ঢাকা, শনিবার 6 July 2019, ২২ আষাঢ় ১৪২৬, ২ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ওজনমাপা আবুলদের কথা

আনমনে প্রতীক্ষার প্রহর গোণেন আবুল কাশেম। বয়স হতে পারে ৬৫-৭০ বছরের মতো। কখন একজন ওজন মাপাতে আসবেন এবং দুটো টাকা দেবেন। এজন্যই প্রতীক্ষা তাঁর। বাড়ি নাটোর টাউনের বড়হরিশপুর। দীর্ঘদিন ধরে ডিসি অফিসের নীচতলার বারান্দার একটি কোণে চুপ করে বসে থাকেন তিনি। আইনজীবী এবং তাঁদের মক্কেলরাই এ পথে বেশি যাতায়াত করেন। বাড়িতে তাঁর স্ত্রী আছেন। সপ্তাহে ৫ দিন এ ব্যবসা চলে। সারাদিনের আয় ৫০ থেকে ৬০ টাকা মাত্র। এতো কম রোজগারে সংসার কিভাবে চলে এমন প্রশ্নে তাঁর উত্তর ‘আল্লায় চালায়’। ছেলেমেয়ে আছে। বেশিকিছু বলতে চান না। সংসারে অন্য সদস্যদের কথা জিজ্ঞেস করতেই মুখ ঘুরিয়ে চুপ করে থাকেন। মনে হয় অনেক কিছু বলবার আছে এই না বলবার মাঝে। তাই এ পথ দিয়ে যাতায়াতের সময় প্রয়োজন না থাকলেও আবুল কাশেমের কাছে নিজের ওজনটা মাপালে দোষের কী? অনেকে করেনও তাই। কিন্তু তাতে কী হয়? কয় টাকা হয় প্রতিদিন ওজন মেপে আবুল কাশেমের!
শুধু কি নাটোরের আবুল কাশেম একা মানুষের ওজন মেপে জীবিকানির্বাহ করতে চেষ্টা করেন? এমন আরও অনেক আবুল কাশেম চোখে পড়েন। মহানগরী ঢাকার ফুটপাত, ওভারব্রিজ, বাসটার্মিনাল, আন্ডারপাস, সদরঘাট, কারওয়ানবাজার, গুলিস্তান, নিউমার্কেট, বিভিন্ন হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে রাস্তায় ওজন মাপবার ছোট্ট একটা যন্ত্র নিয়ে বসে থাকেন অনেক আবুল কাশেম। কেউ নিজের ওজন কোনও কোনও দিন মাপান। কেউ মাপানও না। চলে যান একবার অবহেলার দৃষ্টিতে আবুল কাশেমদের দিকে তাকিয়েই। কিন্তু কেউ কি ভেবে দেখেন ওজনমাপা আবুল কাশেমের কত আয় হয় প্রতিদিন? এ আয়ে সংসার চলে কিনা? কে কে আছেন ওজনমাপা আবুলের সংসারে? কোনও কোনও আবুল কাশেম আবার ব্লাডপ্রেসার মাপবার যন্ত্র নিয়েও বসেন নাটোরের আবুলের মতো। তাঁরা হয়তো কিছু টাকা বেশি পান। তাও আর কতো? ১০ থেকে ২০ টাকা হতে পারে প্রতি ক্লায়েন্টের কাছ থেকে প্রাপ্তি। এর বেশি নয়। কিন্তু তাঁদের আবার ক্লায়েন্ট কম। সারাবেলা বসে থেকে খুবজোর ১০ থেকে ১২ জন হতে পারে।
উল্লেখ্য, নতুন বাজেট পাস হয়েছে। এ বাজেট ঘোষণার আগেই অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। ঘোষণার পর আবারও বাড়ানো হয়েছে। নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হচ্ছে। এতেও জনগণের ওপর চাপ বাড়ছে। এই চাপ থেকে বাদ যাবেন না ওজন আর প্রেসার মাপবার যন্ত্র নিয়ে বসে থাকা আবুল কাশেমরাও। কারণ তাঁদের বাজার থেকে পণ্য কিনতে হয়। বাজেট, ভ্যাট এসবের প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। কিন্তু আবুলদের ওজন কিংবা ব্লাডপ্রেসার মাপবার পারিশ্রমিক বাড়েনি। বেশি দাবি করলেও পাওয়া কঠিন। এমনিতেই তাঁদের কাছে সহজে কেউ ওজন কিংবা প্রেসার মাপান না। কিন্তু তাঁরা বাজেটের আগে যেদামে পণ্য কিনতেন সেদামে কি কেনা যাবে এখন? যাবে না। তাহলে নতুন বাজেটে তাঁদের কী লাভ? বাসওয়ালা, রিকশাওয়ালা, টেক্সিওয়ালা, দোকানদার সবাই ভাড়া এবং পণ্যের বিনিময়মূল্য বেশি আদায় করবেন। কিন্তু আবুল কাশেমদের সেরকম উপায় নেই। তাঁদের কী হবে? কার কাছে যাবেন তাঁরা? নাটোরসহ সারাদেশের অফিসের বারান্দার কোণা কিংবা ফুটপাতের পাশে বসে থাকা ওজন ও প্রেসারমাপা আবুল কাশেমদের বিনিময় ২ টাকা থেকে বাড়িয়ে কেউ কি ৫ অথবা ১০ টাকা দেবেন? তবে এমন ঔদার্য দেখানো কিন্তু খুব কঠিন নয়। এতে আবুল কাশেমদের সংসার চালাবার কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ