ঢাকা, রোববার 7 July 2019, ২৩ আষাঢ় ১৪২৬, ৩ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

শহীদ জিয়া শিশু পার্ক চালুর অপেক্ষায় নগরবাসী

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : রাজধানীর অনেক পুরাতন পার্ক হিসেবে পরিচিত ‘শহীদ জিয়া শিশু পার্ক’। ক্ষমতার পালাবদল হলেও পার্কটির নামকরণ নিয়ে কেউ কিছু বলেনি। এমনকি বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও এই পার্কটির নাম পরিবর্তন করেনি। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পরই এই পার্কটি থেকে শহীদ জিয়া বাদ দিয়ে শুধু ‘শিশু পার্ক’ নামকরণ করা হয়। জানা গেছে, ঢাকার শাহবাগে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকার সময়েই ১৯৭৯ সালে শিশু পার্কটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। শিশুদের বিনোদনের জন্য পাবলিক সেক্টরে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম এই শিশু পার্কটি ১৯৮৩ সাল থেকে বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে ১৫ একর জায়গার ওপর গড়ে উঠা এ পার্ক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ঢাকা সিটি করপোরেশন। কয়েক দফা নাম বদলের পর ২০০৩ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট সরকারের সময় এর নাম হয় শহীদ জিয়া শিশু পার্ক। চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন যেসব স্থাপনার নাম পরিবর্তন করা হয়েছিল ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার অনেক স্থাপনা আগের নামে ফিরিয়ে আনে। এর মধ্যে ২০১০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করে হজরত শাহজালাল (রহ:) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করা হয়। এ ছাড়া জিয়া উদ্যানের নাম পরিবর্তন করে আগের নামেই নামকরণ করা হয় চন্দ্রিমা উদ্যান। পিরোজপুরের জিয়া নগর উপজেলার নাম বদল করে ‘ইন্দুরকানী’ রাখা হয়েছে। যাই হোক না কেন, নগরবাসী এখন শিশু পার্কটি চালুর অপেক্ষায় রয়েছে। তারা আগের ন্যায় মুক্ত বাতাসে কিছুটা সময় এখানে কাটাতে চান।  গেল বছরের ২১ মার্চ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত ‘জিয়া শিশু পার্কের’ নাম পরিবর্তন করে শুধু ‘শিশু পার্ক’ করা হয়েছে বলে জানান। এরপর থেকে শহীদ জিয়া শিশু পার্কটির নতুন নাম হয়েছে ‘শিশু পার্ক’। তিনি বলেছিলেন, বর্তমান অবস্থান থেকে কিছুটা সরিয়ে নতুন আঙ্গিকে সাজানো হবে এই পার্ককে। আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের যে জায়গাটিতে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল, সেখানে হবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ¢। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী সেদিন বলেন, ওই শিশু পার্কটির নাম এরই মধ্যে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আপনারা অনেকেই হয়ত জানেন না। নতুনভাবে ব্যাপক প্রচারের জন্য উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আমরা যখন ব্যাপক প্রচারে নামব, তখন এর প্রতিফলন হবে। তিনি বলেন, ওই স্থানেই মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় স্মৃতি জড়িত রয়েছে। এখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল স্বারিত হয়েছে। এই জায়গাটিকে বিতর্কিত করার জন্যই এখানে শিশুপার্ক করা হয়েছিল। কেননা পাকিস্তানি বাহিনী কখনই তাদের পরাজয় মেনে নিতে পারেনি। গণমাধ্যমে জিয়াকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, মুসলমানদের পরাজয়ের কোনো স্মৃতিচিহ্ন রাখতে নেই, তাই ওখানে শিশু পার্ক করা হয়েছে। জানা গেছে, পার্কটির সংস্কার কাজ চলছে। তাই এটি বন্ধ রয়েছে। অনেকেই বলছেন, রাজধানী ঢাকার বিনোদনের একমাত্র কেন্দ্রটিই ছিল শাহবাগের ‘শহীদ জিয়া শিশু পার্ক’। রাজধানীবাসীসহ বাইরে থেকে আসা বিনোদনপ্রেমীরা এখানে তাদের সময় সময় কাটাতো। যুগ যুগ ধরে চলা এই শিশু পার্কটি ছিল ইতিহাস।কিন্তু ৪০ বছর পর এভাবে সংস্কারের নামে বন্ধ করাকে কেউই মেনে নিচ্ছেন না। তারা বলছেন, সংস্কার তো চলমান প্রক্রিয়া। এটিকে চালু রেখেও সব কিছু করা যেতো। সরেজমিনে পার্কের দুটি প্রবেশপথে ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগের (যান্ত্রিক) নির্বাহী প্রকৌশলী নুর মোহাম্মদের নামে দেয়া একটি বিজ্ঞপ্তি ঝুলছে। তাতে লেখা রয়েছে, ‘ঢাকাস্থ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ (তৃতীয় পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় শাহবাগ শিশুপার্কের উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন কাজ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন থাকায় অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় শিশুপার্ক সর্বসাধারণের জন্য বন্ধ থাকবে। পার্কের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কাজের সমাপ্তির পর শিশুপার্কটি সর্বসাধারণের জন্য খোলার বিষয়ে পুনরায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।’ সূত্র জানায়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২৬৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের (তৃতীয় প্রকল্প) অধীনে ৫০০টি ভূগর্ভস্থ গাড়ি পার্কিং, দৃষ্টিনন্দন জলাধারসহ হাঁটারপথ, আন্ডারপাস, মসজিদ ও অত্যাধুনিক রাইডসহ শিশুপার্কের আধুনিকায়নের লক্ষ্যে কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। প্রকল্প মেয়াদকাল জানুয়ারি ২০১৮ থেকে ডিসেম্বর ২০১৯। রাজধানী ঢাকার সরকারি ও বেসরকারি বিনোদন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম খরচ হওয়ায় ধনী-গরিব প্রতিটি পরিবারের কাছে জনপ্রিয় ছিল। বন্ধ হওয়ার আগে পর্যন্ত প্রতি শুক্রবার পার্কটি বেলা ২টা ৩০ মিনিট থেকে সন্ধা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত চালু ছিল। রোববার ছাড়া শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার ২টা থেকে রাত ৭টা পর্যন্ত রাইডগুলো চালু থাকতো। এ শিশুপার্কে প্রতিদিন আট হাজারের অধিক মানুষ আসতো। আর ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মতো আনন্দঘন সময়ে তা কয়েকগুণ বেড়ে যেতো। এছাড়া বিশেষ দিবস গুলোতে এখানে শিশু বিশোরদের উপচেপড়া ভীড় ছিল লক্ষ্যণীয়।  শিশু পার্কের প্রতি খেলনা ৮ টাকা হারে ৬টি খেলনা ব্যবহার করতে দেয়া হয়। জানা গেছে, ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই পার্কটির নাম শুরু থেকেই দফায় দফায় পাল্টানো হয়। প্রথমেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান শিশু পার্ক নামকরণ করা হয়। এরপর ঢাকা শিশু পার্ক, কেন্দ্রীয় শিশু পার্ক, সর্বশেষ শহীদ জিয়া শিশু পার্ক নামকরণ হয় ২০০৩ সালে। ১৩টি খেলনা নিয়ে পার্কটির যাত্রা শুরুর সময় খেলনাগুলোর মেয়াদ ধরা হয়েছিল ১০ বছর। এখন এ পার্কের খেলনা যন্ত্রগুলো ৪০ বছরের পুরনো। সবক’টি খেলনাই কারিগরি দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ। প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ আর মেরামতের নামে জোড়াতালি দিয়ে এগুলো সচল রাখা হয়েছে। গুনগত মানের দিক দিয়ে ভালো থাকায় ১০ টি খেলনা এখনও চালু আছে কোনমতে। বাকী তিনটির মধ্যে ‘ফুলদানী আমেজ’ এর অবস্থা এতটাই খারাপ যে সেটার মেরামত কিংবা রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব নয় বলে কারিগরী মতামতে উল্লেখ করা হয়। মেরামতে যে টাকা ব্যয় হবে, তা দিয়ে নতুন একটা খেলনা কেনা সম্ভব বলে সূত্রটি জানায়।
সূত্রটি জানায়, শহীদ জিয়া শিশু পার্কটি শাহবাগ থেকে সরানো নিয়ে ২০০৯ সালে উচ্চ আদালতের এক রায় আসে। ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০১০ সালে একটি রীট পিটিশন করা হলে উচ্চ আদালত পার্ক কর্তৃপক্ষের পক্ষে রায় দিয়ে বলে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হতে বিদ্যমান স্থাপনা অপসারণ পূর্বক কমিটি কতৃক চিহ্নিত স্থানগুলো আর্ন্তজাতিক মান সম্পন্ন ও বিবেচনা প্রসূত দৃষ্টিনন্দন ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ স্মৃতিসৌধ নির্মাণ ও সংরক্ষণ করতে হবে। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্যোগী হয়ে পার্কটির সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের নির্দেশনা প্রদান করেন। এরপর স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয় তৎকালীন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে (ডিসিসি) পার্কটি যথাস্থানে রেখে উন্নয়নের জন্য একটি পত্র দেয়। পত্র পাওয়ার পর ডিসিসি ২০১১ সালের ৩ মার্চ শহীদ জিয়া শিশু পার্কের উন্নতকরণের একটি প্রকল্প প্রেরণের মতামত জানতে চেয়ে পত্র দেয় এলজিআরডি ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে। ওই দুই মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে একই বছরের ৭ জুন মতামত দিয়ে তারা জানায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিশু পার্কটি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণে ডিসিসি উপযুক্ত প্রকল্প গ্রহণ করবে এবং এর সাথে মুক্তিযুদ্ধ ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত থাকবে। সে প্রেক্ষিতে দীর্ঘদিনের চিঠি চালাচালির পর বিভক্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) বর্তমান মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন দায়িত্ব নেয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিভাগকে একটি প্রকল্প গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করেন। সেমতে প্রথম দপায় ১’শ ৫৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুমোদনের জন্য ওই দুই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় ২০১৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। শহীদ জিয়া শিশু পার্ক নিয়ে সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে ডিএসসিসির ডেভোলাপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোপোজাল (ডিপিপি) এ নাম বদল করে সোহরাওয়ার্দী শিশু পার্ক নামে যে প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠানো হয়, তাতে বলা হয়েছে পার্কটির উন্নয়ন, আধুনীকায়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজে ব্যয় হবে ১’শ ৫৩ কোটি টাকা। ব্যয়ের সারাংশে উল্লেখ করা হয়, রাজস্ব উপাদান খাতে কনসালটেন্ট ফি ১ কোটি ৫০ লাখ, জ্বালানী ২৫ লাখ, পুরাতন খেলনাসহ স্থাপনা অপসারণে ৫ কোটি ও সভার সম্মানী বাবদ ৫ লাখ টাকা ব্যয় হবে। এ ছাড়া, মূল ব্যয়ের মধ্যে ৪৮ টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনে ৫০ লাখ, ৫ টি গেইটের জন্য বিভিন্ন নিরাপত্তা তল্লাশী সামগ্রী কেনায় ১ কোটি ৫০ লাখ, সীমানা প্রাচীর নির্মানে ১৫ কোটি, দু’শ স্কয়ার ফিটের ৩০টি দোকান নির্মাণে ২ কোটি ৫০ লাখ, দর্শনার্থীদের প্রবেশ এবং বাহির হওয়ার দুটো টিকেট কাউন্টারসহ গেইট নির্মাণে ৩ কোটি, শেল্টার শেড নির্মাণে ১ কোটি ৫০ লাখ, অফিস ভবন,পাবলিক টয়লেট, মসজিদ, স্টোর রুম, সিকিউরিটি রুম, আসবাবপত্রসহ মেরামত কারখানা নির্মাণে ১’শ কোটি, প্লান্টেশানসহ সৌন্দর্য বর্ধনে ২ কোটি, বৈদ্যুতিক কাজের জন্য ২’শ ২০ কোটি, স্যানিটারী ও পানি সরবরাহে ৭ কোটি টাকা রয়েছে।
খেলনা সামগ্রী কেনার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে  ৮১ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে, মিনি কোস্টার, কেরোসেল ডাবল ডেক, ভাইকিং ২৪ সেট, সুপার সুইং, টি কাপ ৩৬ সেট, স্পেস শাটল, মিউজিক বোট, জেলি ফিশ, ঘূর্ণায়মান বাগান ট্রেন, এয়ার বাই সাইকেল ১৫ টি, আর্থ কোয়াক, ফোর ডি থিয়েটার এলার্ট, ক্লামবিং কার, ডেনচিং পার্টি ও জাদুঘরসহ থিয়েটার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ