ঢাকা, রোববার 7 July 2019, ২৩ আষাঢ় ১৪২৬, ৩ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

হিন্দি মাফিয়া ডন এবং আকাশ সংস্কৃতির কুপ্রভাব জেমস বন্ডের আদলে নয়ন বন্ডদের উত্থান

বাংলাদেশের চারিদিকে যা কিছু ঘটছে, প্রতিদিনই পত্রিকার পাতা খুললে যেখানে হত্যা, খুন, ধর্ষণ, চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা, বাসের নিচে পিষে ফেলা ইত্যাদি পড়তে হচ্ছে, সেখানে মানুষ কোথাও স্বস্তি ও সুস্থতার খোঁজ পাচ্ছে না। সারাদেশ জুড়ে আতঙ্ক। সারাদেশ জুড়ে ভয় ও নিরাপত্তা। গুরুত্বপূর্ণ এবং বড় বড় রাজনীতিবিদরাও আজ বলছেন যে, দেশে ভয়ের চাষ চলছে। চাষ করতে করতে ভয় এখন মহীরুহে পরিণত হচ্ছে। এটাকে অন্য ভাষায় বলা যায় যে, সারাদেশ এখন ভয়ের সংস্কৃতি কবলিত। সাধারণ মানুষের যখন এই অবস্থা তখন মহামান্য উচ্চ আদালতের মাননীয় বিচারপতিরাও সাধারণ মানুষের অংশ হিসাবে দেশের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত। তাই রিফাত শরীফের হত্যাকাণ্ডের শুনানির প্রারম্ভে হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতি মন্তব্য করেছেন, এ আমরা কোনো সমাজে বাস করছি? আমি ব্যক্তিগত ভাবে অন্তত এদিক দিয়ে খুশি যে উচ্চ আদালতের মাননীয় বিচারপতিগণকেও দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং খুন খারাবি নাড়া দিয়েছে। প্রতিদিন দেশে এতো লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে চলেছে যে এগুলোর হিসাব রাখা কঠিন।
এই তো সেদিন ঘটে গেলো নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার পাশবিক ঘটনা। আর এখানে রিফাতকে প্রকাশ্য দিবালোকে অনেক লোকের সামনে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করার রক্তহিম করা ঘটনা। রিফাতের স্ত্রী মিন্নি স্বামীকে ধরে বাঁচাবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ঘাতকের সংখ্যা যেখানে ২০ জন সেখানে একা মিন্নি কি করবে? অদূরে দাঁড়িয়ে কিছু লোক এই হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য উপভোগ করেছে। আর কয়েকজন তাদের মোবাইল ফোনে সেই কোপানোর দৃশ্য ধারণ করেছে।
আমরা এই হত্যাকাণ্ড এবং সেই সাথে আরও অনেক অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডের বিষয় আলোচনা করবো। কিন্তু তার আগে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করতে চাই। একটা দেশে যদি সাহিত্য সঙ্গীত সিনেমায় সুবচন থাকে, সুশিক্ষার বাণী থাকে, সততা, ন্যায় পরায়ণতা এবং উন্নত নৈতিক চরিত্রের কথা সতত বলা হয় তাহলে সেই সমাজ সেভাবেই গড়ে ওঠে। কিন্তু যদি এর বিপরীতটি ঘটে অর্থাৎ দেখা যায় দেশে রয়েছে অপরাধের সিন্ডিকেট, তাদের প্রভাব, উচ্চ মহলে তাদের কানেকশন এবং অপরাধ করলে সহজেই পার পাওয়া যায় তাহলে সেই সমাজও সেই ভাবেই গড়ে ওঠে। ছেলে-মেয়েরা যখন ক্লাস সেভেন, এইট বা নাইনে পড়ে তখন থেকেই সমাজের প্রভাব তাদের মনের ওপর গভীর ছায়াপাত ঘটায়।
আমি বহুদিন আগে একটি ইংরেজি সিনেমা দেখেছিলাম। নাম ‘জেমস বন্ড- ০০৭’। ছবিটি বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এই ছবিটির নায়ক ছিলেন সিন কোনারী। তার ছিল লাইসেন্স টু কিল এবং নারী সম্ভোগের অবাধ স্বাধীনতা। কিন্তু একটি শর্ত ছিল যে, সে যদি কোনো কারণে ধরা পড়ে অথবা ধরার পরার যদি তার মৃত্যু ঘটে তাহলে যে রাষ্ট্রের হয়ে সে কাজ করছে সেই রাষ্ট্র তার কোনো দায় দায়িত্ব নেবে না। এমনকি সে যে ঐ রাষ্ট্রের নাগরিক সেটিও অস্বীকার করা হবে। তবে এই ধরনের ছবিগুলোতে জেমস বন্ডের মতো নায়করা কোনো সময় ধরা পড়ে না। এই ধরনের সিনেমা যে পাঠকের ওপর কতখানি গভীর প্রভাব বিস্তার করে তার প্রমাণ হলো আমাদের এই নয়ন বন্ড। পুরো নাম সাব্বির আহমেদ নয়ন। নিজেকে হিরো বানানোর জন্য সে তার নামের সাথে জুড়ে দিয়েছে জেমস বন্ডের বন্ড। সে যে শুধু একাই বন্ড বনেছিল তাই নয়, সে একটি বাহিনীও গড়েছিল। বাহিনীটির সাংকেতিক নাম্বার ছিল ‘০০৭’।
 জেমস বন্ডের তুলনায় বাংলাদেশেও সেবা প্রকাশনী নামে একটি প্রকাশনী সংস্থা জেমস বন্ডের কাহিনী ছায়া অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস প্রকাশ করেন। সেই উপন্যাসের নাম হলো ‘মাসুদ রানা’। মাসুদ রানা সিরিজে অসংখ্য বই প্রকাশিত হয়েছে। হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাস সমূহ প্রকাশের পূর্বে মাসুদ রানাই ছিল সুপার হিট। জেমস বন্ডের মতো অতখানি নগ্নভাবে না হলেও মাসুদ রানা সিরিজের মাধ্যমে প্রথম বাংলাদেশের সাহিত্যে সেক্স প্রবেশ করে। 
॥দুই॥
এই বিষয়গুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা এবং সমাজের সংশোধন মূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হওয়া দরকার। ইংরেজি লেখক মারিও পূজোর বিখ্যাত উপন্যাস ‘গড ফাদার’। দুই খণ্ডে বইটির বাংলা অনুবাদও বেরিয়েছে। বাংলা অনুবাদের নামও গড ফাদার। বইটি পড়লেই বোঝা যায় লাইসেন্স টু কিল এবং লাইসেন্স টু ফ্রি সেক্স। এই বইটির চলচিত্র রূপও দেওয়া হয়েছে। এখন তো বোম্বের অসংখ্য মাফিয়া বা ডন সিরিজের থ্রিলার সিনেমা নির্মিত হয়েছে। এগুলো দর্শক গোগ্রাসে গিলছে। আর একটি ছবি দেখেছিলাম, নাম ‘প্যানিক ইন ব্যাংকক’। সুপারহিট সিনেমা। যতগুলো ছবি এবং উপন্যাসের নাম করলাম সেগুলোর প্রভাব বিষবাষ্পের মতো স্বাধীন বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। আজ যারা প্রবীণ, তারা বুকে হাত দিয়ে বলুন তো তারা যখন যৌবন পার করছিলেন তখন কি দেশে এত ক্রাইম, এত অপরাধ এত যৌন হয়রানি, এত অপহরণ, এত হত্যাকা- ছিলো?
আমি যখন ছাত্র ছিলাম তখন বগুড়ায় সিনেমা দেখতে এসে এক সুন্দরী গৃহবধূকে কয়েকজন গুণ্ডা অপহরণ করে এবং তাকে ধরে নিয়ে রেপ করে। গুণ্ডাদের সর্দার ছিল হবু মিয়া। ঘটনাটি জানজানি হওয়ার পর হবু মিয়াদের বিরুদ্ধে ছাত্র এবং যুবকরা লিফলেট বিলি করে এবং তাকে ধরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানায়। হয়তো পুলিশও তাকে খোঁজাখুঁজি করেছিল। জনগণ প্রতি পাড়ায় এবং মহল্লায় হবু মিয়া এবং তার গ্যাংকে ধরার জন্য পাহারা বসিয়েছিল। অবশেষে এই সতর্ক যুবকদের হাতেই গ্যাংসহ হবু মিয়া ধরা পড়ে এবং ঐ সৎ ও সাহসী যুবকরা হবু মিয়াদেরকে প্রচণ্ড-উত্তম মধ্যম দেয়। এটির নাম হলো হাটুরে মার বা হাটের মার। এই হাটুরে মারে গ্যাং শুদ্ধই হয়তো হবু মিয়ারা অক্কা পেতো। কিন্তু যখন জনতার মার চলছে তখন পুলিশ এসে হবু মিয়াদেরকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে।
তো এই ছিল তখনকার দিনের ছাত্র যুবক তথা সাধারণ মানুষের মানসিকতা। আজ রিফাতকে যখন চাপাতি দিয়ে কোপানো হচ্ছিলো তখন চার ধারে ভিড় করে জনতা তামাশা দেখছিলেন এবং মোবাইল ফোনের অভিশাপ হিসাবে ঐ হত্যাকা-ের ছবি তোলা হচ্ছিল। এখন যদি আপনি এসব ভয়াবহ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে চান তাহলে এই সমাজটাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সমাজ বলতে আমি সমাজের মানসিকতাকে বোঝাচ্ছি।
যদি অতি দ্রুত আমরা আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে না পারি তাহলে আমরা আরো দেখবো ঐ ৬ সন্তানের জননীকে গণধর্ষণ, তার আগে ৪ সন্তানের জননীকে গণধর্ষণ, মিতু হত্যাকান্ডের কোনো কুল কিনারা না হওয়া, তনু হত্যাকা-ের কোনো ক্লু বের না হওয়া, সাগর-রুনি হত্যাকা- প্রভৃতি ভয়াবহ অপরাধ কার্পেটের তলে চাপা পড়ে যাওয়া প্রভৃতি। এই ধরনের জঘন্য, ভয়াবহ এবং পাশবিক ঘটনা বিগত ১০ বছরে আরো অনেক ঘটেছে। সেগুলো মনে রাখা সম্ভব নয়। সেগুলো মনে রাখতে গেলে ১০/১২ বছরের খবরের কাগজের পাতা উল্টাতে হবে। তবে কাজটি করা প্রয়োজন। আয়নায় এই সমাজের প্রতিচ্ছবি দেখতে হবে। আমরা কত ভাল ছিলাম আর কতখানি বিভৎস হয়ে গেছি সেই চেহারা দেখা প্রয়োজন।
॥তিন॥
গত বৃহস্পতিবার রিফাত শরীফ হত্যা মামলার অগ্রগতি বিষয়ক শুনানিতে হাইকোর্টও বলেছেন, নয়ন বন্ডরা এক দিনে তৈরি হয় না। কেউ না কেউ তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। আদালত বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘আমরা বিচারবহির্ভূত হত্যা পছন্দ করি না। এতে পাবলিকের কাছে ভুল তথ্য যেতে পারে।’
 বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানিতে রিফাত হত্যা মামলার প্রধান আসামী সাব্বির আহমেদ ওরফে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার তথ্য জানায় রাষ্ট্রপক্ষ। একপর্যায়ে আদালত বলেন, ‘আমরা (বিচার বিভাগ) কখনোই  নির্বাহী বিভাগের যেসব দায়িত্ব পালন করার কথা, সেসব বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চাই না। এটা তাদের দায়িত্ব, তাদের রুটিন ওয়ার্ক। যদি  সেখানে কোনো ব্যত্যয় ঘটে, তখন শুধু বিচার বিভাগ নির্দেশনা বা হস্তক্ষেপ করে থাকে। তবে আমরা এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং (বিচারবহির্ভূত হত্যা) পছন্দ করি না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ বিষয়ে আরও সতর্ক হতে হবে। আইন যে সুযোগ সুবিধা দিয়েছে, তা যেন নিশ্চিত হয়।
আদালত আরও বলেন যে, নয়ন বন্ডের মতো ব্যক্তিদের সৃষ্টি করতে যারা পৃষ্ঠপোষকতা করে তাদের কি হবে? আদালতের এই মন্তব্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ ইতোমধ্যেই একশ্রেণির পত্র-পত্রিকা অভিযোগ তুলেছেন যে নয়ন বন্ড বাহিনী সৃষ্টির পেছনে  স্থানীয় একজন গড ফাদার রয়েছেন। তিনি শুধু সরকারি দলেই নাই, সেই দলের একজন প্রভাবশালী নেতা এবং একজন সংসদ সদস্য বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, নয়ন বন্ডকে  তড়িঘড়ি করে এনকাউন্টারে হত্যা করা হয়েছে। কারণ সে যদি জীবিত থাকতো এবং রিফাত হত্যার নিরপেক্ষ ও নিবিড় তদন্ত হতো তাহলে ঐ গড ফাদার এবং তার দলের অনেক অপরাধ ফাঁস হয়ে যেতো। বন্দুকযুদ্ধে নয়ন বন্ডের নিহত হওয়ার ঘটনা প্রচারিত হওয়ার কয়েক ঘন্টা পরেই বিশিষ্ট টকশো ব্যক্তিত্ব এবং ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল প্রশ্ন করেন, কেন এত তাড়াহুড়া করে নয়ন বন্ডকে হত্যা করা হলো? কারণ নয়ন বন্ডকে হত্যা করার সাথে সাথে ঐ এলাকার অপরাধ জগতের অনেক তথ্য চিরদিনের জন্য মুছে ফেলা হলো।
অন্যদিকে নয়ন বন্ড তার দলবলসহ যেরকম প্রকাশ্য দিবালোকে অনেক লোকের সামনে এবং তার স্ত্রীর সামনে রিফাতকে কুপিয়ে হত্যা করেছে সেটা দেখার পর নয়নের দোষ প্রমাণের জন্য আর নতুন কোনো স্বাক্ষী সাবুদ বা প্রমাণের প্রয়োজন ছিল না। যারা এসব বলছেন তাদের কথা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে আইন বলে যে, বিচার না করে কোনো ব্যক্তি, তার যত দোষই থাকুক, তাকে হত্যা করা যায় না।
যাই হোক, রিফাত হত্যাকাণ্ডের অবশিষ্ট আসামীগণকেও অতি দ্রুত পাকড়াও করা হোক এবং তাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হোক। এর প্রয়োজন রয়েছে। কারণ হত্যা, লুট, ধর্ষণ, গুম, খুন যেরকম মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে তার বিরুদ্ধে অতি দ্রুত সর্বোচ্চ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে অপরাধ প্রবণতা বাড়তেই থাকবে।
Email:asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ