেন সরদার ওই গ্রামের মৃত ফজল সর্দারের ছেলে। ২১ জুন রাজশাহীর মোহনপুরে আসমা বেগম (৪০) নামের এক গৃহবধূকে ধর্ষণের পর কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ১৯ জুন মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাচনে জয় পাওয়া বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের হাতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর সমর্থক ও স্থানীয় ছাত্রলীগ কর্মী এরশাদ মুন্সী নিহত হয়েছেন। ১৯ জুন দামুড়হুদায় শ্বশুরবাড়িতে জামাইকে ঘরের ছাদের সঙ্গে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ১৭ জুন ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় মাদক সেবনে নিষেধ করায় আমির উদ্দিন (৮০) নামের এক বৃদ্ধকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ১৭ জুন ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মো. আরিফ হোসেন (৩৫) নামে এক যুবলীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ১৬ জুন বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে ফখরুল হাওলাদার (৪৫) নামের এক আওয়ামী লীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। ১৫ জুন বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জে ফখরুল হাওলাদার (৪৫) নামের এক আওয়ামী লীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। ১৫ জুন যশোরের চৌগাছায় পুকুর ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্বে মমিনুর রহমান (৫০) নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ১৫ জুন সিংড়ায় জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে সত্ ছোট ভাইকে কুপিয়ে হত্যা করেছে বড় ভাই এসাহাক। ১৪ জুন যশোরের চৌগাছায় পুকুর ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্বে মমিনুর রহমান (৫০) নামে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা করেছে করা হয়েছে। ১৩ জুন নাটোরের গুরুদাসপুরে মো. জালাল উদ্দিন (৬০) নামের এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হাত-পা কেটে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে খুন করেছে দুর্বৃত্তরা। ১২ জুন শায়েস্তাগঞ্জে মুক্তিরাণী দাসকে (৪০) ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ১১ জুন সাভারে পারিবারিক কলহের জের ধরে স্ত্রীকে কুড়াল দিয়ে উপর্যুপরি কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ১১ জুন নড়াইল হোমিওপ্যাথি মেডিকেল কলেজের  নৈশপ্রহরী মান্নান শেখকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ১০ জুন পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায় গৃহবধূ পারভীন আক্তারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছ্ ে৭ জুন লালমনিরহাটে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে মঞ্জু মিয়া (৪৫) নামে এক কৃষককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ৫ জুন ভোলা সদর উপজেলার ভেদুরিয়া ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হাকিম মিজিকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। (আমাদের সময় ডটকম, ২৭ জুন ২০১৯)।

কুপাকুপির ঘটনা এখনও থেমে নেই! এরপর কে? কোথায় ওঁৎ পেতে আছে মানুষরূপী হিংস্র পশুরা। অমানবিক ও বর্বর আক্রমণের শেষ কোথায়?  মানুষরূপী পশুদের পিপাসা মিটবে কবে? এই অন্ধকার সময়ের অধ্যায় শেষ হয়ে আলো আসবে কবে? নাকি কোনো দিনই আর দেখা মিলবে না সেই আলোর। আমরা কি মানুষ? পশুদের প্রাণ আছে কিন্তু বোধ বুদ্ধি নেই, তাই তারা হিংস্র জানোয়ার। আমাদের প্রাণ আছে বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন, তাই আমরা মানুষ। মনুষ্যত্ব বোধ আছে বলেই আমরা মানুষ। কিন্তু আমাদের আচার-আচরণ, সামগ্রিক চিন্তা-চেতনা ভাবনায় আমরা কি সত্যি মানুষ? আমারা কি আমাদের আচরণ দ্বারা বনের হিংস্র পশুকেও হার মানাচ্ছি না? আমরা বর্বর এবং পশুর চেয়েও অধম! একজন কোপ খাবে আর বাকিরা ভিডিও করবে এটাই যেন এ সমাজের নিয়ম।এর বাইরে আর কোনো নিয়ম বা দায়বদ্ধতা যেন নেই। তাই তো জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মানুষের পশুত্ব দেখে দুঃখভরা কণ্ঠে বলেছিলেন-‘গেছে দেশ দুঃখ নেই আবার তোরা মানুষ হ’। 

ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার সঠিক তদন্ত আসামীদের গ্রেফতার করে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা নিয়ে জনমনে বহু প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই মনে করেন বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই এই দেশে এভাবেই রিফাতদের চলে যেতে হয় অতৃপ্তি নিয়ে, আর আমাদের বেঁচে থাকতে হয় তাদের অভিশাপের বোঝা নিয়ে! এভাবেই একের পর এক হত্যার ঘটনা ঘটছে, কিন্তু কোনোই প্রতিকার হচ্ছে না। বিশ্বজিৎ দাসের সব খুনির এখনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি। তনুর হত্যাকারীদের আজও ধরা যায়নি। ধামাচাপা পড়ে গেল মিতু হত্যার বিষয়টিও। আফসানার নামও আর কেউ উচ্চারণ করছে না। যখন কোনো অপরাধ করে কেউ পার পেয়ে যায় তখনই নতুন আরো অনেক অপরাধীর জন্ম হয়। কারণ তখন সম্ভাব্য অপরাধী দেখে কই কিছুই তো হলো না। তখন সে আস্ফালন করার সুযোগ পায়, সে অপরাধ করতে সাহসী হয়। তার ওপর যদি সে হয়  কোনো রাজনৈতিক দলের  লোক তাহলে তো আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। প্রশ্ন হলো, আর কত অপকর্ম করলে বা কত মানুষকে প্রকাশ্যে কোপালে বন্ধ হবে এসব বর্বরতা?

সঠিক বিচারের মধ্য দিয়ে এ দেশে আইনের নজিরবিহীন শাসন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন যেন অধরা! বিশ্বজিৎ দাস, তনু, রিশা, আফসানা, নিতু এবং খাদিজা আখতার নার্গিস পর্যন্ত অসংখ্য ঘটনা আজ জ্বলন্ত সাক্ষী হয়ে আছে! তাদের বেলায় বলা যায় বিচারের বাণী-নীরবে নিভৃতে কাঁদে। কথাটি ছোট বেলা  থেকে শুনে আসছি। এ কথাটি তনু, রিশা, আফসানা, নিতু, খাদিজাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অনেক দিন আগে ঘটে যাওয়া হত্যার যথার্থ বিচার বিলম্বিতই শুধু হচ্ছে না, বিচার কাঁদছেও। আর বিচার বিলম্বিত হচ্ছে তদন্তের ধীরগতি, তদন্ত আটকে যাওয়া, আবার বিষয়টি রাজনৈতিক হয়ে যাওয়াসহ নানা কারণে। বিচারহীনতার এমন সংস্কৃতির এ প্রবণতা থেকে মানুষ মুক্তি চায়। জনগণ চায় প্রতিটি অপরাধের সঙ্গে জড়িত সব দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। আশা করি, দ্রুতই সরকার এবং প্রশাসন খুনিদের গ্রেফতার করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ