ঢাকা, সোমবার 8 July 2019, ২৪ আষাঢ় ১৪২৬, ৪ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

চাহিদা অনুযায়ী ঋণ না পাওয়ায় বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত

* প্রয়োজনীয় আমানত পাচ্ছেনা ব্যাংকগুলো
* প্রকট তারল্য সংকটে ব্যাংকিং খাত
এইচ এম আকতার : ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট প্রকট হচ্ছে। এ অবস্থা বেসরকারি খাতের বেশির ভাগ ব্যাংকই ঋণ বিতরণ সংকুচিত করেছে। গত মে মাসে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ১৬ শতাংশ। তবে, ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, ঋণ বিতরণে সামান্য গতি দেখা গেলেও চাহিদা অনুযায়ী বিতরণ করা যাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় আমানত না আসায় ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ীদের ঋণের চাহিদা মেটাতে পারছে না। এতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তারল্য সংকটের কারণে ধার দেনা করে দৈনন্দিন কার্যক্রম চালাচ্ছে ব্যাংকগুলো।
জানা গেছে, প্রায় দেড় বছর ধরে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ছিল নিম্নমুখী। আর গত ৫৭ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি ছিল এই বছরের এপ্রিল মাসে। এই সময়ে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ছিল মাত্র ১২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। বর্তমানে সামান্য গতি পেয়েছে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন বলছে, গত মে মাসে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ১৬ শতাংশ। তবে, ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, ঋণ বিতরণে সামান্য গতি দেখা গেলেও চাহিদা অনুযায়ী বিতরণ করা যাচ্ছে না। তারা বলছেন, একদিকে প্রয়োজনীয় আমানত না আসায় ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ীদের ঋণের চাহিদা মেটাতে পারছে না, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) নতুন সীমায় নামিয়ে আনার একটি চাপও রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাস শেষে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৯১৮ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের মে মাস শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৯২ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। এই হিসাবে গত এক বছরে বেসরকারি খাতে ঋণ কমেছে এক লাখ ৯৯হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা।
 কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়িয়েও আমানত পাওয়া যাচ্ছে না। এ বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে মাত্র চার হাজার ১৭ কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার। যদিও বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো ১০০ টাকা আমানত সংগ্রহ করলে তার বিপরীতে সর্বোচ্চ ৮৩ টাকা ৫০ পয়সা ঋণ দিতে পারে। আর ইসলামি ধারার ব্যাংক ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে ৮৯ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে। তবে, বেশ কিছু ব্যাংক ১০০ টাকার বিপরীতে ১০০ টাকাই বিতরণ করেছে। কোনও কোনও ব্যাংক ১০০ টাকার বিপরীতে ১০৫ টাকাও ঋণ বিতরণ করেছে।
চাহিদা অনুযায়ী আমানত পাচ্ছে না ব্যাংকগুলো। আবার খেলাপি হওয়া ঋণও আদায় হচ্ছে না। ফলে সুদহার বাড়িয়ে আমানত সংগ্রহের চেষ্টা করছে তারা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট তরল সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। গত বছরের জুনে তরল সম্পদের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৬৪ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা। সে হিসেবে সাত মাসে ব্যাংক খাতের তরল সম্পদ ৬ শতাংশ বা ১৫ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা কমেছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকরা তারল্য সংকটের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে আগ্রাসী ব্যাংকিং বা সামর্থ্যের অতিরিক্ত ঋণ প্রদান। গ্রাহকরা বেসরকারি ব্যাংক থেকে আমানত তুলে সরকারি ব্যাংকে সংরক্ষণ করছে। সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছে গ্রাহকরা। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ সঠিকভাবে আদায় না হওয়ায় ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট ঘনীভূত হচ্ছে বলে মনে করেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বছরজুড়েই বেশিরভাগ ব্যাংক ধার করে চলছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিআরআর (নগদ জমা) ও এসএলআর (বিধিবদ্ধ সঞ্চিতির হার) জমা রাখতে পারছে না। বেশ কয়েকটি ব্যাংক প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণ করতে পারছে না।
গত বছর এপ্রিলে ব্যাংক পরিচালকদের সংগঠন এসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) নেতাদের দাবির মুখে সিআরআর ১ শতাংশ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে আনে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য বাড়লেও অর্থবছরের শেষে এসে আবারও তারল্যে টান পড়েছে।
ব্যাংক খাতের তারল্য সংকটের পেছনে খেলাপি ঋণকেই দায়ী করছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। খেলাপি ঋণ সঠিকভাবে আদায় না হওয়ায় এ খাতে তারল্য সংকট ঘনীভূত হচ্ছে বলে মনে করেন ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন,বর্তমান সময়ে ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ খেলাপি ঋণ। খেলাপির ঋণের কারণে ব্যাংকগুলো এদিকে মূলধন সংকটে রয়েছে,অন্যদিকে তারল্য সংকট ঘনিভূত হচ্ছে।
সাবেক ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ মনে করেন, তিনটি কারণে আজকের এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। ব্যাংকগুলোর বেপরোয়া ঋণ বিতরণ, আস্থাহীনতায় গ্রাহকরা বেসরকারি ব্যাংক থেকে টাকা তুলে সরকারি ব্যাংকে সংরক্ষণ করা। এছাড়া সুদ হার বেশি হওয়ায় সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝোঁক ও খেলাপি ঋণের পুনঃতফসিলকরণ। এসব কারণে তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্বনর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমানত সংগ্রহের গতি খুবই কম। আমানত সংগ্রহ কম এবং ঋণ বাড়ার কারণে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। আমানতের সুদের হার কম হওয়ায় গ্রাহকরা এখন ব্যাংকে টাকা রাখছেন কম। যে কারণে সংকট প্রকট হচ্ছে। তিনি বলেন, এ সমস্যার সমাধান করতে ঋণ আদায় বাড়াতে হবে। ওই টাকায় নতুন ঋণ দিতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বেশিরভাগ ব্যাংকে তারল্য বা নগদ টাকার সংকট চলছে। সব ব্যাংক নতুন করে ঋণ না দিয়ে আদায়ের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বেসরকারি খাতে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৭০ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময় শেষে ঋণ ছিল ৮ লাখ ৬২ হাজার ২২৫ কোটি টাকা। এ হিসেবে এক বছরে ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ১২৪ কোটি টাকা।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট আমানত ছিল ১০ লাখ ১৪ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। একই সময়ে সরকারি-বেসরকারি খাতে মোট ১০ লাখ ৮৭ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণ ছিল ৯ লাখ ৭০ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্স ফেলো তৌফিকুল ইসলাম বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়তে হবে। তার আগে ব্যাংকগুলোকে চাহিদা অনুযায়ী আমানত পেতে হবে। তা না হলে ব্যাংক ঋণ দিতে পারবে না। আর ঋণ বিতরণ না হলে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগও হবে না। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে কর্মসংস্থান ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির একটি বিশাল অংশ হয় বেসরকারি খাতের মাধ্যমে।
প্রসঙ্গত, গত ৩০ জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। গত মে মাসে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ১৬ শতাংশ। আর জুনে প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়েছে। তবে লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৪ শতাংশ দূরে রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, গত মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ২৩ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। আগের বছরের মার্চে যা ছিল ৯ লাখ ২৫ হাজার ২৭৯ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে আমানত বেড়েছে মাত্র ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অথচ বেসরকারি খাতের ঋণ বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে ব্যাংকে তারল্য কমেছে ১৬ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা। এই বছরের মার্চে তরল সম্পদ (লিকুইড অ্যাসেট) দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৮৯৮ কোটি টাকা। গত বছরের মার্চে যা ছিল ২ লাখ ৬৪ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা।
ব্যাংকিং পদ্ধতি অনুসারে, ঋণের টাকা নগদ হিসেবে গ্রাহকের হাতে তুলে দেওয়া হয় না। একাউন্টে দেওয়া হয়। অর্থাৎ যে পরিমাণ ঋণ বিতরণ করা হয়, ওই পরিমাণ অর্থ আমানত হিসেবে যোগ হয়। আবার ব্যাংকগুলো নতুন নতুন গ্রাহকের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে। ফলে স্বাভাবিকভাবে ঋণের তুলনায় আমানতের প্রবৃদ্ধি বেশি থাকার কথা। কিন্তু এখন ঘটছে উল্টো।
জানা গেছে, রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো ছাড়া অধিকাংশ ব্যাংকের হাতে বিনিয়োগ করার মতো টাকা নেই। কোনও কোনও ব্যাংক ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সুদ দিয়ে আমানত সংগ্রহ করছে। কোনও কোনও ব্যাংক পাঁচ বছরে টাকা দ্বিগুণ করার আশ্বাসে আমানত সংগ্রহ করছে। এরপরও আশানুরূপ আমানত বাড়াতে পারছে না ব্যাংকগুলো।
এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়া ছাড়াও সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ও ব্যাংকের সুদের পার্থক্য থাকায় ব্যাংক আমানত পাচ্ছে না। ঋণখেলাপিদের শাস্তি হলে ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে। তখন এমনিতেই আমানত বাড়বে। ঋণ বাড়ানোও সহজ হবে বলে তিনি মনে করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ